বন্দিদের গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করার প্রবণতাই বেশি। তাই, গামছার বদলে ছোট ও মোটা তোয়ালে ব্যবহার করুন বন্দিরা। জেলে বন্দিদের আত্মহত্যা রুখতে এমন দাওয়াই দিচ্ছে কারা দফতর। শুধু গামছা ব্যবহারের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারিই নয়, আত্মহত্যার প্রবণতা রুখতে প্রতি জেলে পৃথক সেল তৈরির কথাও ভাবা হচ্ছে। সেন্ট্রাল জেলগুলিতে তিনটি করে এবং জেলা ও বিশেষ জেলগুলিতে একটি করে এমন সেল রাখা হবে। পাশাপাশি, বাথরুম ও অন্যান্য জায়গায় খোলা পাইপ না রেখে তা দেওয়ালের ভিতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং আমদানি ওয়ার্ডে বাড়তি নজরদারির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে আত্মহত্যা রুখতে।
কারা দফতর সূত্রের খবর, গত বছর দশেক ধরে এ রাজ্যের বিভিন্ন জেলের বন্দিদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। তবে শুধু এ রাজ্যে নয়, সারা দেশেই আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে বলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর সূত্রের খবর। সেই প্রবণতা কমাতেই রাজ্যগুলিতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ করেছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তাদের সুপারিশ মেনে সম্প্রতি রাজ্য কারা দফতর বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি তৈরি করেন। ওই কমিটি রাজ্যের বিভিন্ন জেলে ঘটে যাওয়া আত্মহত্যার ঘটনা সমীক্ষা করার পরে কারা দফতরকে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ করার পরামর্শ দিয়েছে। তার মধ্যে গামছা ব্যবহার বন্ধের সুপারিশ অন্যতম।
কারা দফতরের এক কর্তার কথায়, ‘‘অতীতে জেলে বন্দিদের গামছা ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু, জেল থেকে সংশোধনাগার হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে ওই নিষেধাজ্ঞা উঠে গিয়েছিল। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, ১০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে তার মধ্যে ন’টিই গলায় গামছা দিয়ে আত্মহননের ঘটনা। বাকি ঘটনাগুলি কীটনাশক, ফিনাইল বা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার ঘটনা। সে কারণেই ফের গামছার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে।’’ সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি জেলে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন সারদা কেলেঙ্কারিতে ধৃত সাংসদ কুণাল ঘোষ। তার পর থেকে জেলের মধ্যে এ ধরনের ওষুধ বা কীটনাশক-ফিনাইল যাতে না ঢোকে, তা নিশ্চিত করতে বাড়তি কড়াকড়ি শুরু হয়েছে।
ওই কর্তা জানান, গামছার বদলে মোটা ও ছোট তোয়ালে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। দড়ি বাঁধার মতো পরিস্থিতি যাতে সেলগুলিতে না থাকে, সে ব্যাপারেও সতর্ক দৃষ্টি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অন্যান্য কীটনাশক বা প্রাণহানিকর পদার্থ বন্দিদের হাতের নাগালে যাতে না থাকে, তার ব্যবস্থাও করা হবে।
কারা দফতরের কর্তারা খেয়াল করেছেন, সাধারণত তিন-চারটি ক্ষেত্রে বন্দিদের আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। কিছু বন্দিদের আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয় জেলে আসার পরে পরেই। জেলে বিচারাধীন অবস্থায় হতাশ হয়ে কিংবা শাস্তি শোনার পরেও অনেক বন্দি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আবার দীর্ঘ দিন ধরে বিচারাধীন অবস্থায় জেলে থাকার কারণে হতাশ হয়েও অনেক বন্দি আত্মহত্যা করেন।
বন্দিরা জেলে আসার পরে দিন দু’য়েক তাদের রাখা হয় আমদানি ওয়ার্ডে। তার পরে তাদের সেলে বা ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। জেলে আসার পরে মানসিক অবসাদে অনেকেই আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন। সে কারণে, আমদানি ওয়ার্ডে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মধ্যে আত্মহত্যা আটকাতে আমদানি ওয়ার্ডে সিসি ক্যামেরার নজরদারি নিশ্চিত করা অন্যতম। এ ছাড়াও, আমদানি ওয়ার্ডে বন্দিদের সঙ্গে কথা বলে যাতে হতাশা দূর করা যায়, তা নিশ্চিত করতে এ ব্যাপারে প্রশিক্ষিত কারারক্ষী রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে। বাথরুম এবং জেলের ওয়ার্ডের মধ্যে আধো-অন্ধকার এলাকায় বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে বলে সব জেলগুলিকে ওই সব জায়গায় বাড়তি সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শাস্তি শোনার পরে বন্দিরা যাতে আত্মহননের পথ বেছে না নেয়, তা নিশ্চিত করতে সহ-বন্দি এবং কারারক্ষীদের দিয়ে যৌথ ভাবে এমন বন্দিদের উপরে বিশেষ নজরদারিও করা হবে বলে জানাচ্ছেন কারা দফতরের কর্তারা।
এ সবের সঙ্গে সঙ্গে বন্দিদের নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করা এবং মানসিক অবসাদে ভুগছেন, এমন বন্দিদের নিয়মিত ‘কাউন্সেলিং’-এর ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারা দফতর। যদিও এক কারা-কর্তার কথায়, ‘‘সিদ্ধান্ত নিলেই তো হল না। এর জন্য প্রচুর কর্মীর প্রয়োজন। সেটারই সবচেয়ে অভাব। অবিলম্বে চিকিৎসক থেকে শুরু করে কারারক্ষীর অভাব দূর না করলে শত চেষ্টা করেও জেলে আত্মহত্যা রোখা যাবে না।’’