Advertisement
E-Paper

বুদ্ধপূর্ণিমায় আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল জামালপুরের বুড়োরাজের মেলা

হঠাৎ দেখলে মনে হবে, দলবদ্ধ হয়ে বেশ কিছু মানুষ অস্ত্র হাতে যুদ্ধে চলেছে! কারও হাতে রাম দা তো কারও হাতে খাঁড়া। কেউ বা তরোয়াল উঁচিয়ে কিংবা তীর-ধনুক নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০১৭ ০০:২৬
জামালপুরে বুড়োরাজের মন্দির।

জামালপুরে বুড়োরাজের মন্দির।

হঠাৎ দেখলে মনে হবে, দলবদ্ধ হয়ে বেশ কিছু মানুষ অস্ত্র হাতে যুদ্ধে চলেছে! কারও হাতে রাম দা তো কারও হাতে খাঁড়া। কেউ বা তরোয়াল উঁচিয়ে কিংবা তীর-ধনুক নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সঙ্গে রয়েছে মানতের পশু। কিন্তু যুদ্ধ নয়! সকলেরই গন্তব্য বর্ধমান জেলার জামালপুরে বুড়োরাজের মন্দির।

বৈশাখী পূর্ণিমা যা বুদ্ধপুর্ণিমা বলেও পরিচিত সে দিনে বর্ধমান জেলার সবুজে ঘেরা ছোট গ্রাম জামালপুরে বুড়োরাজের মহামেলা। বৈশাখের দাবদাহ উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন এখানে। কেউ এই সব অস্ত্র দিয়ে দেবতার উদ্দেশে বলি দিতে আসেন তো কেউ বা আবার দলবদ্ধ হয়ে অস্ত্র প্রদর্শন করে বীরত্ব দেখাতে। তাই এই দিনে বদলে যায় পরিচিত গ্রামের ছবিটা।

অন্যান্য প্রচলিত মেলার চেয়ে গ্রামীণ এই মেলা অনেকটাই আলাদা। শহুরে যান্ত্রিক প্রভাব আজও থাবা বসাতে পারেনি এখানে। মন্দির বলতে একটি খড়ের চালাঘর। যার মেঝেটি আজও মাটির। শিব এবং যম-ধর্মরাজের এক মিলিত রূপ এই বুড়োরাজ। বাংলায় বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয়ের ফলেই ধর্মরাজের পুজোর প্রচলন ঘটে।

বাংলায় ধর্মপুজো প্রসঙ্গে প্রখ্যাত গবেষক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘যখন সহজিয়া ধর্মের প্রাদুর্ভাবে বাঙালি একেবারে অকর্মণ্য ও নির্বীর্য হইয়া গিয়াছিল, ঠিক সেই সময় আফগানিস্তানের খিলজিরা আসিয়া উহাদের সমস্ত বিহার ভাঙিয়া দিল— দেবমূর্তি, বিশেষত যুগলাদ্য মূর্তি চূর্ণ করিয়া দিল— সহস্র সহস্র নেড়া ভিক্ষুর প্রাণনাশ করিল।...মুসলমান বিজয়ে বৌদ্ধ-মন্দিরের ও বৌদ্ধ-দর্শনের একেবারে সর্বনাশ হইয়া গেল।...বৌদ্ধধর্মের প্রাদুর্ভাবকালে যাহারা অনাচরণীয় ছিল এবং মুসলমানাধিকারের পরে নতুন সমাজে যাহারা অনাচরণীয় হইল— বৌদ্ধধর্ম শেষে তাহাদের মধ্য নিবদ্ধ হইয়া পড়িল এবং তাঁহারা ক্রমে প্রজ্ঞা, উপায় ও বোধিসত্ত্ব ভুলিয়া গেল। শূন্যবাদ, বিজ্ঞানবাদ, করুণাবাদ ভুলিয়া গেল; দর্শন ভুলিয়া গেল। তখন রহিল জনকতক মূর্খ ভিক্ষু অথবা ভিক্ষু নামধারী বিবাহিত পুরহিত। তাহারা আপনার মতো করিয়া বৌদ্ধধর্ম গড়িয়া লইল। তাহারা কূর্মরূপী এক ধর্মঠাকুর বাহির করিল। এই যে কূর্মরূপ ইহা আর কিছু নহে, স্তূপের আকার।...সুতরাং কূর্মরূপী ধর্ম আর স্তূপরূপী ধর্ম একই। পঞ্চবুদ্ধের প্রত্যেকের যেমন একটি করিয়া শক্তি ছিল। ধর্মঠাকুরেরও তেমন একটি শক্তি হইলেন, তাঁহার নাম কামিণ্যা।...ধর্মঠাকুর আজও যে বাঁচিয়া আছেন, সে কেবল মানতের জোরে। নদীয়ার উত্তর জামালপুরের ধর্মঠাকুরের মন্দিরে বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে বারোশত পাঁঠা পড়ে।’

বাংলার অন্যান্য জায়গার ধর্মরাজের বিগ্রহ কূর্মাকৃতি হলেও জামালপুরে বুড়োরাজের বিগ্রহ কিন্তু দু’টি গৌরীপট্ট যুক্ত একটি মূর্তি। তার এক দিকে শিবলিঙ্গ অপর দিকে একটি গর্ত। মাটির কিছুটা নীচে থাকায় এর চেয়ে বেশি বোঝা যায় না। মন্দিরের এক সেবায়েৎ জানালেন, আনুমানিক ছ’শো বছর আগে এই অঞ্চল ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। সেই জঙ্গলে ছিল একটি উইয়ের ঢিপি। শোনা যায়, প্রতি দিন একটি গাই সেই উইয়ের ঢিপির উপর এসে দাঁড়াত। আর আপনা থেকেই উইয়ের ঢিপির উপরে দুধ পড়ত। সেই গরুর মালিক যদু ঘোষ এক দিন তার পিছু নিয়ে এই আশ্চর্য ঘটনা দেখে আবাক হয়েছিলেন। সেই রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, ওখানেই দেবতার অধিষ্ঠান। পর দিন সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে শিবলিঙ্গ-গৌরীপট্ট সমেত পাথরের অদ্ভুত এক বিগ্রহ পাওয়া যায়। কিন্তু, হাজার চেষ্টা করেও সেই বিগ্রহের শেষ পাওয়া যায়নি বলে সেটি সরানো সম্ভব হয়নি।

সে দিন রাতে যদু ঘোষ ফের এবং ওই গ্রামের এক ব্রাহ্মণ মধুসূদন চট্টোপাধ্যায় স্বপ্নাদেশ পান যে, সেই বিগ্রহটিকে ওই স্থান থেকে সরানো অসম্ভব। তাই সেখানেই তাঁকে প্রতিষ্ঠা করে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করতে চান। কিন্তু, গরিব সেই ব্রাহ্মণের পক্ষে নিত্যপুজোর ব্যয়ভার গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। তখন আবারও তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে প্রতি দিন তিন সের চাল আর দুধ দিয়ে পুজো করলেই হবে। সেই থেকে প্রতি দিন একটি থালায় তিন সের চালের নৈবেদ্য দিয়ে পুজো হয়। আর মাঝখানে একটা দাগ দেওয়া হয়। একাংশ শিবের উদ্দেশ্যে আর এক অংশ যম-ধর্মরাজের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। তবে, বিশেষ তিথিতে পরমান্ন ভোগ হয়। জামালপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিগ্রহটি বৌদ্ধ যুগের। মূলত অনার্য এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধনেই নাকি বাংলায় ধর্মপুজোর প্রচলন ঘটেছিল।

আরও পড়ুন: বিধানসভায় নকল ভোটযন্ত্র এনে ‘কারচুপি’ দেখাল আপ, তীব্র নিন্দায় বিজেপি

প্রচলিত কাহিনি অনুসারে সেই ব্রাহ্মণ যে দিন স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন সে দিন ছিল বুদ্ধপূর্ণিমা। তাই, প্রতি বছর সেই দিনটিতে এখানে বসে মেলা। আজও বুদ্ধপূর্ণিমায় এখানে অসংখ্য পাঁঠা ও ভেড়া বলি হয়। মাঝেমধ্যেই বলির পাঁঠার ভাগ নিয়ে কিংবা কে আগে বলি দেবে তা নিয়ে মারামারিও বেধে যায় অস্ত্রধারীদের মধ্যে। হঠাৎই যেন ভেসে ওঠে আদিম সমাজের ছবি। মন্দিরের এক সেবায়েৎ বলছিলেন, যম-ধর্মরাজের উদ্দেশ্যেই এই বলিদান। বিপদে পড়ে কিংবা কোনও গভীর সমস্যা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ দেবতার কাছে কিছু মানত করে। বিপন্মুক্ত হলে তারা দেবতার উদ্দেশে পশুবলি দেয়। কেউ অন্য কিছু দান করে। যদিও সময়ের সঙ্গে পশুবলি আগের তুলনায় কমেছে।

তবে, বাংলার অন্যান্য মেলায় অবক্ষয়ের ছবি দেখা গেলেও এখানে আজও দেখা যায় মেলার সাবেক ছবিটা। মেলা চলে মাসখানেক। স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি অস্থায়ী দোকানও হয় এখানে। দোকানিরা আসেন কলকাতা, শান্তিপুর, নবদ্বীপ, অগ্রদ্বীপ, বর্ধমান, কাটোয়া, কালনা থেকে। এখানে কেউ আসেন ভক্তিতে, কেউ বা মেলার আকর্ষণে। ‘বুড়োরাজের জয়’ ধ্বনি মুখরিত আকাশ বাতাস পরিবেশও যেন ভক্তদের মনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আজও সরল মানুষের বিশ্বাস বুড়োরাজের দরবারে এসে বোবার মুখে কথা ফোটে, দৃষ্টিহীন দৃষ্টি ফিরে পায়, দুরারোগ্য ব্যাধির নিরাময় হয় কিংবা নিঃসন্তান সন্তানসম্ভবা হয়। আর সেই বিশ্বাস নিয়ে শ্রেণি-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ এই সময় সন্ন্যাস পালন করেন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের সরল ধর্মীয় বিশ্বাস আর লৌকিক কিংবদন্তির মাঝে আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল জামালপুরের বুড়োরাজ।

গাড়িতে কলকাতা থেকে কল্যাণী রোড ধরে ঈশ্বর গুপ্ত সেতু পেরিয়ে বাঁশবেড়িয়া হয়ে দিল্লি রোড ধরে সমুদ্রগড়, কালনা পেরিয়ে পৌঁছনো যায় বর্ধমান জেলার জামালপুরে। কিংবা হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকালে পাটুলিতে নেমে ট্রেকারে বা ভ্যানে যাওয়া যায় জামালপুর।

Buddha Purnima Buroraj fair festival
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy