E-Paper

কাজ হবে কোন নথি দিলে, চূড়ান্ত নাজেহাল মানুষ

এসআইআর-এর শুনানিতে নথি নিয়ে নাজেহাল হতে হচ্ছে, এমন নানা অভিযোগ মিলছে রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০০
শুনানিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন অসুস্থ মিনা সালুই। শনিবার রামপুরহাটে।

শুনানিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন অসুস্থ মিনা সালুই। শনিবার রামপুরহাটে। ছবি: সব্যসাচী ইসলাম ।

২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বহরমপুরের বাসিন্দা কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে। সে বছরেই জন্ম কৌশিকের ছেলে কৌস্তভের। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবার নাম থাকার তথ্য-সহ এসআইআরের গণনা ফর্ম পূরণ করেছিলেন কৌস্তভ। কৌস্তভের দাবি, বহরমপুরের ব্লক অফিস এসআইআরের শুনানিতে সরকারি আধিকারিক তাঁর বাবার নথিপত্র দেখতে চান। কৌস্তভ বলেন, ‘‘তখন বললাম, ছেলের নথি যাচাই করতে বাবার ২০০২ সালের ভোটার তালিকার নাম থাকার প্রমাণ ছাড়া, অন্য কোনও নথি লাগবে— এমন নির্দেশিকা নেই। তা-ও ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবার নাম থাকার প্রমাণ, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড দেওয়ার পরে, আধিকারিক বললেন, এ সব নথি নাগরিকত্ব যাচাই করার জন্য উপযুক্ত নয়। কী বলব!’’

এসআইআর-এর শুনানিতে নথি নিয়ে নাজেহাল হতে হচ্ছে, এমন নানা অভিযোগ মিলছে রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণে। শুনানিতে নথি দিয়েও অনেকে নিশ্চিত হতে পারছেন না, ফেব্রুয়ারিতে সংশোধিত ভোটার তালিকা বেরোলে, তাতে নাম থাকবে কি না। কারণ, কারও ক্ষেত্রে শুনানির নোটিসে লিখে দেওয়া হচ্ছে, ‘উপস্থিত’ (অ্যাটেন্ডেড), কারও ক্ষেত্রে ‘অনুমোদিত’ (অ্যাপ্রুভড)। কিন্তু তথ্য জমা নেওয়া হয়েছে (রিসিভড), এমন তথ্য হাতে আসছে না। সব মিলিয়ে বাড়ছে বিভ্রান্তি। দুশ্চিন্তা।

হুগলির গুপ্তিপাড়ার সুরভি ঢালির অভিজ্ঞতা, ‘‘ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গিয়েছেন। তাঁদের নথি নেই। মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, আধার কার্ড দিলাম। আধিকারিক নিয়েছেন।’’ আবার সে জেলারই চুঁচুড়া-মগরা ব্লকের এক নির্বাচন আধিকারিক জানান, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড জাল হতে পারে। তাই সে পরীক্ষা পাশের শংসাপত্রে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারের বিভিন্ন ব্লকে আবার মাধ্যমিক পাশের শংসাপত্র এবং অ্যাডমিট কার্ড—দুটোই দেখা হচ্ছে।

কোন নথিতে কাজ হবে, তা নিয়ে ধন্দে অনেকে। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের জৌগ্রাম থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ব্লক অফিসে শুনানির জন্য গিয়েছিলেন অঞ্জনা মাহাতো। তিনি বলেন, “স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র নেবে না। এখন বলছে, তফসিলি শংসাপত্র নিয়ে আসতে। মা কোনও দিন স্কুলেও যাননি। কী ভাবে শংসাপত্র জোগাড় করব?” শিলিগুড়ি মহকুমার পানিট্যাঙ্কির বাসিন্দা মাঝবয়সি শ্যামল মুর্মু বা তাঁর বাবা-মায়ের নাম ২০০২-এর তালিকায় নেই। স্কুলে প্রাথমিক স্তরও পেরোননি শ্যামল। তাঁর বক্তব্য, “আদিবাসী পরিবারে আগে জন্মের শংসাপত্র করানোর চল ছিল না। স্কুলেরও কোনও শংসাপত্র নেই। বাবা আর আমার ভোটার কার্ড, আমার আধার কার্ড শুনানিতে জমা দিয়েছি। জানি না কী হবে!” এসআইআর-প্রক্রিয়ায় যুক্ত একাধিক আধিকারিকের দাবি, নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে এ ধরনের সমস্যা নিয়ে কয়েক বার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কমিশনের তরফে কিছু জানানো হয়নি।

বীরভূমের রামপুরহাটের বাসিন্দা বাবা-ছেলে হায়দর খান, শামসের খানের দাবি, মহকুমাশাসকের (রামপুরহাট) দফতরের নির্বাচনী সহায়তা কেন্দ্র থেকে তাঁদের বলা হয়েছে, জন্মের শংসাপত্র বা মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড না থাকলে ‘ডমিসাইল’ শংসাপত্র নেওয়া হবে না। হাওড়ার এক প্রশাসনিক কর্তা জানান, তাঁরা নথি হিসেবে ‘ডমিসাইল’ শংসাপত্র নিচ্ছেন। তা গ্রাহ্য হবে কি না, কমিশন ঠিক করবে। আবার নদিয়ার জেলাশাসক অনীশ দাশগুপ্ত বলেন, “নির্বাচন কমিশন ডমিসাইল সার্টিফিকেট প্রামাণ্য নথি হিসেবে গ্রহণ করতে বারণ করেছে।”

শুনানিতে হাজির অনেকেরই দাবি, নির্বাচন কমিশন পাসপোর্ট, পেনশন পেমেন্ট অর্ডার-সহ ১৩টি ‘প্রামাণ্য’ নথির কথা বললেও, অনেক ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি নথি চাওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে কোনটি মান্যতা পাবে, কোনটি নয়, তা আগে বোঝা যাচ্ছে না। তা ছাড়া, শুনানিতে যে সব নথি ভোটারেরা জমা দিচ্ছেন, সেগুলি সরকারি ভাবে গৃহীত হচ্ছে কি না, তা জানতে না পারলে বিকল্প নথি জমা দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। মেদিনীপুরের বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ প্রধান অবসরপ্রাপ্ত সহকারী স্বাস্থ্য অধিকর্তা (এডিএইচএস)। তিনি-সহ তাঁর পরিবারের চার জনকে নোটিস দেওয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ বলেন, “শুনানিতে নথি দিয়ে বলেছিলাম, ‘একটা রিসিট দিন কিংবা ইনিশিয়াল করে দিন’। ওঁরা বলেছেন, ‘রিসিট দেওয়ার নিয়ম নেই’।”

কমিশন সূত্রের অবশ্য দাবি, কোনও বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শংসাপত্র ছাড়া, শিক্ষা সংক্রান্ত স্কুলের কোনও তথ‍্য মান‍্যতা পাবে না। ‘ডমিসাইল’ শংসাপত্রকেও মান‍্যতা দেওয়া হচ্ছে না। কোন কোন নথি মান্যতা পাবে, তার বিশদ তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো রয়েছে। কেউ শুনানিতে উপস্থিত থাকলে, তাঁর ছবি এবং নথি কমিশনের পোর্টালে নথিবদ্ধ এবং ‘আপলোড’ হচ্ছে। ফলে, বিভ্রান্তির কারণ নেই।

তবে এই আশ্বাসে সবাই ভরসা পাচ্ছেন না। পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর ১ ব্লকের উজ্জ্বল ঠাকুর এবং বাঁকুড়া ১ ব্লকের বাসিন্দা জয়দেব অধিকারীর দাবি, তাঁরা শুনানিতে কমিশন-স্বীকৃত নথিই দিয়েছেন। উজ্জ্বলের ক্ষেত্রে শুনানির নোটিসে ‘অ্যাপ্রুভড’ ও জয়দেবের ক্ষেত্রে ‘অ্যাটেন্ডেড’ লিখে দেওয়া হয়েছে। দু’জনেই বলছেন, “যদি কোনও কারণে সমস্যা হয়! শুনানিতে কী নথি দিয়েছি, সে সংক্রান্ত কোনও তথ্য হাতে নেই।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal SIR

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy