দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে থাকা লোহার কাঠামোর ফাঁক দিয়ে মাথা গলানোর জায়গাটুকুও অবশিষ্ট নেই। উপরে উঠে লোহার কাঠামো কেটে কোনও মতে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। যদিও সে দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই মধ্যবয়সির। ভিতরে আটকে থাকা স্ত্রীর খোঁজে সমানে লোহার কাঠামোর সঙ্গে আটকে থাকা ইমারতি সামগ্রী হাতড়ে চলেছেন। সেই হাতড়ানোর ফাঁকেই মাঝবয়সি লোকটি বলতে থাকলেন, “ওর গামছাটা তো এখানেই পড়ে রয়েছে। ও আর কোথায় যাবে!” দীর্ঘ চেষ্টার পরে অবশেষে জীবিত অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হল তাঁর স্ত্রীকে। আপাতত তিনি এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মধ্যবয়সি প্রদ্যোত মুন্ডা ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। ২৮ বছরের স্ত্রী বদন মুন্ডাকে নিয়ে মাসখানেক আগে এসেছিলেন ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে নির্মীয়মাণ গুদামে কাজ করতেন। এ দিন সকালে ঘটনাস্থলে ছিলেন না প্রদ্যোত। পাশেই একটি জায়গায় কাজে গিয়েছিলেন। তখন স্ত্রী বদন নির্মীয়মাণ গুদামের ভিতরে ছিলেন। জল দেওয়ার কাজ করছিলেন। গুদামঘর আচমকা ভেঙে পড়লে ভিতরেই আটকে পড়েন বদন।
প্রদ্যোত জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত চলে এসেছিলেন। ভিতরে চারদিক ঘুরে স্ত্রীকে খোঁজার চেষ্টা করেন। সাড়াশব্দ পাননি। ফোনেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। ভিতর থেকে শুধু অনেকের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু স্ত্রীর গলার আওয়াজ শুনতে পাননি। প্রদ্যোতের কথায়, “ভাগ্যিস ভেঙে পড়া কাঠামোর এক ধারে গামছাটা দেখে চিনতে পারি। আমার বৌ ওটা ব্যবহার করত। আশেপাশেই কোথায় আটকে রয়েছে আন্দাজ করে আমি নিজেই ওকে খোঁজার চেষ্টা শুরু করে দিই।”
ভিতরে আটকে থাকা স্ত্রী’র খোঁজে প্রদ্যুত মুণ্ডা। —নিজস্ব চিত্র।
জানা গিয়েছে, পরে উদ্ধারকারী দল এসে হাত লাগায়। টিন ও লোহার রড সরিয়ে ভিতরে ঢুকে প্রদ্যোতের স্ত্রীর হদিস পান উদ্ধারকারীরা। গ্যাস কাটার নিয়ে এসে লোহা ও টিন কেটে দ্রুত জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বদনকে। স্ত্রীকে যখন উদ্ধার করা হচ্ছে তখন পাশেই দাঁড়িয়ে প্রদ্যোত। উদ্ধারকারীদের সঙ্গে তিনিও হাত লাগান। যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা স্ত্রীকে বাইরে বার করে আনতে দেখে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। ‘মরণ-কূপ’ থেকে জীবিত অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে স্বামীকে দেখে কেঁদে ফেলেন বদনও। দ্রুত তাঁকে অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে এসএসকেএমে নেওয়া হয়। বদনের শরীরের একাধিক আঘাত রয়েছে ও হাড় ভেঙেছে বলে হাসপাতাল সূত্রের খবর।
স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া অ্যাম্বুল্যান্সের পিছু হাঁটতে হাঁটতে প্রদ্যোত জানান, বাড়িতে শিশুসন্তান রয়েছে। এর মধ্যে বার কয়েক ফোন করেছিল। প্রদ্যোত বলেন, “ফোন ধরার সাহস পাইনি। কী করে বলতাম, ওর মা ধ্বংসস্তূপে আটকে! আজ গামছাটাই বদনকে বাঁচিয়ে দিল। বৌটা সেরে উঠুক। এখানে থাকব না। বৌকে নিয়ে দেশেই ফিরে যাব!”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)