রাত পোহালেই অক্ষয়-তৃতীয়া। অথচ, সরকারি নিয়ম মেনে সন্ধ্যা সাতটায় দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে বাড়ি ফেরার তোড়জোড় চলতে থাকা হাতিবাগান জুড়ে যেন কোনও উৎসাহই নেই। শ্যামাপদ কর্মকার নামে এক দোকান-মালিক প্রবল বিরক্তি নিয়ে বললেন, “ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে শুনে আসছি, অক্ষয়-তৃতীয়া হল বৈশাখের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া। এ দিন কারও মৃত্যু হলে তাঁর নাকি অক্ষয় স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে। যা চলছে, তাতে ব্যবসায়িক সৌভাগ্যের অক্ষয়প্রাপ্তির বদলে স্বর্গপ্রাপ্তিই হবে। সারা দিন দোকান খুলে রেখেও বউনি হচ্ছে না। পুজো করব কী?”
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, শহর জুড়ে ব্যবসায়িক মহলে এমনই ত্রাহি ত্রাহি রব। দিনভর ঘুরে দেখা গেল, অক্ষয়-তৃতীয়া ঘিরে শহরের যে সব ব্যবসায়িক মহল্লায় আগের দিন থেকে সাজ সাজ রব থাকত, এ দিন সে সব কার্যত জনশূন্য। সন্ধ্যা সাতটায় সরকারি নিয়মে দোকানপাট বন্ধ হওয়ায় চারপাশ আরও ফাঁকা।
বড় বাজারগুলির দোকানিরা অধিকাংশই জানাচ্ছেন, বাড়িতে বা দোকানে কোনও মতে খাতাপুজো সেরে রাখবেন। অনেকে আবার সেটুকু সাহসও দেখাতে পারছেন না। তাঁদের ভয়, যদি এক জন খদ্দেরও না আসেন!
‘হাতিবাগান বাজার মার্চেন্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি রঞ্জন রায় যেমন বললেন, “ঝুঁকি নেওয়া যাচ্ছে না। বাড়িতে পুজো সারলেও বউনিটা তো দোকানেই করতে হবে! গত কয়েক দিনে অনেকের বউনিটাও হয়নি। তাই এ বার অক্ষয়-তৃতীয়া না করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তার বদলে রঞ্জনবাবু রথের দিনটিকেই খাতাপুজো করার জন্য বেছে রেখেছেন।
আংশিক লকডাউনে এই মুহূর্তে দোকানপাট সকাল ৭টা থেকে ১০টা এবং বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার ছাড়পত্র দিয়েছে সরকার। আর সোনার দোকান বেলা ১২টা থেকে ৩টে পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু সময়ের এই বাধ্যবাধকতা মানতে গিয়ে বহু দোকানেই বিক্রি শূন্যে নেমে এসেছে। ধর্মতলার একটি পোশাকের দোকানের মালিক দেবাশিস সাঁতরা বললেন, “সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে কেউ পোশাক কিনতে আসেন না। বিকেলের দু’ঘণ্টায় যেটুকু বিক্রিবাটা হচ্ছে, তাতে দোকান খোলা রাখার খরচও উঠছে না। ইদ উপলক্ষে গত দু’দিনে যা বিক্রি হয়েছে, ইদের পর থেকে আর সেটাও থাকবে না।”
বৌবাজারের পুরনো সোনার দোকানের মালিক সুনীল সরকারের দাবি, “দু’জন খদ্দেরকে ফোন করে ঠিক করে রাখতে হয়েছে। যা-ই হয়ে যাক, তাঁরা আসবেনই কথা দেওয়ায় খাতাপুজোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাতে অন্তত ওই দু’জনকে দিয়ে বউনিটা হয়।” ‘বৌবাজার স্বর্ণশিল্প বাঁচাও কমিটি’র কার্যকরী সভাপতি বাবলু দে যদিও বললেন, “ক্রেতারা বুঝছেন, যে হারে সোনার দাম বাড়ছে, এটাই সোনা কেনার সেরা সময়। তবে অক্ষয়-তৃতীয়া কতটা করা যাবে, বলা মুশকিল। পয়লা বৈশাখ করব ভেবেও ভুগেছেন আমাদের অনেকে। সে দিনই ভোটের মিছিল থাকায় দুপুর থেকে বৌবাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।”
এর মধ্যেই নাজেহাল বড়বাজারের ব্যবসায়ী, হাওড়ার বাসিন্দা নারায়ণ দেবনাথ। তাঁর সত্তরোর্ধ্ব বাবা বলে চলেছেন, “পুজো করতেই হবে। আদতে অক্ষয়-তৃতীয়ার দিনই সত্যযুগ শেষ হয়ে ত্রেতা যুগের সূচনা হয়েছিল। কুবেরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে অতুল ঐশ্বর্য দান করেছিলেন। সে জন্যই কুবেরের লক্ষ্মীলাভ হওয়ায় বৈভব-লক্ষ্মীর পুজো হয় এ দিন। খাতাপুজোও এ কারণেই এত গুরুত্বপূর্ণ।” ছেলে বললেন, “বাবার মুখে শুনেছি, এই বৈশাখের শুক্লপক্ষের তৃতীয়ার দিনই নাকি রাজা ভগীরথ গঙ্গাদেবীকে মর্ত্যে এনেছিলেন। তাই এ দিন গঙ্গাস্নানে সব পাপ ধুয়ে যায়। করোনার এই বছরটা গেলে ভাল করে গঙ্গাস্নান করব।”