মায়ের সঙ্গে বাসে ওঠা বালকটিকে কোলে বসিয়ে নিয়েছিলেন এক ‘ভদ্রলোক’। ক্রমশ পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে বালকের কাছে। তার সঙ্গে কী হচ্ছে, সেটাই বুঝে উঠতে পারেনি সে। ভয়ে, লজ্জায় মাকে ডাকতেও ভুলে গিয়েছিল। লজ্জা এতটাই, ছেলেবেলার সেই অভিজ্ঞতা আজও কারও সামনে বলে উঠতে পারেন না যুবক।
ছ’-সাত বছরের বালককে স্নান করানোর বাহানায় প্রথম ধর্ষণ করেছিল তার আত্মীয়। তার পরেও বহু বার। অথচ বালকটি মাকে জানালেও তিনি আমল দেননি। ফলে দীর্ঘ ১১ বছর নিগ্রহ সহ্য করেছিল সে। ২০১২ সালে আমির খানের ‘সত্যমেব জয়তে’ শো-তে সমকামী অধিকাররক্ষা কর্মী হরিশ আইয়ার বলেছিলেন, ‘‘পরিবারের কোনও পুরুষ সদস্যের কাছে তখন আমি যেতাম না। মনে হত, সকলেই আমার সঙ্গে এ রকম করতে পারে। সে সময়ে আমার কষ্ট, চোখের জলের সঙ্গী ছিল একমাত্র আমার পোষা কুকুরটি।’’
বাস্তব হল, বালক বা কিশোর বয়সে যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন বহু পুরুষই। কিন্তু সেই দগদগে ক্ষত আজও চাপা রয়ে গিয়েছে তাঁদের অন্তরে। যৌন নিগ্রহ নিয়ে থানা-পুলিশ করা তো দূর অস্ত্, বাবা-মায়ের কাছেও হয়তো খুলে বলতে পারেননি তাঁরা। অথবা বললেও লোকলজ্জা, পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে চুপ করে থাকার নিদান এসেছে। কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রকের ‘স্টাডি অন চাইল্ড অ্যাবিউজ়: ২০০৭’-এ প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, এ দেশে ৫২.৯৪ শতাংশ কিশোর এবং ৪৭ শতাংশ কিশোরী যৌন হেনস্থার শিকার (পশ্চিমবঙ্গে যথাক্রমে ৪৪ এবং ৫৬ শতাংশ)। কিন্তু কিশোরদের ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়েরের সংখ্যা নগণ্য। কিন্তু কেন? পকসোর মতো আইন থাকলেও কেন সে পথে হাঁটছেন না কেউ? তা জানতেই ২০২৪ সাল থেকে ২২ জন নির্যাতিতের সঙ্গে কথা বলে সমীক্ষা চালিয়েছে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘প্রাজক’।
ওই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। ‘প্রাজক’-এর কর্ণধার দীপ পুরকায়স্থ বলছেন, ‘‘অনেক সময়ে হেয় করা থেকে হেনস্থার সূত্রপাত হয়। ক্রমশ তা যৌন নিগ্রহের রূপ নেয়।’’ মাঠে খেলতে না পারা, ফর্সা গায়ের রং, গোলগাল-নরম শরীর, অন্তর্মুখী স্বভাব, নাচ-গান-সহ কোনও শিল্পের দিকে ঝোঁক, মেয়েদের সঙ্গে বেশি বন্ধুত্ব অথবা চোখে চশমা— এর যে কোনও একটির কারণে ‘মেয়েলি’, ‘বৌদি’ বা ‘ছক্কা’ বলে খেপানো ও নিশানা করা হতে পারে কোনও ছেলেকে। স্কুলের সহপাঠী থেকে বাড়িতে তুতো দাদা— হেনস্থাকারী হতে পারে যে কেউ। অথচ বাড়িতে জানালে শুনতে হয়, ‘‘নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নাও।’’ আবার কখনও হেনস্থার শিকার ‘মেয়েলি’ ছাত্রের পাশে দাঁড়ানোর বদলে স্কুলের শিক্ষক তাকেই সটান বলে বসেন, ‘‘তোমার জন্য এ দেশ নয়, তুমি বাইরে চলে যাও।’’
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ২২ জন নির্যাতিত কিশোর বয়সে এক বা একাধিক বার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনকারী কখনও মায়ের সহকর্মী, কখনও গায়িকা মায়ের তবলাবাদক বা খোদ পুলিশকর্মী! তবু বাবা-মাকে বলতে পারেননি তাঁরা। দীপের মতে, হয় পরিবার বিশ্বাস করবে না, অথবা তাকেই দায়ী করবে— এই ভাবনা থেকেই পিছিয়ে আসে নির্যাতিত বালক-কিশোরেরা। অনেক সময়ে স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে কলেজেও একই পরিস্থিতি চলতে থাকে। অনেকেই বলেছেন, স্কুল-কলেজ জীবনে এই মানসিক চাপ ও এ ভাবে তাঁদের আত্মসম্মান নষ্ট করা না হলে তাঁদের ভবিষ্যৎ আরও ভাল হতে পারত।
কেন তাঁরা বলেন না বাড়িতে? কেন আইনি সাহায্য নেন না অভিভাবকেরা? সমীক্ষায় অংশ নেওয়া এক নির্যাতিত সমকামী বলছেন, ‘‘ছেলেবেলায় পাড়ার দাদা আদর করার অছিলায় ‘অন্য রকম’ আদর করত। বলেছিল, এটা আমাদের মধ্যেই থাকবে, বাড়িতে বললে তোর অন্য সিক্রেট বলে দেব। ক্লাস নাইনে এক দোকানমালিক স্টোর রুমে নিয়ে গিয়ে গায়ে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু সে কথা বাড়িতে বললে বকুনি খাব, লজ্জাবোধ— সব মিলিয়ে আর বলিনি। কিশোর বয়সেই এ দিকে আমায় ঠেলে দেওয়া না-হলে হয়তো জীবনটা সোজা খাতে বইত।’’ কেউ আবার বলছেন, ‘‘আগে ভাবতাম, বড় হওয়ার পথে এগুলোই স্বাভাবিক। তাই আমিও ছোটদের সঙ্গে একই ব্যবহার করেছি। বড় হয়ে বুঝলাম, এটা অপরাধ।’’
তাই অভিভাবক তো বটেই, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, এমনকি পুলিশকেও আরও সচেতন, সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা সমীক্ষায় বলেছেন নির্যাতিতেরা। উঠে এসেছে, মায়েদের ক্ষমতায়ন এ বিষয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। শিশু অধিকার রক্ষা কমিশনের চেয়ারপার্সন তুলিকা দাস বলছেন, ‘‘বাবা-মায়েদের জানা উচিত, মেয়েদের মতো ছোট ছেলেরাও যে কোনও পরিসরে নিগ্রহের শিকার হতে পারে। তাই আরও সচেতনতার প্রয়োজন। পুলিশও যেন সমান গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখে। স্কুলে, বিভিন্ন কর্মশালায় এ নিয়ে প্রচার চালায় কমিশন। পকসো আইনে এমন অভিযোগ এলে একই রকম গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’’
তবু আজও লোকচক্ষুর অন্তরালেই চলছে এই ভয়াবহ অপরাধ। আর বুক ফুলিয়ে ঘুরছে অপরাধীরা। দীপ বলছেন, ‘‘আসলে সমাজ পুরুষকে দুর্বল ভাবতে পারে না। তাই তাকে আঘাত করা নিয়ে কথা বলতে আজও এত বাধা।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)