আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং হত্যা মামলায় শিয়ালদহ আদালতে অষ্টম স্টেটাস রিপোর্ট (তদন্তে অগ্রগতির রিপোর্ট) জমা দিল সিবিআই। আদালতের নির্দেশ মতো কেস ডায়েরি আদালতে দেখানো হয়। সেই স্টেটাস রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নির্যাতিতার পরিবার। তাদের আইনজীবীর সওয়াল, এই রিপোর্টে ‘ফলপ্রসূ’ কিছু নেই। কেন নির্যাতিতার মাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হচ্ছে না, কাদের বাঁচানো হচ্ছে, এরকম কয়েকটি প্রশ্নও তোলা হয়েছে। পাল্টা সিবিআই জানিয়েছে, কাকে ডাকা হবে, কাকে নয়, সেটা তাদের সিদ্ধান্ত।
টালা থানায় যে জিডি (ডেনারেল ডায়েরি) হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং আরজি কর হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক, কর্মী, পুলিশকর্মীদের কয়েক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের বয়ান নেওয়া হয়েছে স্টেটাস রিপোর্টে উল্লেখ বলে সূত্রের খবর। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, আরজি কর হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন ব্যক্তির সিডিআর (কল ডিটেল রেকর্ড) খতিয়ে দেখা হয়েছে। মেট ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
শনিবার নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী আদালতে জানান, এই মামলার তদন্তে নির্যাতিতার পরিজনেরা খুশি নন, অভিযুক্তেরা খুশি না। শুধু যাঁরা তদন্ত করছেন, তাঁরা বলছেন, সব ঠিক আছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। গত বছর মার্চ মাসে প্রথম স্টেটাস রিপোর্ট দিয়ে জানানো হয়, ২৪ জনকে জেরা করা হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল স্টেটাস রিপোর্ট দিয়ে জানানো হয়, ১২ জনকে জেরা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে স্টেটাস রিপোর্টে কোনও অগ্রগতি দেখা যায়নি। ১০ জুনের রিপোর্টে কোনও অগ্রগতি প্রকাশ পায়নি। ১৬ জুলাইয়ের স্টেটাস রিপোর্টে জানানো হয়, সাত জনকে জেরা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্টেটাস রিপোর্ট দিয়ে সিবিআই জানায়, ছ’জনকে জেরা করা হয়েছে। ১৪ নভেম্বর যে স্টেটাস রিপোর্ট দেওয়া হয়, তাতে বলা হয়, ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
নির্যাতিতার আইনজীবীর সওয়াল, এই স্টেটাস রিপোর্টে যাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলা হয়েছে, তাঁরা কারা এবং কখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দাবি, এই রিপোর্টে ‘ফলপ্রসূ’ কিছু দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘‘নির্যাতিতার মায়ের বয়ান রেকর্ড করার আবেদন করেছিলাম আমরা। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ঘটনার আগেও মেয়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল।’’ আইনজীবীর সওয়াল, সিবিআই নির্যাতিতার মাকে কেন ডাকছে না? তাঁর দেওয়া তথ্য সিবিআইয়ের কাজে লাগে কি না, তা নিয়ে তাঁরা পরেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু এখন আটকাচ্ছে কী ভাবে? সিবিআই বলছে ‘আন্ডার কন্সিডারেশন’। আইনজীবীর সওয়াল, ‘‘আমরা আরও কিছু তথ্য দিয়েছিলাম। আমাদের কাছে সাক্ষী, তথ্য আছে। কী ভাবে জিডি বুক অল্টার করা হয়েছিল, কিছু সিসিটিভি ফুটেজ আছে, চিকিৎসক, নার্স এবং তদন্তকারীদের চলাফেরার ফুটেজ রয়েছে।’’
আরও পড়ুন:
নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী আরও জানান, এই তদন্তে দু’টি এজেন্সি জড়িত— এক জন আরজি করের প্রাক্তন প্রধান, অন্য জন টালা থানার সুপ্রিম অফিসার। আইনজীবীর প্রশ্ন, তাঁদের সঙ্গে আর কারা ছিল? কী উদ্দেশ্য? কাদের বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে? তাঁর কথায়, ‘‘একটা আমাদের তত্ত্ব, আর একটা ওদের। এই অবস্থায় হয় আমাদের তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করুক, না হলে ওদের (তদন্তকারী সংস্থা) তত্ত্ব ঠিক প্রমাণ করুক। এই স্টেটাস রিপোর্ট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (বিপর্যয় মোকাবিলা)।’’
সিবিআই-এর আইনজীবী পাল্টা সওয়াল করে জানান, নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবীর কথা শুনে মনে হচ্ছে, তদন্তকারীকে ওঁদের ডিকটেশন (নির্দেশ) অনুযায়ী তদন্ত করতে হবে। তাঁর সওয়াল, ‘‘আমরা কাকে জিজ্ঞাসাবাদ করব, সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত। কাউকে ভুল-ঠিক প্রমাণ করা আমাদের দায়িত্ব না। তদন্ত করে সঠিকটা বার করা আমাদের কাজ।’’
এর পরেই নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী অপর একটি নথি দেখে চিকিৎসক সুদীপ্ত রায় সম্পর্কে কিছু বলতে যান। সে সময়ে সিবিআই-এর তরফ থেকে বলা হয়, এই নথি আদালতে মুখবন্ধ খামে জমা করার কথা বলেছিল উচ্চ আদালত। তাই সকলের সামনে এটা বলা উচিত না। নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবীর সওয়াল, তা হলে ‘ইন ক্যামেরা’ শুনানি হোক। বিচারক বলেন, এই রিপোর্ট নিয়ে অর্ডার দেওয়া এক্তিয়ারের মধ্যে নেই।
নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবীর বক্তব্য, এই মামলায় যাঁরা যাঁরা অভিযুক্ত হতে পারতেন, তাঁরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সিবিআই-কে তদন্ত ভার দেওয়া হয়েছিল মানে ধরে নিতে হবে কলকাতা পুলিশ পারছিল না। তাঁর সওয়াল, ‘‘তদন্তকারীরা জবাব নিয়ে তার পর প্রশ্ন ঠিক করছেন।’’
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের আইনজীবী জানান, গ্রেফতারি মেমোর সঙ্গে আজকের স্টেটাস রিপোর্টের ধারায় কিছু পরিবর্তন রয়েছে। স্টেটাস রিপোর্টে যে ধারাগুলি বলা হয়েছে, তাতে সব জামিনযোগ্য ধারা। তা হলে এতদিন তাঁর মক্কেলকে আটকে রাখা হল কেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
২৭ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী স্টেটাস রিপোর্ট দেবে সিবিআই। আদালতের বাইরে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন বিচারক। এর আগের দুই শুনানির দিন নির্যাতিতার মা সিবিআই-এর তদন্তকারী অফিসার (আইও)-কে কুকথা বলেছিলেন। সিবিআইয়ের আইও নির্যাতিতার মায়ের কথা শুনে এক দিন কেঁদেও ফেলেন। সেই ধরনের পরিস্থিতি যাতে আর না হয়, তা নিয়ে সতর্ক করেছেন বিচারক।