×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২০ জুন ২০২১ ই-পেপার

গ্রাম ছাড়িয়ে শহরেও বাউল উৎসব

পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায়
২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ ০১:৫৩
গানপাগল: শহুরে আখড়ায় জমে উঠেছে গানের আসর। ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী।

গানপাগল: শহুরে আখড়ায় জমে উঠেছে গানের আসর। ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী।

সারা বছর যেমন-তেমন কাটুক। কিন্তু শীত পড়লেই এখন তাঁদের দেখা মিলছে শহরে।

বহু বছর ধরে শান্তিনিকেতনে পৌষ মেলা কিংবা বসন্ত উৎসবই হচ্ছে তাঁদের দেখা পাওয়ার আদর্শ জায়গা। আর একটু বেশি কষ্ট করতে পারলে পৌষ সংক্রান্তিতে রাতভর তাঁদের সঙ্গ পাওয়া যায় অজয় নদীর ধারে জয়দেব-কেঁদুলিতে। এ ছাড়াও জেলায়-জেলায় অন্য মেলা তো আছেই। কিন্তু সেখানে আর ক’জনই বা সময় বার করে যেতে পারেন। কিন্তু এখন কলকাতারই তরুণ প্রজন্মের কিছু ছেলে-মেয়ের উৎসাহে গত কয়েক বছর ধরে শহরের কিছু মেলায় এসে হাজির হচ্ছেন গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাউল-ফকিরেরা। লালনের গান গেয়ে মঞ্চ মাতিয়ে যাচ্ছেন বাউলানি-ফকিরানিরাও।

যাঁরা এই সব মেলায় গান শুনতে যাচ্ছেন, তাঁরাই বলছেন বেশ লাগছে। সবার পক্ষে তো আর জেলায় যাওয়া সম্ভব নয়। ঘরের কাছেই নাগালের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে ওঁদের। দুটো দিন বাউল গানের আনন্দ তো মিলছেই, তার সঙ্গে উপরি পাওনা আখড়ায় বসে বাউলদের সঙ্গে আড্ডা, সেল্ফি তোলা। সুযোগ থাকলে পংক্তি ভোজনও হয়ে যাচ্ছে কোথাও কোথাও। একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাচ্ছে বাউলদের সঙ্গে।

Advertisement

যাঁরা এই সব মেলার আয়োজন করছেন, তাঁদের অধিকাংশই বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। কেউ ব্যবসা করেন, কেউ ফ্যাশন ডিজাইনার, কেউ বা রেস্তোরাঁ চালান। কেউ আবার আর্ট কলেজের ছাত্র, কেউ গবেষণা করছেন, কেউ পেশাদার চিত্রকর কিংবা গ্রুপ থিয়েটারে অভিনয় করেন। কিন্তু কাজের ফাঁকে এঁরা সারা বছরই যে যার নিজের মতো করে বাউল-ফকিরদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেন। ওঁরা জানাচ্ছেন, সারা বছরই ছন্নছাড়া থাকেন সবাই। মেলার সময় হলেই ফের একজোট হয়ে যান। মেলার আয়োজন করতে হবে যে!

যাদবপুরে শক্তিগড়ের মাঠের এমনই এক উৎসব এ বছর পা দিচ্ছে তেরো বছরে। বাউল, ফকিরেরাও এই মেলায় আসার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। এই মেলার পিছনে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে দুই তরুণ চিত্রশিল্পী দিলীপ ঘোষ এবং মানস আচার্য অন্যতম। গত কয়েক বছর ধরে ডিসেম্বর পড়লেই দিলীপ, মানসদের সঙ্গে ওঁদের বন্ধুরা শুরু করে দেন মেলার প্রস্তুতি। এই ভাবেই প্রতি বছর নানা টানাপড়েনের মধ্যে চাঁদা তুলে, কিছু বিজ্ঞাপন ছেপে শেষ পর্যন্ত যাদবপুরের একটি উৎসব হয়ে চলেছে ওঁদেরই উৎসাহ ও পরিশ্রমে। সারা রাত শক্তিগড়ের মাঠে গান হয়, মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকে না। দিলীপ বলেন, মানুষের দাবি মেনেই চালিয়ে যেতে হবে এই মেলা।

দক্ষিণ কলকাতার পাটুলিতে ডিসেম্বরের গোড়াতেই শেষ হল একটি মেলা। গত তিন বছর ধরে এই মেলাতেও আসছেন বহু স্বনামধন্য বাউল-ফকিরেরা। এ মাসের শেষ সপ্তাহে কসবার হালতুতে শুরু হচ্ছে আর একটি উৎসব। শীতের শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত নাকতলার বাউল উৎসবও মানুষের কাছে ক্রমশ পরিচিতি পাচ্ছে। এ ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে সরকারি উদ্যোগে এবং শীতের মরসুমে শহরের নানা মেলায় বাউলদের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে। প্রয়াত লোকশিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের উদ্যোগে রবীন্দ্র সদনে বাউল-ফকিরদের নিয়ে যে উৎসব শুরু হয়েছিল, সেটি আজ মানুষের কাছে বেশ পরিচিত। শহরের একটি সংগঠনের সুফি গানের উৎসব তো বাংলার বাউলদের আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়েছে। ওই সংগঠনের প্রধান অমিতাভ ভট্টাচার্য মনে করেন, তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের উদ্যোগে এই ধরনের মেলাগুলি নতুন প্রাণ পাচ্ছে। সেখানে প্রাণ খুলে গান গাইছেন শিল্পীরা। তাঁর কথায়, এই মেলাগুলির সৌজন্যে নতুন করে শহরে লোকসঙ্গীতের এক আবহ তৈরি হচ্ছে। শহর ও গ্রাম— দু’জায়গার শিল্পীরাই পারস্পরিক আদানপ্রদানে সমৃদ্ধ হচ্ছেন।

নাকতলা একটি গানমেলার অন্যতম উদ্যোক্তা সুমন দাম বলেন, ‘‘এই মেলা করার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে গ্রামবাংলার বাউল-ফকিরদের সঙ্গে শহরের মানুষের একটা বন্ধন তৈরি করা। তাঁদের গান, জীবন, ভাবনার সঙ্গে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।’’ একই রকম কাজ করে চলেছেন তরুণ শিল্পী দেব চৌধুরী। তাঁর কথায়, লোকসঙ্গীতের নগরায়ণ প্রয়োজন, তবেই বাউল-ফকির-দরবেশরা মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবেন।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাউলদের জীবনযাপন, গান, দর্শন নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন লীনা চাকী। তাঁর মতে, কলকাতায় বাউল গান নিয়ে গোটা একটা মেলা হওয়া মানে মানুষ তাঁদের গান কতটা ভালবাসে, তা যাচাই করে নেওয়া। তিনি বলেন, ‘‘ওঁদের গানের টানে সবাই কি জয়দেব বা পৌষ মেলায় যেতে পারেন! এ নিয়ে বহু মানুষের খেদ শুনেছি। কলকাতার বুকে বাউল মেলার ভিড় দেখলেই বোঝা যায়, সেই সব মানুষেরা মনের খোরাকটা ভালই পান।’’

নদিয়ার গৌড়ভাঙ্গার শিল্পী মনসুর ফকিরের মতে, শহরে যত মেলা হবে ততই গ্রামবাংলার বাউল-ফকিরদের মানুষ চিনতে পারবেন। জানতে পারবেন লালনের কথা, তাঁর দর্শন, তাঁর মানবতাবোধ। তিনি বলেন, ‘‘শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লে বাংলার লোকগানের এই সম্পদকে মানুষ আরও বেশি করে মূল্য দিতে শিখবেন।’’

আসলে কলকাতার এই মেলাগুলিই এখন হয়ে উঠেছে গ্রামের মেলার ছোট সংস্করণ। পিলে-পুঠি, ঘুঘনি-রুটি, বাউলদের পোশাক, ব্যাগ, অলঙ্কারের দোকান, গানের কর্মশালার সঙ্গে আখড়ার গান মিলিয়ে শহরের মধ্যেই মেঠো গানের একটা আবহ তৈরি হচ্ছে। ভিড় বাড়ছে মানুষের।



Tags:
Baul Festivalবাউল উৎসব

Advertisement