E-Paper

সুবিচার পেলাম কই, হতাশায় পহেলগামে নিহত বিতানের মা-বাবা

বিতানের মৃত্যুর এক বছর পরে এখনও চোখের জলই সঙ্গী। আর কোনও সম্বল নেই তাঁদের, জানালেন মায়া। তিনি বলেন, ‘‘অনেক প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলাম। আমরা দুই বুড়ো-বুড়ি রাজ্য সরকার ছাড়া আর কোনও জায়গা থেকে আর্থিক সাহায্য পাইনি।”

আর্যভট্ট খান

শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫১
নিঃস্ব: কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলায় নিহত বিতান অধিকারীর বাবা-মা। বেহালার বাড়িতে। সোমবার।

নিঃস্ব: কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলায় নিহত বিতান অধিকারীর বাবা-মা। বেহালার বাড়িতে। সোমবার। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

‘‘অপারেশন সিঁদুর তো হয়েছে। কিন্তু আমার ছেলের বুকে যারা গুলি চালিয়েছিল, তাদের কী শাস্তি হল? তাদের যদি শাস্তিই না হয়ে থাকে, তা হলে আর আমরা বিচার পেলাম কই? আমার ছেলের সঙ্গে বাকি যাঁরা পহেলগামের বৈসরন উপত্যকায় প্রাণ হারালেন, তাঁদের পরিবারও কি কোনও বিচার পেল? এক বছর তো কেটে গেল সেই জঙ্গি হামলার।‌’’

বড়িশার ১৮বি কৈলাস ঘোষ রোডের দোতলা বাড়ির একতলার ঘরে তখন তপ্ত বিকেলের রোদ এসে পড়েছে। জানলার শিক ধরে দাঁড়িয়ে হতাশ গলায় কথাগুলো বলছিলেন পহেলগামে জঙ্গি হামলায় নিহত বিতান অধিকারীর মা মায়া অধিকারী। কথা বলতে বলতে মাঝেমধ্যেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছিলেন। পাশে টুলে বসা তাঁর স্বামী বীরেশ্বর অধিকারীর চোখে-মুখে শূন্যতা। মায়া বলতে থাকেন, ‘‘ছেলে কাজের সূত্রে আমেরিকার ফ্লরিডায় থাকত। রোজ সকালে আমাদের ভিডিয়ো কল করত। তখন অবশ্য ওই দেশে রাত। এখনও মাঝেমধ্যে মনে হয়, এই বুঝি ভিডিয়ো কল এল ছেলের। পহেলগামে যা হয়েছে, সব মিথ্যা!’’

বিতানের মৃত্যুর এক বছর পরে এখনও চোখের জলই সঙ্গী। আর কোনও সম্বল নেই তাঁদের, জানালেন মায়া। তিনি বলেন, ‘‘অনেক প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলাম। আমরা দুই বুড়ো-বুড়ি রাজ্য সরকার ছাড়া আর কোনও জায়গা থেকে আর্থিক সাহায্য পাইনি। আমাদের তো শরীর এখন অশক্ত। ওষুধের উপরে নির্ভরশীল। হাঁটতে গেলে হাঁটুতে ব্যথা হয়। আমাদের কথা কেউ ভাবে না।’’

পহেলগামের জঙ্গি হানায় নিহত আর এক জন, বেহালার শখেরবাজারের বাসিন্দা সমীর গুহ। সোমবার তাঁর বাড়িতে গেলেও স্ত্রী শবরীর দেখা মেলেনি। পরে ফোন করেও উত্তর মেলেনি। বৈষ্ণবঘাটা বাইলেনে বিতানের স্ত্রী সোহিনীর ফ্ল্যাটে গিয়ে তাঁরও দেখা পাওয়া যায়নি। তিনিও ফোন ধরেননি। সোহিনী কাজে গিয়েছেন, ফিরতে রাত হবে বলে জানান তাঁর বাড়ির লোকজন।

বীরেশ্বর ও মায়াকে এখন দেখাশোনা করেন তাঁদেরই এক আত্মীয় শ্রীবাস চক্রবর্তী। বাড়িতে এসে মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নিয়ে যান তিনি। বীরেশ্বর বলেন, ‘‘শ্রীবাসই এখন আমাদের বড় ভরসা।’’ মায়া বলেন, ‘‘সকলের তো কাজ আছে। আমাদের তেমন কিছু নেই। অপেক্ষা করছি, কবে ছেলের কাছে যাব। তবে, নাতিকে দেখতে ইচ্ছে করে মাঝেমধ্যে। কত দিন ওকে দেখিনি!’’ বীরেশ্বর বলেন, ‘‘গত বছরের পয়লা বৈশাখের দিন ছেলে ফোন করে প্রণাম জানাল। বলল, কাশ্মীর থেকে ফিরেই বাড়িতে আসবে। কিন্তু কে জানত, ও কফিনবন্দি হয়ে কাশ্মীর থেকে ফিরবে?’’

দুর্গাপুর স্টিল প্লান্টের আধিকারিক ছিলেন বীরেশ্বর। সারা কর্মজীবনই দুর্গাপুরের এ জ়োনের কোয়ার্টার্সে কেটেছে। তিনি বলেন, ‘‘বৃদ্ধা মা এবং আত্মীয়স্বজন আমার উপার্জনের উপরে অনেকটা নির্ভরশীল ছিলেন। তাই সারা কর্মজীবনে খুব বেশি ঘুরতে পারিনি। বিতান যখন কলেজে পড়ত, সেই ২০০৬ সালে সপরিবার আন্দামান ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেই ঘোরার স্মৃতিগুলি এখন খুব মনে পড়ে। বিতান বলেছিল, বাবা চাকরি পেয়ে তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাব। ছেলের সঙ্গে আর ঘুরতে যাওয়া হল না।’’

৮০ বছরের বীরেশ্বরের এখন মাঝেমধ্যে স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়। তবে বিতানের সব কিছুই যেন টাটকা মনে পড়ে। বীরেশ্বর বলেন, ‘‘২০১৬ সালে আমেরিকা চলে গেল। ওখানে করোনার সময়ে রোজ ভিডিয়ো কল করে আমাদের দেখাত, কী রান্না করছে। এ দেশে যে কোনও দিন রান্নাঘরে ঢোকেনি, সে ওখানে বিরিয়ানি রান্না করা দেখাত।’’

৭৫ বছরের মায়া শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন আর ঘর তেমন গুছিয়ে রাখতে পারেন না। অগোছালো বসার ঘরের দেওয়ালে বড় করে তাঁদের গুরুদেবের ছবি টাঙানো। রয়েছে বীরেশ্বর আর মায়ার যৌবনের ছবিও। ‘‘দেওয়ালে বিতানের ছবি নেই কেন জানেন?’’ মায়া নিজে প্রশ্ন করে নিজেই বলেন, ‘‘জানি, বিতানের ভিডিয়ো কল আর আসবে না। তবু মাঝেমধ্যেই এখনও সকালে মোবাইলের দিকে চোখ চলে যায়। ফোনটা কি আবার বেজে উঠল?’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Pahalgam Terror Attack Pahalgam Incident

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy