E-Paper

ট্রেলারে পিষ্ট ঝুপড়িবাসী বালিকা, বিচার চান ক্ষুব্ধ মা

সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ পশ্চিম বন্দর থানা এলাকার গার্ডেনরিচ রোড এবং নিমক মহল রোডের সংযোগস্থলে ট্রেলারে ধাক্কা খেয়ে সেটির চাকার নীচে চলে যায় সৃষ্টি যাদব (৯) নামে এক বালিকা। নিমক মহল রোডের ধারেই একটি ঝুপড়িতে থাকত সৃষ্টি।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৬
হাহাকার: সৃষ্টি যাদবের মৃত্যুর পরে পরিজনেরা। সোমবার, গার্ডেনরিচে।

হাহাকার: সৃষ্টি যাদবের মৃত্যুর পরে পরিজনেরা। সোমবার, গার্ডেনরিচে। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।

‘বিচার চাই, বিচার চাই!’ সংবাদমাধ্যমের গাড়ি দেখেই রক্ত মাখা জুতোর প্যাকেট নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হুড়মুড়িয়ে ছুটে এলেন সদ্য সন্তানহারা মা। ঝুপড়ির বাসিন্দা। স্বামী কলের মিস্ত্রি। কয়েক ঘণ্টা আগেই বস্তির অদূরে একটি ট্রেলারের নীচে চাপা পড়েছে তাঁদের ছোট মেয়ে। তার পরে দেখেছেন চালকের ঔদ্ধত্য। অভিযোগ, শুরুতে গোলমাল এড়াতে পুলিশ থানার দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে অবশ্য ট্রেলারচালককে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু মেয়েকে হারিয়ে ক্ষতিপূরণের চেয়েও মা-বাবার কাছে প্রধান হয়ে উঠেছে ন্যায়বিচার।

সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ পশ্চিম বন্দর থানা এলাকার গার্ডেনরিচ রোড এবং নিমক মহল রোডের সংযোগস্থলে ট্রেলারে ধাক্কা খেয়ে সেটির চাকার নীচে চলে যায় সৃষ্টি যাদব (৯) নামে এক বালিকা। নিমক মহল রোডের ধারেই একটি ঝুপড়িতে থাকত সৃষ্টি। এ দিন ওই সময়ে দিদি মুসকানের সঙ্গে সাইকেলে চেপে স্কুলে যাচ্ছিল সে। সাইকেলটি দু’তিন মাস আগে কেনা। দিদি বারণ করা সত্ত্বেও এ দিন সাইকেলে চেপে স্কুলে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেছিল সৃষ্টি। আর সেই সাইকেল দুর্ঘটনাতেই প্রাণ গেল বালিকার।

প্রচুর সংখ্যক লরি এবং ট্রেলার চলে বলে বন্দর এলাকা সব সময়েই দুর্ঘটনাপ্রবণ। ট্র্যাফিক-বিধি ভাঙলেও পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে লরি ও ট্রেলারগুলিকে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ দিন সৃষ্টির মা পূর্ণিমা সেই অভিযোগ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা ঝুপড়িতে থাকি বলে আমাদের জীবনের দাম নেই? দশ টাকা করে নিয়ে পুলিশ লরিগুলিকে ইচ্ছে মতো চলার অনুমতি দেয়। আজ তার জেরেই আমার মেয়েটা চলে গেল। ট্রেলারটি উল্টো পথে ঢুকতে গিয়ে আমার মেয়েদের সাইকেলে ধাক্কা মারে। মেয়েকে চাপা দেওয়ার পরে ট্রেলারচালক মেয়েদের উপরে দোষ চাপিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। পরে অবশ্য ধরা পড়েছে। আমাদের ক্ষতিপূরণ দরকার নেই। আমাদের বিচার চাই। ওই চালকের যেন কঠিন সাজা হয়।’’

প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে মেয়ের রক্ত লাগা চটি জোড়া বার করে হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন পূর্ণিমা। তিনি জানান, এক সিভিক ভলান্টিয়ার বড় মেয়েকে রাস্তা থেকে তুলে স্থানীয় রেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। ছোট মেয়ে তখনও রাস্তায় পড়ে। পূর্ণিমার কথায়, ‘‘ট্রেলারচালকের শরীরে এতটুকু দয়ামায়া নেই! ওই অবস্থায় বাচ্চাটিকে রাস্তায় ফেলে চলে গেল! আমরা গরিব মানুষ। ঝুপড়িতে থাকি। জানি না সত্যিই এর বিচার পাব কিনা।’’

স্থানীয় এক গ্যারাজকর্মী জানান, আগে সৃষ্টি ভিতরের রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেত। কিন্তু সম্প্রতি দুই বোন সাইকেলে চেপে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল। স্কুলে সব চেয়ে ছোট ছিল সৃষ্টি। দিদি মুসকানের কথায়, ‘‘আমি বোনকে বলেছিলাম হেঁটে স্কুলে যেতে। কিন্তু ছোট বোন বায়না ধরে বলল পায়ে ব্যথা। সাইকেলে চেপে স্কুলে যাবে। ও সাইকেলের পিছনে বসে ছিল। লরিটা আচমকাই ডান দিকে ঘুরে আমাদের বাজে ভাবে চেপে দিল।’’ স্থানীয় বস্তিবাসীরা দেখালেন, গার্ডেনরিচ রোড এবং নিমক মহল রোডের সংযোগস্থলে একাধিক সিসি ক্যামেরা রয়েছে। তাঁদের দাবি, ওই জায়গায় বিপজ্জনক গতিতে গাড়ি চলে। লরি, ট্রেলার কোনও নিয়ম মানে না। এ দিন কী ভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে, ফুটেজ খতিয়ে দেখলেই তা জানা যাবে।

দিনকয়েক আগে লেনিন সরণিতে মত্ত লরিচালক পিষে দেন এক ফুটপাতবাসীকে। ধরা পড়লেও পরের দিনই জামিন পেয়ে যান। এ দিনের ঘটনায় পুলিশ গাফিলতির জেরে মৃত্যুর মামলা রুজু করেছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Accidental Death Garden Reach

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy