জামাইয়ের বিরুদ্ধে মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে আগেও একাধিক বার পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন বাবা। রিজেন্ট পার্ক থানার হস্তক্ষেপে বিষয়টি মিটমাট হয়ে গেলেও স্ত্রীর উপরে নির্যাতন থামেনি। শুক্রবার গভীর রাতে রিজেন্ট পার্ক থানা এলাকার শ্বশুরবাড়িতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু হল রিয়া দাস (২৮) নামে সেই তরুণীর। এই ঘটনায় মৃতার স্বামী ও শাশুড়িকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, বছর ছয়েক আগে বাঁশদ্রোণীর নিরঞ্জনপল্লির বাসিন্দা রিয়ার সঙ্গে রিজেন্ট পার্ক এলাকার শীতলা পার্কের বাসিন্দা অ্যান্টনির বিয়ে হয়। অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই অ্যান্টনি পণের দাবিতে স্ত্রীর উপরে অত্যাচার শুরু করে। রিয়া প্রায়ই বাবা-মায়ের বাড়ি চলে যেতেন বলে পরিবার সূত্রের খবর। শীতলা পার্কের বাড়িতে মা, তিন বছরের মেয়ে ও স্ত্রী রিয়াকে নিয়ে থাকত পেশায় গাড়িচালক অ্যান্টনি। পুলিশ জেনেছে, শুক্রবার রাত বারোটা নাগাদ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাড়িতে ঢোকে অ্যান্টনি। রিয়া খাবার দিতে দেরি করায় চিৎকার শুরু করে সে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তর্কাতর্কি হওয়ার সময়ে অ্যান্টনি রিয়ার বাবাকে ফোন করে গালিগালাজ শুরু করে। রিয়া প্রতিবাদ করেন। এর পরেই তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। পুলিশ জানিয়েছে, ঝগড়াঝাঁটির পরে অ্যান্টনি শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, এর পরেই গভীর রাতে অগ্নিদগ্ধ হন রিয়া। তাঁকে উদ্ধার করে এম আর বাঙুরে নিয়ে গেলে চিকিৎকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
নিরঞ্জনপল্লিতে ছোট্ট পানের দোকান রিয়ার বাবা গোপাল পালের। গোপালবাবু শনিবার বলেন, ‘‘রাত দে়ড়টা নাগাদ সবে দোকান থেকে বাড়ি ঢুকেছি। মোবাইলে জামাই ফোন করে মেয়ের নামে উল্টোপাল্টা কথা বলতে শুরু করল। আমাকেও খুব গালিগালাজ করল। ও আমার ঘরের সামনে চলে এসেছে বুঝতে পেরে, ভয়ে আর দরজা খুলিনি।’’ তাঁর অভিযোগ, ‘‘মেয়েকে নিয়ে ও ভাল ভাবে সংসার করুক, এটাই চেয়েছিলাম। বিয়ের পর থেকেই মেয়ের উপরে অত্যাচার করত জামাই। থানায় গিয়ে নালিশ করেছিলাম। তখন জামাই লিখে দিয়েছিল যে, এমন আর ঘটবে না। জামাইকে এত বোঝানো সত্ত্বেও মেয়েকে আর বাঁচাতে পারলাম না।’’ এ দিন রিয়াদের বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, তাঁর মা রুমা পাল বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে ভিড় করেছেন প্রতিবেশীরা।
গোপালবাবু ও রুমাদেবীর তিন মেয়ে। স্থানীয়েরা জানান, মেজ মেয়ে রিয়া পড়াশোনায় ভাল ছিলেন। রুমাদেবীর আক্ষেপ, ‘‘দর্শনে অনার্স নিয়ে পাশ করার পরে আর্থিক অনটনের জন্য মেয়েকে আর পড়াতে পারিনি। ও বরাবর ভাল নম্বর পেত। বিয়ের পর থেকেই ওর জীবনটা বদলে গেল। আমার সুন্দর মেয়েটার অকালমৃত্যুর জন্য জামাইয়ের ফাঁসি চাইছি।’’ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্বামী অ্যান্টনি মারধর করায় গত বৃহস্পতিবার একরত্তি মেয়েকে নিয়ে রিয়া বাবা-মায়ের কাছে চলে এসছিলেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় স্বামী ফোন করায় রিয়া ফের শ্বশুরবাড়িতে যান। রিয়ার বোন পূজা মিত্র বলেন, ‘‘মাস কয়েক আগে দিদির শ্বশুরবাড়ির পাড়ায় টিউশন পড়াতে যাওয়ার সময়ে কোলে মেয়েকে নিয়ে দিদিকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। জিজ্ঞাসা করায় বলেছিল, জামাইবাবুর ঋণের টাকা শোধ না হওয়ায় ওঁকে মারধর করেছে।’’ মৃতার পিসি স্বপ্না দত্তের অভিযোগ, ‘‘বিয়ের পর থেকেই জামাই খুব অত্যাচার করত রিয়ার উপরে। সিগারেটের ছেঁকা দিয়ে ওর শরীরের একাধিক অংশ পুড়িয়ে দিয়েছিল। এই নিয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও অ্যান্টনি নিজেকে বিন্দুমাত্র শোধরায়নি।’’
ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই মৃতার স্বামী অ্যান্টনি দাস ও শাশুড়ি দীপালি দাসকে আটক করে রিজেন্ট পার্ক থানায় পুলিশ। পরে বধূ নির্যাতনের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।