এক ব্যক্তি, বহু পদ।
কোনও সংগঠনই হোক বা প্রশাসন, এমনটাই এখন প্রায় রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজনের হাতে দেওয়া হচ্ছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব। কখনও তিনি মন্ত্রী, কখনও বা সচিব। ফলে প্রশ্ন উঠছে কাজের মান ও দক্ষতা বজায় রাখা নিয়ে। অনেকেরই বক্তব্য,এক ব্যক্তির হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকলে কি আদৌ সব কাজে নজরদারি ঠিক মতো হয়?
অথচ এই ধারা মেনেই এক ব্যক্তি বহু পদের নীতিতে আস্থা প্রকাশ করেছে কলকাতা পুরসভা। যেমন, এই মুহূর্তে কলকাতা পুরসভায় এমন একজন ডিজি রয়েছেন যাঁর হাতে চারটি দফতর। রাস্তা, বস্তি, শহর পরিকল্পনা (টাউন প্লানিং) এবং ১০০ দিনের কাজ। তিনি সৌমিত্র ভট্টাচার্য, যিনি অরবিন্দ সেতুর হাল জেনেও দু’বছর ধরে চুপ করে ছিলেন। আর এক জন ডিজি হলেন দেবাশিস চক্রবর্তী, যিনি আবার বিল্ডিং (২) এবং পার্ক ও উদ্যানের দায়িত্বে।
একই ব্যক্তির হাতে একাধিক দফতর দেওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ পুরসভার একাধিক আমলা ও বেশ কয়েকজন মেয়র পারিষদ জানান, প্রাত্যহিক কাজের ক্ষেত্রে এর জন্য নানা অসুবিধা পোহাতে হচ্ছে তাঁদের। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ দিয়ে পুরসভার এক আমলা জানান, কর-মূল্যায়ন দফতরে একজন চিফ ম্যানেজারের হাতে পুরো কলকাতার কর আদায়ের দায়িত্ব ছিল। কসবা-বোসপুকুরে একটি জমির মিউটেশন নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। পরে সেই অফিসারকে সরিয়ে দিয়ে তিন জন চিফ ম্যানেজারের হাতে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে সেই কাজ। তাতে আখেরে উপকারই হয়েছে।
পুরসভা সূত্রে খবর, বড় রাস্তা, অলিগলি, লেন ও বাই লেন-সহ মোট ৪ হাজার রাস্তা রয়েছে কলকাতায়। একক ভাবেই শহরের রাস্তা ঠিক রাখা এবং সারানোর কাজে চাপ রয়েছে। বস্তির সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি। ওই দুই দফতরেরই মিলিত কাজে হিমসিম খেতে হয়। পরিকল্পনার অভাবে বস্তির জন্য বরাদ্দ কেন্দ্রীয় সরকারের কোটি কোটি টাকা ফেরতও গিয়েছে। ওই দুই কাজের সঙ্গে
টাউন প্লানিং এবং ১০০ দিনের কাজের দেখভালের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে ডিজি রাস্তাকে। যা একেবারেই অবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে করা হচ্ছে।
একই ভাবে শহর জুড়ে বেআইনি নির্মাণ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত পুর-প্রশাসন। বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে শাসক ও বিরোধী দলের একাধিক কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। কিন্তু তা সামাল দেওয়া তো দূরে থাক, প্রতিদিনই বাড়ছে তার সংখ্যা। এ দিকে, ওই দফতরের ডিজির হাতে দেওয়া হয়েছে পার্ক ও উদ্যানের দায়িত্বও। শহরে পার্কের সংখ্যা প্রায় সাতশো। বেআইনি নির্মাণ আটকানোর পরে কয়েকশো পার্ক দেখভালের দায়িত্ব ভাগ করে দিলেই কাজের সুবিধা হত বলে মত পুরসভার এক আমলার।
উদাহরণ আরও আছে। কলকাতা পুরসভার ৮ নম্বর বরোর বিল্ডিং দফতরের দায়িত্বে রয়েছেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার অসিত মণ্ডল। বর্তমান পুরবোর্ডের ‘বিশ্বাসভাজন’ বলে তাঁকে অবসরের পরেও টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার পদে বসিয়ে রাখা হয়েছে। যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ওই এলাকার অফিসার ও কাউন্সিলরদের মধ্যেও।
কোনও আমলা বা আধিকারিকের ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ না করেও একটি বিষয় সামনে আসে। তা হল, কলকাতার মতো বড় এবং বিবিধ সমস্যাপূর্ণ শহরে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক কাজের দায়িত্ব এক জনের উপরে ছেড়ে রাখার কারণ কী? এতে কি কাজের সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি হয় না? কলকাতা পুরসভায় কি ইঞ্জিনিয়ারেরও অভাব রয়েছে? মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় অবশ্য দাবি করেন, ‘‘যাঁরা যোগ্য, তাঁদের হাতেই একাধিক দফতর দেওয়া হয়েছে।’’ সেই যোগ্যতার মাপকাঠি মেয়র স্পষ্ট করেননি। কোথায়, কী ভাবে সেই ‘যোগ্যতা’ নির্ধারিত হয়, স্পষ্ট হয়নি তা-ও।
তবে প্রাক্তন মেয়র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতে, ‘‘শোভনবাবুর কাছে যোগ্য তাঁরাই, যাঁদের উপর ওঁর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। হয়তো কেউ টাকা ‘তুলে’ দিতে পারলে মেয়রের নেক নজর পান। আসলে মেয়রের কথা শুনে যাঁরা চলবেন না, এখানে তাঁরাই অযোগ্য।’’ কংগ্রেস কাউন্সিলর প্রকাশ উপাধ্যায়ের অভিযোগ, ‘‘পরিষেবা ছেড়ে এখন ব্যক্তিগত লাভের অঙ্ক কষছেন মেয়র অ্যান্ড কোম্পানি। তাই নিজেদের পছন্দের লোককে বসিয়েছেন।’’
দীর্ঘদিন প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যাঁরা, তাঁরা কী ভাবে দেখেন এই ব্যবস্থাকে? রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব অর্ধেন্দু সেনের বক্তব্য, ‘‘এটি সুষ্ঠ প্রশাসনের নিদর্শন নয়। এর ফলে পরিষেবা বিঘ্নিত হয়।’’ কাজের গতি এবং মান বাড়াতে পদস্থ ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ায় ভাল প্রশাসনিক ব্যবস্থার লক্ষ্য বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কথায়, ‘‘কেউ পছন্দের লোক বলে তাঁকে বেশি দায়িত্ব দেওয়া আখেরে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিই করে।’’