আলাপ-পরিচয় হয়েছিল সমাজমাধ্যমে। তার পরেই ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় তরুণীর সঙ্গে। প্রথম বার দেখা করতে এক দিন সেই তরুণীর পাঠানো ক্যাফের ঠিকানায় পৌঁছে যান যুবক। অল্প কিছু খাওয়াদাওয়া আর গল্পে ঘণ্টাখানেক সময় কাটান দু’জনে। এ পর্যন্ত সব ঠিক থাকলেও তাল কাটে বিল আসার পরে। কয়েক কাপ কফি আর অল্পস্বল্প কিছু খাবারের আকাশছোঁয়া দাম ধরা হয়েছে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান যুবক। তার পরেই খেয়াল করেন, সঙ্গে থাকা তরুণী চম্পট দিয়েছেন।
মাসকয়েক আগে ডেটিংয়ে গিয়ে এ ভাবেই প্রতারণার শিকার হয়ে সমাজমাধ্যমে নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন শহরের বাসিন্দা এক যুবক। কয়েক কাপ কফির দাম কী ভাবে প্রায় ১০ হাজার টাকা হতে পারে, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি। শুধু ওই যুবক নন, গত কয়েক মাসে ডেটিংয়ের নামে এ ভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন একাধিক যুবক। লালবাজার যদিও মনে করছে, এই গোটা বিষয়টির পিছনে একটি চক্র কাজ করছে। তদন্তকারীদের একাংশ জানাচ্ছেন, প্রতারণার এই পদ্ধতিকে ‘হানিট্র্যাপ বিলিং ফ্রড’ বলে। এতে একাধিক ব্যক্তি বা চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তাঁরা। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের ঘটনার অভিযোগ আগেও উঠেছে। যদিও তদন্তকারীদের ব্যাখ্যা, বহু ক্ষেত্রে লোকলজ্জা বা সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে অনেকেই থানায় অভিযোগ করেন না। ফলে, বাড়বাড়ন্ত হয় প্রতারকদের।
মাসকয়েক আগে এমনই একটি ঘটনায় প্রায় ২৮ হাজার টাকা খুইয়ে রবীন্দ্র সরোবর থানায় অভিযোগ করেছিলেন বেহালার বাসিন্দা এক যুবক। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত ওই যুবকের অভিযোগ, সমাজমাধ্যমে এক তরুণী মেসেজ পাঠিয়েছিলেন তাঁকে। কয়েক দিন পরে ওই তরুণী গড়িয়াহাটের কাছে এক জায়গায় দেখা করার কথা বলেন। যুবকের দাবি, তরুণী তাঁকে রবীন্দ্র সরোবর সংলগ্ন একটি ক্যাফেতে নিয়ে যান। দু’জনে সেখানে অল্প খাওয়াদাওয়া করেছিলেন। যুবকের কথায়, ‘‘খাওয়ার পরে ‘কয়েক মিনিটে আসছি’ বলে মেয়েটি উঠে গিয়েছিল। তখনই ক্যাফে কর্তৃপক্ষ বিল দেন। সেই বিলে অবিশ্বাস্য রকম বেশি অঙ্ক দেখে মেয়েটির খোঁজ করে জানতে পারি, সে আগেই বেরিয়ে গিয়েছে। ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।’’ ক্যাফে কর্তৃপক্ষের চাপে পড়ে সেই মোটা অঙ্কের বিল মিটিয়েই তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছিল বলে অভিযোগ ওই যুবকের। কর্তৃপক্ষ এবং তরুণীর যোগসাজশেই এই প্রতারণা-চক্র চলছে বলে সন্দেহ তাঁর। সেই মর্মেই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন তিনি।
গত কয়েক বছরে একাধিক এমন ডেটিং-প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে শহরে। অ্যাপ-ভিত্তিক বন্ধুত্বের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হয়েছেন অনেকেই। লালবাজারের দাবি, ডেটিং অ্যাপ নিয়ে মাঝেমধ্যেই অভিযোগ আসে। ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। গত বছরের অক্টোবরে মিন্টো পার্ক এলাকায় ডেটিং অ্যাপ চালানোর অভিযোগে ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। যার মধ্যে ১৬ জনই ছিলেন তরুণী। কিন্তু অ্যাপ-নির্ভর না হয়েও এ ভাবে ‘ডেটিং-প্রতারণা’ নতুন বলে মনে করছে অভিজ্ঞ মহল। লালবাজারের এক কর্তার কথায়, ‘‘এই চক্রের পিছনে কারা জড়িত, তা দেখা হচ্ছে।’’
হোটেল অ্যান্ড রেস্তরাঁ অ্যাসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি সুদেশ পোদ্দার বলেন, ‘‘বিষয়টি জানা নেই। আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেননি। তবে পুলিশ যদি তদন্তে আমাদের সাহায্য চায়, তা হলে অবশ্যই করা হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)