Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

আমার কাছে পৃথিবীর সেরা শহর কলকাতা

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১৫:২৮

আমার জন্ম আলিপুরের এক হাসপাতালে। এখন স্থায়ী ঠিকানা নাকতলা। কিন্তু বাবার চাকরি এবং বাড়ি শিফটিংয়ের সূত্রে নানান জায়গায় থেকেছি। দমদম, মেদিনীপুর।লোয়ার কেজি থেকে কলেজের ফার্স্টইয়ার পর্যন্ত বারাসতেই কেটেছে।উচ্চমাধ্যমিক বারাসত মহাত্মা গাঁধী মেমোরিয়াল হাইস্কুল থেকে। এর পর বিপি পোদ্দার ইনস্টিটিউট অবম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে বিটেক।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি,সেই সব মানুষের দলে পড়ি, যারা কলকাতাকে পৃথিবীর সেরা শহর বলে মনে করে। তবে শুধুমাত্র মানুষকে বলার জন্য মনে করা নয়। এটা একদমই মন থেকে।

ছোটবেলায় কাকু এবং মায়ের সঙ্গে অ্যাকাডেমি, রবীন্দ্রসদন চত্বরে আসতাম। তখন আমার কলকাতাকে চেনার পরিধিটা এই বৃত্তেই ঘোরাফেরা করত।এ সময় ছবি আঁকা শিখছি, প্র্যাকটিস করছি। অ্যাকাডেমির সাউথ গ্যালারির প্রদর্শনীতে আমার ছবিও স্থান পেয়েছে। তখন ক্লাস টু-থ্রি-তে পড়ি।

Advertisement

আরও পড়ুন, থিমের ভিড়ে সামিল সরকারি প্রকল্পও

কলকাতার বাজার, কলকাতার রাস্তাঘাট, অলিগলির সঙ্গে পরিচয় ঘটতে থাকে কলেজ লাইফে। যখন আমি ছবি তুলছি তখন থেকে। এই সময় থেকেই কলকাতার স্ট্রিটফুড এক্সপ্লোর করতে শুরু করি। কলকাতায় আমি এক ফোটোগ্রাফার কাকুর সঙ্গে ছবি তুলতে আসতাম। তাঁর পুরনো একটা এসএলআর ছিল, ওটা দিয়েই ক্যামেরা হ্যান্ডেল করতে শেখা।

তবে আমি গানটাকে সিরিয়াসলি নিই অনেক পরে। যদিও আমার গানের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল গান শোনা দিয়েই। তখন আমিখুব ছোট। দুষ্টুমি করলেইদাদু শাস্তি দিত, এক ঘণ্টা একটা ক্যাসেট শুনতে হবে।প্রথম প্রথম শাস্তি মনে হলেও দু’-এক দিন পর থেকে আমার সেটা শাস্তি বলে মনে হয়নি। কারণ গান শুনতে আমার বেশ ভাল লাগত।

আমার প্রথম শোনা গানের জঁর-টাই ছিল গজল। যখন আমি হিন্দি বুঝতে শিখিনি, তখন থেকে গজল শুনছি।এছাড়া মা-কে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে শুনতাম। আসলে গান গাওয়ার থেকেও গানের সুর, বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ এগুলোআমাকে প্রথম ছুঁয়েছিল।

তিন বছর বয়সে মিউজিকে আমার প্রথম হাতেখড়ি তবলায়। শিখতাম আমার সেজদিদার কাছে। উনি তখনকার দিনে ট্রিপল ডক্টরেট ছিলেন, তবলা আর কত্থকে। সেই সময়ে আমার তবলা বাজাতেই বেশি ভাল লাগত।

আর গানে প্রথম হাতেখড়ি দাদুর কাছে। ‘দেখ রে নয়ন মেলে’ গানে হাতের জেসচার দিয়ে। সেটাও কিন্তু কলকাতার ঘটনা। কারণ আমার দাদু থাকেন কলকাতার সল্টলেকে।

তারপর সঠিকভাবে গান শিখতে শুরু করলাম ক্লাস ফাইভ থেকে। তখন আমার দশ বছর বয়স হবে। গানের তালিম নিই অরবিন্দ চক্রবর্তীর কাছে। তাঁর কাছে চণ্ডীগর ঘরানায় ক্লাসিক্যাল শিখেছি।আমার শুরুটাই হয়েছিল ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল দিয়ে। আমার প্রথম প্রেম তবলা হলেও, অদ্ভুত ভাবে যখন গান শিখতে শুরু করি, তবলা থেকে সরে আসতে থাকি। এখন কিন্তু আমার বাড়িতে একটা তবলাও নেই!

আরও পড়ুন, যাত্রী সুরক্ষায় ‘বন্ধু’ আনল উব্‌র

আমার ভাবনা-চিন্তা বা মনের বেড়ে ওঠা পুরোটাইকলকাতারবুকে। পড়াশোনা এবং খেলাধুলো বাদ দিয়ে বাকি যে সময়টা থাকত, সেটা পুরোটাই দিতাম গান শোনা, তবলা বাজানো বা ছবি আঁকায়। নয়তো কলকাতা এসে বিভিন্ন জায়গায়ঘুরে বেড়ানো।

বারাসত থেকে বউবাজারে এসে গান শিখতাম। গুরুজির কাছে ক্লাস ফাইভ থেকে টানা টুয়েলভ পর্যন্ত গান শিখেছি। আমি ট্রেনে করে উল্টোডাঙা আসতাম, সেখান থেকে ট্রামে করে বউবাজার।খুব মজার জার্নি ছিল।কলকাতা আমার অবচেতনে অনেক ছোট থেকেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল।

পড়াশোনা চলাকালীন গান নিয়ে সে ভাবে ভাবিনি। গানটা আমার জীবনে ফেরত আসে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফোর্থ ইয়ারে। এর আগের সময়টা গান থেকেঅনেকটা দূরে ছিলাম। সেই সময় কলেজের ফাঁকে বাকি সময়টায় পাগলের মতো ছবি তুলে বেড়াচ্ছি। এই ছবি তোলার সূত্রেই আমার উত্তর কলকাতাকে চেনা। এই অংশটা আমি পুরো পায়ে হেঁটে ঘুরেছি। শ্যামবাজারের গালিব স্ট্রিট হয়ে বাগবাজারের এসপ্ল্যানেড, বিবাদিবাগ, বড় বাজার হয়ে মৌলালি দিয়ে ঘুরে পুরো সার্কেলটা। কারণ সেই সময় কলকাতার ‘স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি’টা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। অনেক ভাল ফোটোগ্রাফার কলকাতা থেকে বেরিয়েছে, যারা এখন প্রতিষ্ঠিত।

এবার চলে আসি গানের কথায়। ফোর্থ ইয়ারে গানটা আবার ফিরে এল শৌনক রায় নামে আমার এক মিউজিশিয়ান বন্ধুর হাত ধরে। সেই সময় খুব হিড়িকও উঠেছিল, ওয়েস্টার্ন মিউজিকটা শুনব।ওর সূত্রেই আমার কাছে নতুন একটা জগতের দরজা খুলে যায়। এই সময় আমি দুটো জঁর-এর প্রেমে পড়ে যাই। ব্লুজ এবং জ্যাজ। এছাড়াও আমি তখন আরও অনেক ধারার মিউজিক শুনেছি। কিন্তু ঠিক বুঝিনি কী শুনছি। এর পর চাকরি করতে করতেও ওয়েস্টার্ন মিউজিক শুনে যেতে থাকি। কলেজ থেকে চাকরিজীবন এই দীর্ঘ আট বছরের মধ্যে আমি কখনও গাওয়ার চেষ্টা করিনি।

তবে এখন আমি যে গানটা গাই, লোকজন আমার ‘সিগনেচার’ বলে মনে করেন, সেটা কিন্তু ওই আট বছর গান না গাওয়ার জন্যই।

আমার গানের জগতে আসাটাও হয়তো একটা অ্যাক্সিডেন্ট। কারণ আমি একটা বন্ধুর জন্য ‘সারেগামাপা’র অডিশনের ফর্মের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম।তখন আমার বন্ধু আমাকে জোর করে অডিশনটা দেওয়ায়। কারণ আমি চলে আসতে চাইছিলাম।

মঞ্চে দুর্নিবার।



সারা জীবন আমি আমার এই বন্ধুকে ক্রেডিটটা দেব। কারণ সেদিন ও না থাকলে হয়তো আমি আজ এই জায়গায় থাকতাম না! এর পর অডিশনে আমি সিলেক্টও হয়ে যাই। কিন্তু তখনও বাড়িতে জানাইনি।

অডিশনের ঘটনাটা বেশ মজার। কারণ প্রথম অডিশনে আমি যে গানটা গাই, দ্বিতীয় অডিশনেও সেটাই গাই। বিচারকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর কী বাংলা গান আমি জানি। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া কোনও বাংলা গান জানিনা। তাঁরা খুব অবাক হয়েছিলেন। কারণ একটা রিয়েলিটি শো-এর অডিশনে, অ্যাপ্লিকান্টের এই উত্তর হওয়ার কথা নয়। সিলেকশন প্রসেসের মধ্যে একসঙ্গে প্রায় পঞ্চাশজনকে সিলেক্ট করা হয় প্রথমে। আর কুড়ি জন থেকে শুটিংটা শুরু হয়। এই সময়টাতে জানি না, কী ভাবে সারভাইভ করেছি! এই পঞ্চাশ জনের মধ্যে আমি সেকেন্ড ক্যান্ডিডেট ঢুকেছিলাম। প্রথম ঢুকেছিল ঋষি।

এই সময়টা তো ওখানেই থাকতে হয়। পরদিন সকাল বেলা যখন ঘুম থেকে উঠেছি, দেখলাম আমি বাদে সবাই গান গাইছে। এটা একটা ট্রমাটিক সিনারিও। কারণ তার আগের দিন পর্যন্ত জানতাম না যে, আমি গাইব। আর আমাদের পছন্দের গানের লিস্ট দিতে বলা হয়েছিল। তার মধ্যে কেউ কেউ আশি-নব্বইটা করে গানও লিস্টে দিয়েছিল। আর আমি দিয়েছিলাম মাত্র আটটা গান, কারণ আমি সত্যিই এর থেকে বেশি গান জানতাম না। ব্যান্ডের গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং গজল মিলিয়ে মিশিয়ে। তখন আমাকে দেখতে একদম অন্য রকম ছিল। দাড়ি-গোঁফ ছিল। কিন্তু এখন আমাকে ভদ্রভাবে থাকতে হয়। কারণ আমাকে শো-তে তেমন করেই দেখানো হয়েছে। যে কথাটা বলছিলাম। তখন এক একটা করে দিন কাটত আর আমি ভাবতাম, বাহ্ আমি থেকে গেলাম! আর মনে মনে অবাকও হতাম। কারণ ওখানে আমি যে সব গান গেয়েছিলাম, তার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটা গানই জানতাম। এটাও একটা লার্নিং প্রসেস ছিল। কারণ আমি এখন যেভাবে গানটা গাই তখন সে ভাবে গাইতাম না।‘সারেগামাপা’র ওই সময়টাতে আমি নতুন করে গান গাইতে শিখেছি। স্যার হিসেবে পেয়েছি শান্তনু (মৈত্র) দা, শুভা মুদগল, পলাশ (সেন) দা-কে। মোনালি ঠাকুর ছিলেন, তাছাড়া কিছু অতিথি বিচারকও ছিলেন।

আরও পড়ুন, আসরে এবিপি অ্যাপ, পূজা সংখ্যা হাজির গোটা বিশ্বের দরবারে

স্কুলের শেষের দিকে আমি কলকাতাকে চিনেছি, বিভিন্ন প্রজেক্ট করতে আসার সুবাদে। কিন্তু কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে মল-এ যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়। তবে আমি যখন প্রথম মল দেখছি, কলকাতায় তখন মলের বয়স খুব বেশি নয়। তিন-চার বছর হবে। এই সময় হঠাৎ করে একটা নতুন কলকাতাকে দেখা। আর ডানা গজানোর কথা যদি বলা হয়, সেটা কলেজেই শুরু। প্রেম, ভাল লাগা সব কিছুর শুরু এখান থেকেই। এমন নয় যে স্কুলে প্রেমটা ছিল না...

কলকাতাকে আমি খুব একা একা চিনেছি। একটা ঘটনার কথা বলি। আমি একবার বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে বড়বাজার চত্বরে এসে একদিন টানা ঘুরে বেরিয়েছি। বড়বাজারে রাস্তায় গদিগুলোতে শুয়েছি। টালা পার্কের প্ল্যাটফর্মে, হাওড়া স্টেশনে গিয়েও ঘুমিয়েছি। সব নিয়ে তিনদিন কলকাতায় রাত কাটিয়েছি। তাতে আমার কিন্তু একটুও কষ্ট হয়নি। খুব আনন্দ করেছি। তখনকার কলকাতা ছিল আমার কাছে ফ্লুরোসেন্ট কলকাতা। হলুদ আলোয় কলকাতাকে দেখা। যে আলোটা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। কলকাতার রাত্রিবেলার জীবনটা অসাধারণ। আমি যার স্বাদ পেয়েছি।

কলকাতা সব মিলিয়ে আমার কাছে ভিসুয়াল সিটি। যার থেকে জীবনে আমি অনেক অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

আরও পড়ুন, শ্বেতপাথর, রুপোয় নজর কাড়ছেন শিল্পী

আমার কাছে এখনকার কলকাতা নতুন রূপ নিচ্ছে। রঙের দিক থেকে কিছুটা বদলেছে কলকাতা। তবে এ শহরের চরিত্র বদলায়নি। কারণ মানুষজন তো একই আছে। কলকাতা দেখতে একটু অন্য রকম হচ্ছে,আরও পরিষ্কার, ঝাঁ-চকচকে হচ্ছে।কিন্তু এখন আর আমি আগের মতো কলকাতায় খোলামেলা ভাবে ঘুরে বেড়াতে পারিনা। কারণ সারেগামাপা-র পরে আমার জীবনটা অনেক বদলে গেছে। আলাদা একটা পরিচিতি পেয়েছি মানুষের কাছে। পথেঘাটে বেরোলে মানুষজনের প্রচুর ভালবাসা পেয়ে খুবই ভাল লাগে। কিন্তু আমি যেহেতু খুব একা থাকতে ভালবাসি, এই ভিড়টা আমার খুব একটা ভাল লাগে না। সে দিক থেকে দেখতে গেলে খানিকটা বিড়ম্বনা তো বটেই।

আমার মনটা তৈরি করেছে কলকাতা। আমার ভাবনাচিন্তার প্রকাশও কলকাতাকে সামনে রেখেই।আমার জীবনে প্রতিষ্ঠা যা কিছু ঘটেছে, সবটাই কলকাতা দিয়েছে।

আমার স্বপ্ন, কলকাতায় থেকেবাংলা গানকে ভালবেসে বাংলাগানের জন্য কনট্রিবিউট করা।

অনুলিখন: পিয়ালী দাস

আরও পড়ুন

More from My Kolkata
Advertisement