পালাবদলের দেড় মাসের মধ্যেই কলকাতার একটি উল্লেখযোগ্য রাস্তার নাম বদল হল। পার্ক সার্কাসের সেভেন পয়েন্ট থেকে ডন বস্কো সার্কেল পর্যন্ত ৫০০ মিটার রাস্তা এত দিন সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ নামে পরিচিত ছিল। কলকাতা পুরসভার তরফে জানানো হয়েছে, এ বার থেকে ওই রাস্তার নাম পাল্টে হচ্ছে গোপাল মুখার্জি রোড। ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবসে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরসভার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বললেন, ‘‘এত দিনে ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা হল।’’ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নাতি শান্তনু মুখোপাধ্যায়ও।
শুভেন্দু তাঁর এক্স পোস্টে এই নাম পরিবর্তনের কথা জানান। তিনি লেখেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ দিবসের পবিত্র লগ্নে কলকাতা পুরসভা যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমি তার ভূয়সী প্রশংসা করছি। অতীতে ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক অবিচার সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’’ মুখ্যমন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘‘কয়েক দশক ধরে কলকাতার একটি প্রধান রাস্তার নাম এমন একজনের নামে ছিল, যিনি নিছক রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন।’’ শুভেন্দুর অভিযোগ, গণহত্যা চালিয়েছিলেন সুরাবর্দি। একই সঙ্গে প্রশংসা করেছেন গোপাল মুখোপাধ্যায়ের, অনেকের কাছে যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে পরিচিত।
শুভেন্দুর মতে, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন গোপাল। তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করায় এত দিনে প্রকৃত অভিভাবক এবং ত্রাণকর্তাকে সম্মান জানানো হবে। মুখ্যমন্ত্রীর শেষ সংযোজন, ‘‘সময় এসেছে ভুল সংশোধন করে পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত নায়ককে স্মরণ করার।’’ গোপাল মুখার্জি রোড নামকরণের সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলেছেন গোপালের উত্তরসূরি শান্তনু। তাঁর কথায়, ‘‘শুভেন্দুবাবু কাজটা করে দেখালেন। যথাযথ সম্মান দিলেন। ঐতিহাসিক দিনে, ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন।’’
তবে সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে কেউ কেউ বিস্মিত। একাংশের মতে, আদতে ওই রাস্তার নামকরণ মুসলিম লিগ নেতা হুসেন সুরাবর্দির নামে ছিল না। ছিল তাঁর কাকা হাসান সুরাবর্দির নামে, যিনি এক সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তবে বিপরীত মতও রয়েছে। বহু বিশেষজ্ঞের মতে, সুরাবর্দি পরিবারের অনেকের কথাই ইতিহাসে রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মননে লিগ নেতা হুসেন সুরাবর্দির কথাই গেঁথে রয়েছে, যিনি ১৯৪৬ সালের কলকাতার অশান্তির হোতা হিসাবে কুখ্যাত।
আরও পড়ুন:
হাসান সুরাবর্দি ১৯৩০ সালের ৮ অগস্ট থেকে ১৯৩৪ সালের ৭ অগস্ট পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ইতিহাসচর্চাকারীরা জানাচ্ছেন, বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে বাঁচাতে স্বাধীনতা সংগ্রামী বীণা বসুর হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছিলেন হাসান সুরাবর্দি। সেই কারণে ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ উপাধি দেয়।
কলকাতার ইতিহাস চর্চাকারী গৌতম বসুমল্লিকের দাবি, ‘‘১৯৩৩ সালের ২০ এপ্রিল কলকাতা পুরসভা একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই রাস্তার নামকরণ সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ করে।’’ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অমিত দে-র মতে, ‘‘এই সুরাবর্দি বাংলার প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দি নন, ইনি শিক্ষাবিদ এবং বহু ভাষাবিদ। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।’’ গৌতম বসুমল্লিক বা অমিত দে-র দাবি নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ ১৯৩৩ সালে হাসান সুরাবর্দি জীবিত ছিলেন। তখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেই ছিলেন। জীবদ্দশাতেই তাঁর নামে কলকাতার রাস্তার নামকরণ হয়েছিল, এ তত্ত্ব অনেকেই মানছেন না।
রাজ্যের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়) উপাচার্য হিসাবে কাজ করে আসা অধ্যাপিকা সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আরও অনেকে উপাচার্য হয়েছেন। তাঁদের সকলের নামে কি একটি করে রাস্তা রয়েছে? বেছে বেছে একজন সুরাবর্দির নামেই রাস্তার নামকরণ কেন? আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ছিলাম। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনও নথি খুঁজে পাইনি, যাতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাব গ্রহণ করেছে যে, এই উপাচার্যের নামে রাস্তা হওয়া উচিত।’’
সোমা বলছেন, ‘‘আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো উপাচার্যদের নামে রাস্তা থাকতে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের অবদান হিমালয়প্রমাণ। কিন্তু উপাচার্য হিসাবে সুরাবর্দির কী অবদান ছিল, কারও কি জানা রয়েছে? কেউ মনে করে বলতে পারবেন, ওঁর উল্লেখযোগ্য অবদান কী ছিল? এ রকম হলে তো সব উপাচার্যের নামেই একটা করে রাস্তা করতে হয়।’’
সেই একই সুর শোনা গেল আরএসএস-এর শিক্ষা সংক্রান্ত সংগঠন ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল-এর দক্ষিণবঙ্গ প্রান্ত টোলি সদস্য অধ্যাপক অরিন্দম ভট্টাচার্যের কণ্ঠে। তিনি বলছেন, ‘‘সুরাবর্দি শব্দটা শুনলেই মুসলিম লিগ নেতা তথা পরাধীন ভারতে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হুসেন সুরাবর্দির নামই সর্বাগ্রে সকলের মনে আসে। কারণ তাঁর কাকা সৈয়দ হাসান সুরাবর্দির চেয়ে খ্যাতি বা কুখ্যাতিতে লিগ নেতা সুরাবর্দি অনেক যোজন এগিয়ে ছিলেন।’’ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অরিন্দমের কথায়, ‘‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই কলকাতার বুকে একটা রাস্তার এ রকম নামকরণ করে রাখা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় ঘটা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক গণহত্যার যে ক্ষত, তাতে এই নামটা রোজ নুনের ছিটে দিত। সে নাম বদলে গোপাল মুখার্জি রোড নামকরণকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করছি।’’
কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন কর্মী অজিত কুমার বসুর লেখা একটি বইয়ে উল্লেখ যে, ১৯৩৩ সালের ৮ মার্চ কলকাতা পুরসভার অধিবেশনে পার্ক সার্কাসে নবনির্মিত ১০০ ফুট রাস্তাটির নাম সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অজিতকুমার তাঁর বইয়ে জানান, সেই প্রস্তাব করেছিলেন তৎকালীন কাউন্সিলর শৈলন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। অতএব, রাস্তার নামকরণ বদল নিয়ে যাঁরা বিস্ময় তথা অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন, তাঁরা নিজেরাও ইতিহাস সম্পর্কে কতটা ওয়াকিবহাল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।