পিরালি, কায়েত, তাঁতি, সোনার বেনে/ করলে আবাদ তারা দেশ থেকে ধন এনে’— কলকাতার প্রাচীনতম পরিবারগুলির ইতিহাস বোনা আছে যেন এই লৌকিক ছড়ায়। তার মধ্যে তন্তুবায় সম্প্রদায়ের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। কারণ, বিদেশি বণিকদের কাপড় ও সুতো কেনার হাটকে কেন্দ্র করেই কলকাতা শহর গড়ে উঠেছিল। আজকের ময়দান এলাকায় বস্ত্র-ব্যবসায়ী শেঠ ও বসাকদের বিশাল তাঁতশাল সেই ভুলে যাওয়া ইতিহাসেরই অংশ। তবে ঔপনিবেশিক শাসন জাঁকিয়ে বসার পর, বিলেতের কলে তৈরি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা-সহ নানান কারণে বিপন্ন হয়ে পড়ে বাংলার তাঁতশিল্প। সেই বিপন্নতা ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে সুতো কাটার চরকা।
দেশভাগের জেরে স্বাধীনতা-উত্তর কালে বস্ত্রশিল্পের সঙ্কট জটিল হয়ে ওঠে। ও-পার বাংলা থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষের বিশাল ঢেউয়ে মিশে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন বহু তাঁতশিল্পী। নদিয়ার বুঁইচা গ্রামের সরকারি উপনিবেশে তাঁদের একটি অংশ আশ্রয় পান। মসলিনের মতো সূক্ষ্ম কাপড় বোনায় দক্ষ টাঙ্গাইলের বসাক সম্প্রদায় নদিয়ার সুপ্রাচীন বস্ত্র উৎপাদনের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হন। সেই উপনিবেশই আজকের ফুলিয়া।
এই ফুলিয়া থেকেই প্রকাশিত হয় তন্তুবায় সম্প্রদায়ের মুখপত্র টানাপোড়েন পত্রিকা। এর নবপর্যায়ে আত্মপ্রকাশের পাঁচ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে গত ১০ জুন কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির হুমায়ুন কবির সভাঘরে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। তাঁতশিল্পের সমস্যা ও উন্নতির পথ খোঁজার চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন তাঁতশিল্পী, প্রযুক্তিবিদ, ব্যবসায়ী, বিপণন বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা; আজকের সঙ্কট নিরসনে আন্তঃক্ষেত্রীয় (ইন্টার-সেক্টোরাল) সহযোগিতা ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা। তাঁত-গবেষণার পরিসর বৃদ্ধি ও ইতিহাস-চর্চায় বয়ন-সংস্কৃতিকে আরও জায়গা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে, এই শিল্পকে সজীব রাখতে।
এই চর্চারই অংশ হিসেবে নিলয় কুমার বসাক সম্পাদিত টানাপোড়েন পত্রিকাটি তুলে ধরেছে তাঁতশিল্পীদের জীবন, সংগ্রাম, শিল্পচর্চা ও ঐতিহ্য সংক্রান্ত জরুরি কিছু লেখা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বয়নশিল্প ও তন্তুবায় জনগোষ্ঠীদের আদানপ্রদানের একটি বৈদ্যুতিন প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা ‘টানাপোড়েন’ ওয়েবসাইটের সঙ্গেও পরিচয় করানো হয় এ দিন।
কর্মশালায় দেখানো হয় বাংলার বয়নশিল্পের ঐতিহ্য নিয়ে উইভার্স স্টুডিয়ো রিসোর্স সেন্টার প্রযোজিত, সিনে বাহিনী স্টুডিয়োজ়-এর প্রামাণ্যচিত্র টেক্সটাইলস অব দ্য বেঙ্গল ডেল্টা এপার-ওপার: বিয়ন্ড বর্ডারস। একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন হয়েছিল, টাঙ্গাইল ও বালুচরি শাড়ির নমুনার সঙ্গে শাড়ির পাড়ের কিছু পারম্পরিক নকশাও দেখা যায় সেখানে। পাহাড়-পদ্ম (উপরের প্রথম ছবি), বরফি-বেঁকি, হাতির সারির পাশাপাশি ছিল সম্রাট পঞ্চম জর্জের ছবি দেওয়া তৎকালীন দশ টাকার নোটের অনুকরণে তৈরি মিলের শাড়ির নকশি পাড় (উপরের ছবিতে)। এ ছাড়াও ছিল পুরনো নকশা তোলার পদ্ধতি ও মহাজনি খাতার মতো বেশ কিছু স্মারক।
১২৫ বছরে
বীরেন্দ্রনাথ সরকার (ছবি) বাংলা সিনেমা-প্রযোজনার পথিকৃৎ, ‘নিউ থিয়েটার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা। ত্রিশের দশকে সেখানে পা রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; এই স্টুডিয়ো ঘিরে তৈরি হয় বাঙালির চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি, শিশির ভাদুড়ি দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায় প্রমথেশ বড়ুয়া কুন্দনলাল সায়গল পৃথ্বীরাজ কপূর কানন দেবী কৃষ্ণচন্দ্র দে রাইচাঁদ বড়াল পঙ্কজকুমার মল্লিক প্রমুখ কিংবদন্তি শিল্পী-নাম জড়িয়ে যার সঙ্গে। বাংলা হিন্দি উর্দু-সহ নানা ভাষার স্মরণীয় সব ছবি নিউ থিয়েটার্স-এরই অবদান। আগামী ৫ জুলাই ১২৫ পূর্ণ করবেন বীরেন্দ্রনাথ, তাঁর স্মরণে সিনে গিল্ড, বালি আয়োজন করেছে ‘নিউ থিয়েটার্স চলচ্চিত্র উৎসব’, আগামী ২-৫ জুলাই, বালি রবীন্দ্র ভবন ও রক্তকরবী মঞ্চে। দেখানো হবে ত্রিশের দশকে তৈরি ধূপছাও বিদ্যাপতি মুক্তি স্ট্রিট সিঙ্গার, চল্লিশের দশকের প্রতিশ্রুতি ও উদয়ের পথে, পঞ্চাশের দশকের যাত্রিক। ৪ জুলাই হবে স্মারক আলোচনা। সহায়তায় কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক, নিউ থিয়েটার্স, তপন সিংহ ফাউন্ডেশন ও এফএফএসআই।
কান পেতে
মুখ খোলার আগে, কান পেতে শোনো— এই সহজ অথচ গভীর কথায় লুকিয়ে যে দর্শন, ভাবনা ও সৃষ্টির নানা পরিসরে তার প্রকাশপথ দেখিয়েছেন চিন্তক ও শিল্পীরা। আবার এ কথাও সত্যি, আমরা শুনি অনেক কিছুই, অনুধাবন করি না— জীবনের সরব হট্টগোলে হারিয়ে যায় শ্রবণে নিহিত সত্য। তাই শোনারও আগে দরকার নীরব হওয়া। প্রকৃত শিল্প-অভিজ্ঞতারও তা আবশ্যক শর্ত। এ কারণেই সুসঙ্গীত আমাদের স্তব্ধ করে। গ্যেটে ইনস্টিটিউট-ম্যাক্মমুলার ভবনে আজ সন্ধে সাড়ে ৬টায় এই ভাবনা থেকেই ভিন্নধারার উদ্যোগ ‘আ টিল্ট অব দি ইয়ার’। শোনার পাঠ, ভাবারও— দুই সঙ্গীতবিদ অমিত দত্ত ও জীবরাজ সিংহের হাত ধরে।
ছবির আয়নায়
অভিবাসন, সমাজ, ইতিহাস, প্রেম— সিনেমা নানা সময়ে পর্দায় ধরেছে মানুষের জীবনের এই অনুঘটক-চতুষ্টয়কে। এই চার চুম্বকেই, ভিন্ন মেজাজের চারটি সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে জার্মান চলচ্চিত্রের সমসাময়িক ধারাটির সঙ্গে কলকাতার দর্শকদের পরিচয় করাতে চাইছে ভবানীপুর ফিল্ম সোসাইটি— ‘সিনেমার সাথে পথ চলা’ স্লোগান যাদের। জার্মান দূতাবাসের সহায়তায়, গ্যেটে ইনস্টিটিউট-ম্যাক্মমুলার ভবনের সঙ্গে একত্রে শহরের এই সিনে-ক্লাবের আয়োজনে জার্মান ছবির উৎসব আজ ও আগামী কাল, ২৭-২৮ জুন, নন্দন ৩-এ। ছবিগুলি: তুবাব, টকিং অ্যাবাউট দি ওয়েদার, ট্রানজ়িট আর অরফিয়া ইন লাভ— গত কয়েক বছরে নির্মিত, নানা ফিল্মোৎসবে প্রশংসিতও। দু’দিনই বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে শুরু।
একসূত্রে
ক্ষুদিরাম, বিনয়-বাদল-দীনেশ, যতীন দাস, ভগৎ সিংহ, নেতাজি সুভাষ। তেভাগা, তেলঙ্গানা হয়ে দিল্লি অবরোধ করে থাকা কৃষকেরা, নির্যাতকের বিরুদ্ধে পথে নামা পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ, রাত দখলের ডাক দেওয়া যমুনাবতীরা। ক্ষমতার উন্মত্ত আস্ফালনের সামনে দাঁড়াতে গেলে হতে হয় অন্যতর এক পাগল; ইতিহাসে তাঁদের দেখা মেলে। ইটালির মিলানে এক ‘কাস্টোডি ডেথ’-এর ঘটনায় এমনই এক মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন নাট্যকার দারিয়ো ফো। সত্তর দশকের অন্য এক ঘটনাসূত্রে মিলান-কলকাতা এক হয়েছিল উৎপল দত্তের কলমেও। প্রতিস্পর্ধার সেই দৃশ্য-রূপকল্প নাট্যমঞ্চে নিয়ে আসছে পিএলটি নাট্যগোষ্ঠী, ফো-র অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ অব অ্যান অ্যানার্কিস্ট অবলম্বনে, উৎপল-নাট্য বাংলা ছাড়ো। কমলেশ চক্রবর্তীর নির্দেশনায়, ২৮ জুন রবিবার অ্যাকাডেমি মঞ্চে, সন্ধে সাড়ে ৬টায়।
বঙ্গ ও বিজ্ঞান
স্বাধীন দেশে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ। পঁচাত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থিরলক্ষ্য প্রতিষ্ঠানটি। লব্ধযশ বাঙালি বিজ্ঞানীদের অনেকেরই বিজ্ঞান-আগ্রহের শুরু পরিষদ প্রকাশিত বইসূত্রে, বেরোয় মাসিকপত্র জ্ঞান ও বিজ্ঞান-ও। নিয়মিত বিজ্ঞান-অনুষ্ঠানও হয়, আজ বিকেল ৫টায় রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রিটে পরিষদ-ভবনে তেমনই একটি: ‘রাজেন্দ্রনাথ, হরেন্দ্রনাথ ও হরিলাল মজুমদার স্মৃতি বক্তৃতা’য় কাজলকৃষ্ণ বণিক বলবেন ‘দোলাচলে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা’ প্রসঙ্গে। জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকার কিশোর বিজ্ঞানী বিভাগে গত বছরের সেরা লেখার জন্য সম্মানিত হবেন বিকাশ মণ্ডল; আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হবে ‘রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী স্মৃতি পুরস্কার’-এ ভূষিত, মানসপ্রতিম দাসের বই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-র।
পিছুডাক
সে ছিল এক অন্য কলকাতা। বহুতলের আগ্রাসী বাহুল্য ছিল না: দৈবাৎ অনেকটা উপর থেকে দেখতে পেলে নজরে পড়ত রাজপথে ট্রাম বাস ট্যাক্সি মানুষের জটিল রসায়ন। ফুটপাতে শিশু অঘোরে ঘুমোচ্ছে রেলিঙে বাঁধা কাপড়ের দোলনায়, বর্ষাভেজা শহরে ছোটদের আনন্দস্নান আর খেলা, ময়দানে তীর্থফেরত পুণ্যব্রত মানুষের দল, অ্যান্টেনায় বসে থাকা কাকপক্ষী। সময়ের জলছবি, আজ যা মুছে গেছে অনেকটা। একদা-চিত্রসাংবাদিক রাজীব দে ক্যামেরায় ধরে রেখেছিলেন নব্বই দশকের সেই শহর। তাঁর তোলা সাদা-কালো আলোকচিত্রে ও নীলাঞ্জন দে-র লেখার সঙ্গতে দু’মলাটে বেরিয়েছে সম্প্রতি, নাইন্টিজ় ডায়েরি (প্রকা: ব্লুট্রি) নামে। চেনা স্মৃতির স্ন্যাপশটে ধরা আছে নব্বই দশকের কলকাতার ছন্দ ও ছন্দপতন (ছবি); আবার এমন এক সময়ও, যখন উদারীকরণ, নব্য প্রযুক্তি, পাল্টে যাওয়া স্বপ্ন হাতছানি দিচ্ছিল নবজীবনের।
যুগলবন্দি
বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়-সত্যজিৎ রায় সংযোগ-সম্পর্ক শুধুই গুরু-শিষ্যের নয়, দুই শিল্পীরও অন্বয়। বিনোদবিহারী সত্যজিৎকে শিখিয়েছেন জাপান থেকে শেখা ক্যালিগ্রাফি, সত্যজিৎ তা প্রয়োগ করেছেন বিজ্ঞাপনী কাজে, আবার পরে তথ্যচিত্র গড়ার ছলে ধরে রেখেছেন এক শিল্পীর শিল্পপথের প্রতিবন্ধকতা ছাপানো উত্তরণ। দুই মনস্বীকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়েছে নরেন্দ্রপুরের এক আবাসন থেকে প্রকাশিত অন্বেষা পত্রিকা (সম্পা: শ্রীপর্ণা মিত্র), সদ্যপ্রকাশিত ‘যুগলবন্দি’ সংখ্যায়। বিশেষজ্ঞ-সাক্ষাৎকার এই পত্রিকার বরাবরই জোরের জায়গা, বিনোদবিহারীর জীবনে একাকিত্ব ও শিল্পের সম্পর্ক নিয়ে আর শিবকুমার ও সুশোভন অধিকারীর সাক্ষাৎকার বহু জিজ্ঞাসার উত্তর দেবে। সত্যজিতের কাজে বিনোদবিহারীর প্রভাব নিয়ে বলেছেন দেবাশীষ দেব; এ ছাড়াও দু’জনকে ঘিরে সুলিখিত প্রবন্ধ বেশ ক’টি। ছবিতে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের আত্মপ্রতিকৃতি, পত্রিকা থেকে।
প্রতিস্বর
ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন যখন ভিন্নস্বরের দমনে খড়্গহস্ত হয়, তখন গণতান্ত্রিক সমাজ-সংস্কৃতির পরিসর রক্ষায় কী করণীয়? জাতিবিদ্বেষ, ধর্মপরিচয়ের রাজনীতিকে অস্ত্র করে যখন আধিপত্যবাদ কায়েমের চেষ্টা চলে, কী ভাবে হবে বহুত্ববাদী চেতনার প্রচার-প্রসার? চলচ্চিত্রের ভূমিকা কী হতে পারে সেখানে? এই ভাবনা থেকেই সংবর্তক পত্রিকা ও প্রকাশনার উদ্যোগে আজ বিকেল ৫টায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিতা ব্যানার্জি মেমোরিয়াল হল-এ অনুষ্ঠান। ‘বিকল্পের খোঁজে: বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্রভাবনা’ নিয়ে বলবেন শোভনলাল দত্তগুপ্ত, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলবেন বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র চর্চার ইতিহাস নিয়ে। প্রকাশিত হবে মানস ঘোষের গ্রন্থ চলচ্চিত্র: দেশ বিদেশ। শেষ পর্বে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান, তাঁরই কন্যা রঙিলী বিশ্বাসের কণ্ঠে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)