পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিয়ে যাওয়া ‘এসআইআরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত’দের পরিজনদের দিল্লির বঙ্গভবনে হেনস্থার অভিযোগে গর্জে উঠলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। খবর পেয়েই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তিনি বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা দেন। সেই সঙ্গে অমিত শাহের পুলিশের বিরুদ্ধে তোপও দেগেছেন। মমতা জানিয়েছেন, হেনস্থার খবর পেয়ে বাড়ির পোশাক না ছেড়েই বেরিয়ে পড়েছেন তিনি। বঙ্গভবনে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের সঙ্গে মমতা এবং অভিষেক কথা বলেছেন। তাঁদের আশ্বাস দিয়েছেন। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকেও তাঁদের হাজির করানো হবে।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের ১২টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাজ চলছে। প্রথম থেকেই তৃণমূল এর বিরুদ্ধে সরব। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য সোমবার বিকেল ৪টেয় নির্বাচন কমিশন তৃণমূলের প্রতিনিধিদলকে সময় দিয়েছে। ওই বৈঠকে ‘এসআইআরে ক্ষতিগ্রস্ত’দেরও নিয়ে যাবেন মমতা। পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি মৃত্যুর জন্য এসআইআরকে দায়ী করেছে মৃতদের পরিবার। সেই সমস্ত পরিবারের সদস্যদের দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছেন মমতা। তাঁদের রাখা হয়েছে বঙ্গভবনে। কিন্তু সোমবার সকাল থেকে বঙ্গভবনের সামনে আচমকাই দিল্লি পুলিশের তৎপরতা চোখে পড়ে। অভিযোগ, এলাকা পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। বঙ্গভবন ঘিরে রাখা হয়েছে এবং ভিতরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এই খবর পেয়েই সেখানে ছুটে যান মমতা। অর্থাৎ, কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শুরুর আগেই রাজধানীতে যুদ্ধের আবহ প্রস্তুত করে দিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে এসআইআর নিয়ে রাজনীতির পারদ চড়ল দিল্লিতেও।
জীবিত হলেও নির্বাচন কমিশনের খাতায় ‘মৃত’, এমন ৫০ জন ভোটারকে দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছে তৃণমূল। এ ছাড়া, নিয়ে যাওয়া হয়েছে আরও ৫০ জনকে যাঁদের পরিবারের কোনও না কোনও সদস্য ‘এসআইআর-এর কারণে’ মারা গিয়েছেন। বঙ্গভবনে গিয়ে তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন মমতা। বলেছেন, ‘‘চিন্তা করবেন না। আমি আছি, অভিষেক আছে। এটা আমাদের জায়গা। এটা দিল্লির জায়গা নয়। পুলিশকে আমি যা বলার বলে এসেছি।’’ বঙ্গভবনের বাইরে দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, ‘‘দিল্লি পুলিশ বঙ্গভবনে ঢুকে ঘরে ঘরে সার্চ করছে। ওখানে বাংলার মানুষ থাকছেন। এটা তো আমাদের ভবন। ওরা এটা করতে পারে না। আমাদের রাজ্যে অনেকে এসআইআরের কারণে মারা গিয়েছেন। তাঁদের পরিজনদের নিয়ে আমরা এসেছি। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা জীবিত হয়েও কমিশনের খাতায় মৃত। তাঁরাও এসেছেন।’’
বঙ্গভবনে মমতা ঢোকার মুখে দিল্লি পুলিশের কয়েক জন সদস্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের দেখেই এগিয়ে যান মমতা। জানতে চান, কেন তাঁরা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন? পুলিশের কেউ কোনও মন্তব্য না করেই অন্য দিকে সরে যান। মমতাও তাঁদের পিছন পিছন এগোন এবং প্রশ্ন করেন, ‘‘কী হল, পালিয়ে যাচ্ছেন কেন?’’ সঙ্গে ছিলেন অভিষেকও। এর পরেই দিল্লি পুলিশকে মমতার হুঁশিয়ারি, ‘‘আমাকে দুর্বল ভাবার কোনও কারণ নেই। অনেক দূর দূর থেকে আমরা ওঁদের নিয়ে এসেছি। ওঁদের ভয় দেখানো যাবে না। আমি বাড়ির পোশাকও ছাড়িনি। যা পরেছিলাম, তা-ই পরে অভিষেককে নিয়ে চলে এসেছি। দিল্লিতে যখন বোমা বিস্ফোরণ হয়, তখন দিল্লি পুলিশ কোথায় থাকে? অবশ্য আমি পুলিশকে কিছু বলব না। ওরা তো নির্দেশে কাজ করছে।’’ বঙ্গভবনের সামনে পৌঁছে দিল্লি পুলিশের আধিকারিকদের সঙ্গে কথাও বলতে দেখা গিয়েছে মমতাকে। তর্কাতর্কিতেও জড়িয়ে পড়েছিলেন।
দিল্লিতে এর আগেও বাঙালিদের হেনস্থার অভিযোগ উঠেছিল। পুলিশের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘আপনারা সংযত হোন। বাংলার মানুষকে এ ভাবে হেনস্থা, নির্যাতন করবেন না। অনেকে মারা গিয়েছেন। অনেকে প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। আমাদের গায়ের জোর দেখাবেন না। যদি ওঁদের জন্য এই দেশে আর কেউ না-ও লড়ে, আমি লড়ব। লড়ে যাব।’’ মঙ্গলবার বিকেলে বঙ্গভবন থেকে তৃণমূল একটি সাংবাদিক বৈঠক ডেকেছে। সেখানে ‘এসআইআরে ক্ষতিগ্রস্ত’রাও থাকবেন বলে জানিয়েছেন মমতা। তিনি এবং অভিষেক চলে যাওয়ার পর বঙ্গভবনের অন্য একটি অংশে দিল্লি পুলিশের হেনস্থার খবর পাওয়া যায় বলে অভিযোগ। সেখানে যান দোলা সেন, সাগরিকা ঘোষ, বাপি হালদারেরা।