E-Paper

অবশেষে পাহাড়ে নজর, কিন্তু বাংলা ব্রাত্যই

পর্যটন খাতে ‘বিপ্লব’ আনতে রবিবাসরীয় বাজেটে দেশে যে নতুন পরিবেশবান্ধব ট্রেকিং রুট খোলার কথা শোনা গিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের মুখে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গকে কার্যত ব্রাত্য রাখা হয়েছে বলেই ওয়াকিবহাল মহলের মত।

স্বাতী মল্লিক

শেষ আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৪
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। —ফাইল চিত্র।

ট্রেকিং, হাইকিংয়ের কথা আছে। কিন্তু দার্জিলিং, কালিম্পং নেই।

নতুন বুদ্ধ সার্কিটের প্রসঙ্গ আছে। কিন্তু নেই পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ের বৌদ্ধ মঠ, মনাস্ট্রি।

কচ্ছপ ‘ট্রেল’, পাখি দেখিয়েদের উৎসাহিত করার মতো ঘোষণাও আছে। কিন্তু সেখানেও শোনা যায়নি পশ্চিমবঙ্গের নাম।

পর্যটন খাতে ‘বিপ্লব’ আনতে রবিবাসরীয় বাজেটে দেশে যে নতুন পরিবেশবান্ধব ট্রেকিং রুট খোলার কথা শোনা গিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের মুখে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গকে কার্যত ব্রাত্য রাখা হয়েছে বলেই ওয়াকিবহাল মহলের মত। পশ্চিমবঙ্গ থেকে একাধিক পর্বতারোহী, বিশেষ করে, এভারেস্ট বিজয়ী রয়েছেন। গত বছরে পর্যটক আকর্ষণে দেশের মধ্যে সামনের সারিতে ছিল এই রাজ্য। তার পরেও কেন রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনস্থল পাহাড়কে আলাদা করে উল্লেখ করা হল না ট্রেকিং-হাইকিং বা বুদ্ধ সার্কিটের ক্ষেত্রে, তা নিয়েপ্রশ্ন উঠছেই।

রবিবার বাজেট ঘোষণায় নির্মলা জানান, ‘‘ভারতও বিশ্ব মানের ট্রেকিং-হাইকিং অভিজ্ঞতা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।’’ তার পরে তিনি ঘোষণা করেন, কাশ্মীর, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পূর্বঘাট পর্বতমালার আরাকু উপত্যকা ও পশ্চিমঘাটের পথিগাই মালাইয়ে পরিবেশবান্ধব ট্রেকিং রুটতৈরি করা হবে।

সেই সঙ্গে ওড়িশা, কর্নাটক, কেরলে কচ্ছপ ট্রেল এবং অন্ধ্রপ্রদেশ-তামিলনাড়ুতে পাখি দেখিয়েদের জন্য নতুন রুট তৈরির কথাও বলা হয়েছে। পর্বতারোহণের মতো অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের দিকে অবশেষে সরকারি নজর পড়লেও সেই ট্রেকিং মানচিত্রে বাংলা-সিকিমের মতো রাজ্যের ঠাঁই না হওয়ায় বিস্মিত ও আশাহত এ রাজ্যের পর্বতারোহণ মহল।

রাজ্যের প্রবীণ ট্রেকার রতনলাল বিশ্বাসের মতে, ‘‘এ রাজ্যে নতুন নতুন ট্রেকিং রুট তৈরি ও তার জন্য পরিকাঠামোগত উন্নয়নের অনেক সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা আছে। সান্দাকফু রুটে যেটুকু সুযোগ-সুবিধা আছে, তা নেপালের তরফেই। ১৯৭২ সালেও সেখানে যা পরিস্থিতি ছিল, আজও তা-ই আছে। ডুয়ার্সেও ট্রেকিং পরিকাঠামো তৈরির দরকার ছিল।’’ তাঁর মতে, দেশের মধ্যে শৈলারোহণ, ট্রেকিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী বাঙালিরাই। কম সময়ে ও কম খরচে ট্রেকিং করতে হলে উত্তরবঙ্গ ও সিকিমের মতো জায়গাই তাঁদেরজন্য প্রশস্ত।

অথচ নির্মলার ঘোষণায় হিমালয়ের এই অংশটিই পুরোপুরি বাদ গিয়েছে। কেন? রতনলাল বলছেন, ‘‘রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় এলে, তখনও উত্তরবঙ্গে ট্রেকিং পরিকাঠামো উন্নয়নের কথা বলেছিলাম। তখনও কেউ শোনেনি। আজ কেন্দ্রও নজর দিল না।’’

ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন (আইএমএফ) পূর্বাঞ্চলীয় শাখার চেয়ারম্যান তথা পর্বতারোহী দেবরাজ দত্তও আশাহত। তাঁর মতে, ট্রেকিং রুট তৈরি মানেই সেখানে স্থানীয়দের আর্থিক উন্নতি, স্থানীয় গাইড তৈরি, নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। সরকারি তরফে উদ্ধারকাজে গতি আসবে। ‘‘দেশের ট্রেকারদের মধ্যে বেশির ভাগই বাঙালি। তাই ঘরের কাছে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হলে তাঁরা আরও বেশি উৎসাহিত হতেন।’’— বলছেন দেবরাজ।

প্রথম অসামরিক বাঙালি এভারেস্টজয়ী, দেবাশিস বিশ্বাস অবশ্য মনে করছেন, এই ঘোষণায় পর্বতারোহণের আগামী প্রজন্ম এই পথে রোজগার করার দিশা পাবে। তাঁর কথায়, ‘‘ভারত সরকার চাইলে নেপালের চেয়ে পর্বতারোহণে কয়েক গুণ ভাল পরিকাঠামো তৈরি করতে পারে। তাতে অদূর ভবিষ্যতে বিদেশিদের ভারতীয় পাহাড়ের প্রতি আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।’’

তবে সেই পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে সিকিম-পশ্চিমবঙ্গকে যে বাদ রাখা যায় না, সেটা মনে করিয়ে দিচ্ছেন উত্তরবঙ্গের পর্যটনের সঙ্গে যুক্তেরা। তাঁদের কথায়, আরাকু উপত্যকা যেখানে কেন্দ্রের নজরে আছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ নেই কেন? এটা তো রাজ্য তথা উত্তরবঙ্গের প্রতি বঞ্চনা!

বাজেটে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বুদ্ধ সার্কিট ঘিরে পর্যটন ক্ষেত্র গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম, অসম, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা থাকছে সেই তালিকায়। অথচ দার্জিলি, কালিম্পঙে সাড়ে তিনশো, চারশো বছরের বৌদ্ধ মঠ, মনাস্ট্রি থাকলেও এই এলাকার উল্লেখ নেই।

হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজ়ম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট সান্যাল বলেন, ‘‘পাখি দেখিয়েদের জন্যও এই এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কিছুই নেই বাজেটে। (নির্মলা) হয়তো এই এলাকার কথা হয়তো ভুলে গিয়েছেন।’’

সহ-প্রতিবেদন: সৌমিত্র কুন্ডু

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Nirmala Sitharaman West Bengal government west bengal tourism West Bengal tourism Department

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy