ফল ঘোষণার এক মাস পার হয়ে গেলেও বিজেপি-র দাবি, এখনও দলের অনেক কর্মী ঘরছাড়া। গেরুয়া শিবিরের রাজ্য নেতারাই শুধু নন, কেন্দ্রীয় নেতারাও এ নিয়ে সরব। রাজ্য বিজেপি ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরানোর দাবি নিয়ে আন্দোলনের পথেও নামতে চায়। অন্য দিকে, তৃণমূল সেই সুযোগ দিতে নারাজ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এমনটা চাইছেন বলে তৃণমূল সূত্রের দাবি। আর মমতার সেই চাওয়া মেনে ইতিমধ্যেই জেলা স্তরের নেতারা বিজেপি কর্মীদের ঘরে ফেরানোর বিষয়ে নরম মনোভাব দেখাতে চাইছেন।
এক তৃণমূল নেতা বলেন, ‘‘আমরা মানুষের যে রায় পেয়েছি তার পরে দিদি কোনও রকম হিংসা চান না। তিনি চান, এই সরকার যে রাজ্যের সকলের সরকার, সেটা কাজের মধ্য দিয়ে দলের নেতা কর্মীদের বোঝাতে হবে।’’ তবে রাজনীতির পথ এখনই ছাড়তে চাইছে না বিজেপি। সোমবারই দলের সিদ্ধান্ত মেনে রাজ্যের ১৮ সাংসদের সই করা চিঠি পাঠানো হয়েছে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে। রাইসিনা হিলসে পাঠানো সেই চিঠিতে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ চেয়ে দাবি করা হয়েছে, গত এক মাসে রাজনৈতিক হিংসায় দলের ৪০ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ৬০ হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ১ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া রয়েছেন।
গত ২ মে বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই বিজেপি অভিযোগ করে আসছে, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তাদের সমর্থকদের উপর হামলা করছে তৃণমূলের সদস্য-সমর্থকেরা। প্রথম থেকেই ওই বিষয়ে সামগ্রিক ভাবে কড়া পদক্ষেপ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বারংবার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, হামলা এবং গোলমাল থামছে না। বিভিন্ন জেলায় বিজেপি-র সমর্থকরা ঘরছাড়া হয়ে রয়েছেন। ভোটের ফলপ্রকাশের পর এক মাস কেটে গেলেও তাঁরা ঘরে ফিরতে পারছেন না। ইতিমধ্যেই বিজেপি-র কেন্দ্রীয় স্তরের নেতারা ওই বিষয়ে লাগাতার টুইট করছেন। গত শনিবারই ওই বিষয়ে টুইট করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং দলের সর্বভারতীয় মুখপাত্র সম্বিত পাত্র। রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় আগে থেকেই সরব। তিনি বিভিন্ন জেলায় বিজেপি কর্মীদের ত্রাণ শিবির পরিদর্শনেও যান। বিজেপি এমন অভিযোগও তোলে যে, অনেক কর্মী অসমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের খোঁজ নিতে ধুবুড়িও যান রাজ্যপাল।
ঘটনাচক্রে, ইতিমধ্যেই রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরাতে ‘ইতিবাচক’ ভূমিকা নিয়েছেন। ঘরছাড়া সমর্থকদের বিষয়ে বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের একটি টুইটের প্রেক্ষিতে তিনি লেখেন, তথাগত যেন তাঁকে ঘরছাড়াদের তালিকা দেন। সোমবার সেই তালিকা তৈরির কথাও চন্দ্রিমাকে জানিয়েছেন তথাগত। সেই সঙ্গে চন্দ্রিমা আশ্বাস দেন যে, রাজনৈতিক রং না দেখে সবাইকে নিরাপদে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আমরা এটাও কথা দিচ্ছি যে, এই ধরনের ভয় দেখানোর কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগ কারও বিরুদ্ধে প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ শাসক শিবিরের একাধিক নেতার বক্তব্য, দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী অনুমোদন ক্রমেই চন্দ্রিমা ওই তালিকা চেয়েছেন এবং তথাগতকে আশ্বাস দিয়েছেন। দলের এক শীর্ষনেতার কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী রাজধর্ম পালন করতে বদ্ধপরিকর। যেমন ইয়াসের ত্রাণ বন্টনের বিষয়েও তিনি রং না দেখার নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনই ভোট পরবর্তী হিংসাও বরদাস্ত করা হবে না বলে জানিয়েছেন। সে যে দলের উপরেই হোক না কেন।’’ প্রসঙ্গত, ত্রাণ বিলির ক্ষেত্রে বাধা পাওয়ার তেমন অভিযোগ বিজেপি-র পক্ষেও ওঠেনি। ব্যতিক্রম শুধু কলকাতার ভবানীপুরে বিজেপি-র রুদ্রনীল ঘোষের উপরে হামলার দাবি।
ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরা নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে একটি মামলাও চলছে। গত শুক্রবার কলকাতা হাই কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরানোই প্রশাসনের প্রাথমিক লক্ষ্য হতে হবে। তাঁদের ঘরে ফেরা আগে নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। পুলিশকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে হবে। ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরাতে লিগ্যাল সার্ভিস কর্তৃপক্ষকে ইমেলেও অভিযোগ জানাতে বলেছে আদালত। হাই কোর্টের পাঁচ বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, স্বাধীন ভাবে সকলের বাঁচার অধিকার রয়েছে। সন্ত্রাসের কারণে কারও নিজের ঘরে ঢুকতে না পারার ঘটনা কাম্য নয়। তাই ঘরছাড়াদের আগে ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে প্রশাসনকে।
আদালতের নির্দেশ বা সরকারের পদক্ষেপ ছাড়াও বেশ কিছু জায়গা থেকে এমন খবরও পাওয়া গিয়েছে যে, তৃণমূলের উদ্যোগেই অনেক ঘরছাড়াকে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামনে আসে ভাতারের তৃণমূল বিধায়ক মানগোবিন্দ অধিকারীর বক্তব্য। তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, ‘‘বিরোধী দলের কোনও পরিবারের সদস্যদের হেনস্থা করা যাবে না। কোনও অসহযোগিতাও বরদাস্ত করা হবে না। কেউ করলে পুলিশ আইনি পদক্ষেপ করবে। শাসকদলের লোক বলে কেউ ছাড় পাবে না।’’ একই নজির দেখা গিয়েছে হুগলির কোন্নগরেও। তবে এর পাশাপাশি কেশপুরে বিজেপি কর্মীদের তালিকা বানিয়ে অসহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বিজেপি-র বিরুদ্ধে।