সাগরদ্বীপকে মূল ভূখণ্ডে জুড়তে বহু প্রতীক্ষিত গঙ্গাসাগর সেতু নির্মাণ বা গঙ্গাসাগর মেলা, কোনও কিছুর প্রতিই কেন্দ্রীয় সরকারের ছিটেফোঁটা দরদ নেই বোঝাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৎপর হয়েছেন। কপ্টারে সোমবার দুপুরে গঙ্গাসাগরে নেমে সেতুর শিলান্যাস পর্ব, জনসভার বক্তৃতা থেকে ভারত সেবাশ্রম এবং কপিল মুনির আশ্রম সফরে মুখ্যমন্ত্রীর মূল সুর এটাই।
ভারত সেবাশ্রম গঙ্গাসাগর কেন্দ্রের সন্ন্যাসীরাও গঙ্গাসাগরকে জাতীয় মেলা আখ্যা দিতে কেন্দ্রের অনীহা নিয়ে বলছিলেন। কপিল মুনির আশ্রমের প্রধান পুরোহিত জ্ঞান দাস মোহন্তের উত্তরাধিকারী সঞ্জয় দাসও সেতু প্রকল্পটির মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর বিরাট দায়িত্বভার গ্রহণের কথা বলেন। কপিল মুনির আশ্রমে এবং ভারত সেবাশ্রমে দাঁড়িয়েই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “গঙ্গাসাগর মেলার জন্য কেন্দ্র এক পয়সাও দেয়নি। বহু বার বলেছি, এই মেলার জাতীয় মর্যাদার জন্য। কেন্দ্র শোনেনি। তবু জনগণের হৃদয়েই গঙ্গাসাগর মেলা হল বিশ্ব মেলা।” গঙ্গাসাগর মেলায় এসে কেউ প্রাণ হারালে তাঁর পরিজন পাঁচ লক্ষ টাকা পাবেন বলেও এ দিন মমতার ঘোষণা।
তাঁর দলের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান খাস তালুক দক্ষিণ ২৪ পরগনার জন্য এ দিন ৯৬টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন মমতা। যার মোট মূল্য ৩৯৪ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা। ১৯২৯ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকার ৭০টি প্রকল্পের শিলান্যাসও করেন তিনি। এর মধ্যেই রয়েছে ১৬৭০ কোটি টাকার প্রকল্পে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বিস্তৃত চার লেনের সেতু। যা কাকদ্বীপের লট নম্বর আট এবং গঙ্গাসাগরের কচুবেড়িয়াকে জুড়ে দিলে সাগরের জীবনযাত্রা আমূল পাল্টাবে বলে এ দিন মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন। তিনি বলেন, “বঙ্কিমচন্দ্র লেখেন, এখানে সাগর সঙ্গমে এসে নবকুমার পথ হারিয়েছিলেন। আর এই সেতু হলে স্থানীয় তিন লক্ষ লোকের যাতায়াত, ব্যবসার সুবিধা, মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধের দরজা খুলে যাবে। কর্মসংস্থান ও শিক্ষার প্রসারও ঘটবে।” ভোটের বছর কেউ গঙ্গাসাগর মেলায় গোলমালের চেষ্টা করতে পারে বলেও সবার সহযোগিতা চান মমতা।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, “পুরোটাই নির্বাচনী প্রচারের জন্য মিথ্যা আশ্বাস। মুড়িগঙ্গা জাতীয় জলপথ। রাজ্য সরকার ‘এনওসি’ চেয়ে আবেদন জানায়নি। জমি অধিগ্রহণ, নকশা হয়নি। ১৭০০ কোটির যে শিলান্যাস, তার ওয়ার্ক অর্ডারও নেই। টেন্ডার হয়নি। ওখানে রামেশ্বরমের মতো সেতু বিজেপি করবে ভারত সরকারের অর্থে।” সরকারের যদিও বক্তব্য, দরপত্র চূড়ান্ত হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ অল্প বাকি। দু’-তিন বছরে সেতুর কাজ মসৃণ ভাবে শেষ হবে, আশা প্রকাশ করেন মমতা।
বিরোধী দলনেতার দাবি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিজেপিকে ‘ডাহা অকর্মা’ বলে তোপ দাগেন মমতা। জনসভাতেও বলেন, “কিছু লোক খালি মিথ্যা বলে। ওরা (বিজেপি) ধর্মের ধ-ও ধারে না। কিন্তু গীতা বা ধর্মের নামে মিথ্যাচার চালাবে।”
১০০ জনের ডর্মিটরি ‘সাগরকন্যা’ এবং ২০টি পর্যটন কুটির ‘গঙ্গান্নে’র উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর লক্ষ্মীর ভান্ডারের মা লক্ষ্মীরা আমৃত্যু এই সুবিধা পাবেন বলেও ঘোষণা মমতার। তবে বিধানসভা ভোটের আগে এই সফরকে মুখ্যমন্ত্রী নিছকই প্রশাসকের কর্তব্য হিসেবে মেলে ধরতে চাননি। নিজের ধার্মিক, পারিবারিক সত্তাও তুলে ধরতে চেয়েছেন। বলেন, “অভিষেকের (বন্দ্যোপাধ্যায়) মা লতাকে নিয়ে এসেছি। পুজো দেওয়ার থাকলে বাড়ির বৌদের নিয়ে আসতেই ভালবাসি।” কপিল মুনির আশ্রমে আরতি ছাড়াও, ভারত সেবাশ্রমে গঙ্গার স্তোত্র উচ্চারণের চেষ্টা করেন মমতা। জনসভায় বলেন, গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যা ধারণ করে, তা-ই ধর্ম বলেছেন। দুর্গম তীর্থ গঙ্গাসাগরের ‘মিথ’ তিনি তাঁর সেতু দিয়ে ভাঙছেন বলেই মমতার দাবি এ দিন প্রকট হয়েছে। তিনি বলেন, “এ বার বলতে হবে, সব তীর্থ এক বার, গঙ্গাসাগর বার বার।” আবার প্রশাসক মমতা জনসভার আগে কার্যত কল্পতরু হয়ে ওঠেন। রাজ্য সরকারের বিবিধ প্রকল্পে সুবিধাপ্রাপ্তদের এক রঙিন প্রদর্শনীও দেখা গিয়েছে মঞ্চে। সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিম হাজরা, মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের সচিব মনোজ পন্থ প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে দ্বীপে ঘোরেন মমতা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)