চোখ-ধাঁধানো র্যাম্পে হাঁটতে পারেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাস্তার লড়াইয়ে এখনও ওস্তাদ তিনিই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!
শাসক দলের পরামর্শদাতা সংস্থা ‘আইপ্যাকে’র কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও দফতরে ইডি-র হানা শুরু হতেই সেখানে পৌঁছে গিয়ে যে কাণ্ড বাধিয়েছেন মমতা, তার পরে রাজ্যের রাজনৈতিক শিবিরে চর্চায় উঠে আসছে এই কথাই। মমতা বৃহস্পতিবার যা করেছেন, ভূ-ভারতে কোনও মুখ্যমন্ত্রী এমন করেননি। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের ওই ভূমিকা একেবারে বেআইনি, এই অভিযোগে সরব সব বিরোধী দল। কিন্তু ইডি-র অভিযান চলাকালীন ঢুকে গিয়ে তাদের নাকের ডগা দিয়ে ফাইল (তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগমাফিক) এবং মোবাইল নিয়ে বেরিয়ে এলেন তৃণমূল নেত্রী, আর তদন্তকারী সংস্থা কিছুই করতে পারল না কেন— এই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিজেপি নেতাদের। প্রশ্ন উঠছে, পশ্চিমবঙ্গে অতীতে সিবিআই বা ইডি-র অভিযান ঘিরে যা সব নজির তৈরি হয়ে আছে, শাসক দলের পরামর্শদাতা সংস্থার দিকে হাত বাড়ানোর আগে সেই রেকর্ড নজরে রাখা হল না কেন? অভিযান হল এবং ইডি-কে দাঁড় করিয়ে রেখে রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণ করে দিলেন মমতা, এই ‘সুযোগ’ কি করে দেওয়া হল?
কলকাতায় ‘আইপ্যাকে’র দফতর এবং আরও কিছু ঠিকানায় ভোর থেকে শুরু হয়েছিল ইডি-র অভিযান। এমন দিনে, যে দিন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক কলকাতায় নেই। খবর পাওয়া মাত্র তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, সঙ্গে পুলিশ বাহিনী। ইডি-র বিরুদ্ধেই ‘অন্যায় তল্লাশি’র পাল্টা অভিযোগ তুলে প্রথমে প্রতীকের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং পরে বিধাননগরে তাঁদের দফতরে ঢুকে গিয়েছেন। হতচকিত ইডি পরে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ যে ভাবে এগিয়েছে, ঠিক সে ভাবেই ‘চিত্রনাট্য’ প্রস্তুত হয়েছিল কি না, সেই রহস্য এবং প্রশ্ন ঘনীভূত হয়েছে!
দিনের শেষে ভোট-মুখী রাজ্যে প্রশ্ন উঠছে, ইডি-কাণ্ডে ফায়দা কার হল? নিজের ভোট কাটা যাচ্ছে (রাজ্যে এসআইআর-এর প্রেক্ষিতে) বুঝেই কি মমতা এত মরিয়া হলেন? তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, কেন্দ্রীয় সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিসন্ধিমূলক অভিযান দলনেত্রীই মাঠে নেমে ভেস্তে দিয়েছেন। বিজেপি নেতাদের পাল্টা দাবি, এ রাজ্যে সংবিধান ও আইনের শাসনের যে মান্যতা নেই, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীই আবার প্রমাণ করে দিয়েছেন! তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, ইডি এবং আইপ্যাক-কে জড়িয়ে এত বড় ঘটনা প্রসঙ্গে রাত পর্যন্ত অভিষেক নিশ্চুপ। রাশ যা হাতে নেওয়ার, তৃণমূল নেত্রীই নিয়েছেন।
রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের মতে, মমতার এ দিনের পদক্ষেপ আইনি দৃষ্টিতে সঙ্গত নয় ঠিকই। কিন্তু রাজনীতির অঙ্কে তাঁর হিসেব নির্ভুল! প্রথমত, দ্রুত ময়দানে নেমে গিয়ে তিনি দলের নেতা-কর্মীদের বার্তা দিয়েছেন, তাঁর সৈনিকদের রক্ষার জন্য তৃণমূল নেত্রী শেষ পর্যন্ত যেতে পারেন। ভোটের আগে যা দলকে আরও চাঙ্গা হয়ে মাঠে নামতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আরও কিছু অভিযানের পরিকল্পনা যদি থেকেও থাকে, এর পরে সবই ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে চিহ্নিত করা যাবে। আর তৃতীয়ত, ইডি-র ভূমিকায় ‘সেটিং’-এর যে অভিযোগ উঠছে, তা-ও তৃণমূলের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর বিজেপির জন্য!
তৃণমূলের একটি সূত্রের খবর, ফাইল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বেরিয়ে আসা অনেকটাই রাজনৈতিক দৃশ্যপট। আইপ্যাক-এর কাজ প্রায় সবই কাগজহীন। বিধানসভা নির্বাচনে প্রতি কেন্দ্রে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা-সহ তৃণমূলের জন্য কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ইডি-র হাতে যেতে পারে আশঙ্কা করে তিনি ঝাঁপিয়েছেন এবং সে সব আগলেছেন। মমতার দাবি, ‘‘মানুষকে সাহায্য করতে এসআইআর, ভোট সংক্রান্ত কাজ চলছে। ফরেন্সিক দল এনে এখানে তথ্য তুলে নিচ্ছে। এটা অপরাধ। আইপ্যাক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। এটা তৃণমূল অনুমোদিত দল। তাদের কাছ থেকে কাগজ লুট করা হয়েছে। এটা হতে দেওয়া যায় না!’’
কিন্তু ইডি-র ভূমিকা তখন কী? প্রশ্ন ওঠায় কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ও বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলছেন, ‘‘ইডি কেন বাধা দিল না, তার জবাব ওদেরই দিতে হবে! আদালতের দ্বারস্থ হলে তারা ঠিক পথ দেখাতে পারবে, আশা করি। সরকারি ফাইল কী ভাবে প্রতীকের বাড়িতে গেল, তার অনুসন্ধানও ইডি-র করা উচিত।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘সাংবিধানিক কিছু অধিকার থাকে, কিছু মর্যাদা থাকে। মর্যাদা ব্যাপারটা নিজের উপরে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে ফাইল ছিনতাই করেছে,ন তার পরে আর এই রাজ্যের সম্মান থাকবে?’’
কেন্দ্রের শীর্ষ স্তর ও মমতার বোঝাপড়ার অভিযোগই ফের সামনে এনেছেন সিপিএম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, “সরকারি কাজে মুখ্যমন্ত্রী বাধা দিলেন। ইডি তাঁকে বাধা দিল না! উনি গেলেন, ফাইল বার করে গাড়িতে তুললেন। সেই গাড়ি তৃণমূলের নামে নথিভুক্ত।” তাঁর দাবি, “মুখ্যমন্ত্রীর বেআইনি কাজে অংশীদার কলকাতার নগরপাল, বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারেট এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি। সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ তৃণমূল দলের কাজ করছে!’’ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের মন্তব্য, “একে তো ভোট এলেই ইডি-সিবিআই তৎপর হয়। নির্বাচন মিটলেই শীত-ঘুমে চলে যায়। তার পরে এখন ইডি-র তল্লাশি, মুখ্যমন্ত্রীর ঘটনাস্থলে পৌঁছনো, পুরোটাই নাটক! ম্যাচ গড়াপেটার অংশ। এঁরা চান, শুধু বিজেপি আর তৃণমূল নিয়ে চর্চা হোক। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইডি তল্লাশি চালানোর সময়ে মুখ্যমন্ত্রী কেন ছুটে গেলেন, আর কী ভাবেই বা ফাইল নিয়ে বেরিয়ে এলেন? ইডি চুপচাপ বসে রইল?’’
এমন প্রশ্নের মুখে তোপ ঘুরিয়ে দিয়ে বিজেপি নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, ভারসাম্য হারিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মরিয়া হয়ে গিয়েছেন! তবে ঘরোয়া মহলে বিজেপিরই এক নেতার প্রশ্ন, ‘‘রাজীব কুমারের বেলায়, ফিরহাদ হাকিমদের সময়ে নিজাম প্যালেসে এই মুখ্যমন্ত্রী কী কী করেছেন, কেন্দ্রীয় সংস্থা জানত না? মনে হচ্ছে, ২০২১-এর আগের ভুল আবার হচ্ছে!’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)