ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে ‘ষড়যন্ত্রে’র অভিযোগে জাতীয় নির্বাচন কমিশনেই যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মন্তব্য, ‘দিল্লি কা লাড্ডুদের চেহারা’ দেখতে যাচ্ছেন! সুপ্রিম কোর্টে দায়ের মামলায় সওয়াল করতে পারেন বলেও ফের জানিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। এ বারের দিল্লি-যাত্রায় মমতার সঙ্গে থাকার কথা রয়েছে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও।
সিঙ্গুরের কর্মসূচি সেরে বুধবারই দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল মুখ্যমন্ত্রীর। কিন্তু মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রেক্ষিতে তিনি শোকাহত জানিয়ে সেই যাত্রা পিছিয়ে দিয়েছেন মমতা। সিঙ্গুরের সভা থেকেই মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘আজ না হোক কাল, আমি যাবই।’’ দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-সহ কমিশনের পূর্ণ বেঞ্চের সঙ্গে মমতা-সহ তৃণমূলের ১৫ জনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত হয়েছে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি, সোমবার। সেই মতোই দিল্লি পৌঁছবেন মমতা, অভিষেক। এসআইআর ঘোষণার পর থেকে তিনি কমিশনের বিরুদ্ধে বারবার যে অভিযোগ করেছেন, তার ‘প্রমাণ’ হিসেবে এই সময় কালে মৃত কয়েক জনের পরিবারের সদস্য ও ভোটার তালিকায় ‘মৃত’ হিসেবে চিহ্নিত কয়েক জনকে সঙ্গে নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
সিঙ্গুরে দলীয় সভায় মমতা বলেছেন, ‘‘মানুষের অধিকার কেড়ে নেবে আর আমি চুপ করে বসে থাকব? অনুমতি পেলে আইনজীবী হিসেবে নয়, আমি সাধারণ মানুষ হিসেবে আদালতে দাঁড়াব।’’ নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, কবি জয় গোস্বামী ও সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যদের এসআইআর-এর শুনানিতে ডাকার কথা টেনে ক্ষুব্ধ মমতার মন্তব্য, ‘‘কমিশনকে দিয়ে নাম কাটাচ্ছে। স্বৈরাচারী সাবধান!’’ তার পরেই নিজস্ব ভঙ্গিতে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা কাউকে মারি না। আমাকে আঘাত করলে আমি টর্নেডো হয়ে যাই! আমাকে রোখার সাধ্য আপনাদের নেই!’’
তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এ দিনই অভিযোগ করেছেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের অফিসারদের ‘অবজার্ভার’ হিসেবে নিয়োগ করে ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার অবজার্ভার জেলার ইআরও-দের যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা বেআইনি।’’
কমিশনের বিরুদ্ধে তোলা হয়রানির অভিযোগ তৃণমূলের দিকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এ দিন ফের বলেছেন, ‘‘এসআইআর-এর হয়রানির জন্য দায়ী তৃণমূলের প্রশাসন।’’ কমিশনের সক্রিয়তা বাড়ানোর পক্ষে সওয়াল করে শুভেন্দুর বক্তব্য, ‘‘রাজ্যে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) ছাড়া কমিশনের কেউ নেই। বাকিরা রাজ্য সরকারের কর্মী-আধিকারিক। তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের যে বিপুল ক্ষোভ, তা থেকে নজর ঘোরাতে মানুষকে পরিকল্পিত ভাবে হেনস্থা করছে। বিজেপি কর্মীদের এই স্তাবক প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।” তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি কমিশনের কাছে অনুগ্রহ নয়, স্বচ্ছতা চায়।’’
এসআইআর-এ ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’র তথ্য প্রসঙ্গে মহিলাদের হেনস্থার অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উদ্দেশে মমতা বলেছেন, ‘‘আপনাকে (প্রধানমন্ত্রী) জিজ্ঞেস করছি, যদি স্বীকার করেন তো বলুন, আপনার স্ত্রীর পদবি কী? মিস্টার হোম মিনিস্টার, অনেক করেছেন! আপনার স্ত্রীর পদবি কী? আপনারা মহিলা-বিরোধী। এ সব চলবে না।’’ দিল্লি-যাত্রার পাশাপাশি রাজ্য বিধানসভার আসন্ন অধিবেশনেও এসআইআর-বিরোধী প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার পক্ষ। ‘ভোট অন অ্যাকাউন্টস’-এর পরে এই প্রস্তাবের উপরে আলোচনা হতে পারে।
নির্বাচনী আবহে সাধারণ মানুষের আবেগ ছুঁতে মমতা এ দিন বলেছেন, ‘‘আমি সব কিছুর জন্য তৈরি। আমাকে জেলে ঢোকালে মা-বোনেরা জবাব দেবেন। শ্রমিক-কৃষক জবাব দেবে। মা-বোনেরা ঘরে ঘরে নাড়ু বানাবেন! আমাকে তোমরা ঘেঁচু করবে!’’ সাধারণ জনতার উদ্দেশে মমতার আবেদন, ‘‘ভয় পাবেন না। আত্মহত্যা করবেন না। বাংলায় কোনও ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ হবে না। বাংলায় এনআরসি হবে না।’’ যদিও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কটাক্ষ, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কোনও প্রতিযোগিতা কিংবা যুদ্ধ চাইছি না। আমরা ওঁকে শান্তিতে বিশ্রামে পাঠাতে চাইছি।’’
বিভাজনের রাজনীতি এবং এসআইআর-এর নামে হয়রানি-সহ একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলে এ দিনই কলকাতার উত্তরে সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে শ্যামবাজার এবং দক্ষিণে যাদবপুর ৮বি থেকে টালিগঞ্জ ফাঁড়ি পর্যন্ত মিছিল করেছে বাম দলগুলি। যাদবপুরের মিছিলে ছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এবং সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের প্রতিবাদে ছিলেন দলের কলকাতা জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার-সহ বাম নেতৃত্ব।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)