গত পঞ্চাশ বছরে বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বহু বার এমন সময় এসেছে, যখন নানা দেশ ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে গভীর আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে। কখনও এই সঙ্কট সীমাবদ্ধ থেকেছে কোনও অঞ্চলে, আবার কখনও তা ছড়িয়েছে বিশ্ব জুড়ে। ঋণের বোঝায় অনেক দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে— কোথাও সাময়িক ভাবে, কোথাও দীর্ঘমেয়াদে। ফল— পণ্যের দাম বেড়েছে আকাশছোঁয়া, আর সাধারণ মানুষের জীবন হয়েছে দুর্বিষহ।
আশির দশকের গোড়ায় লাতিন আমেরিকায় প্রথম বড় ঋণ-সঙ্কট দেখা দেয়। সত্তরের দশকে সহজ শর্তে ‘পেট্রো-ডলার’ পাওয়ার ফলে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ঋণ নিয়ে দ্রুত বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়িয়ে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখেছিল। প্রথম দিকে সেই ঋণ অর্থনীতিতে গতি আনলেও পরবর্তী কালে বৈশ্বিক মন্দা, সুদের হার বৃদ্ধি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের ধাক্কায় তারা গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে।
১৯৮২ সালে মেক্সিকো ঘোষণা করে যে, তারা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে অক্ষম, যা পুরো অঞ্চলে আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনে। মেক্সিকোতে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ থেকে লাফিয়ে শতকরা ১০০-রও বেশি হয় এবং পেসোর মারাত্মক অবমূল্যায়ন ঘটে। একই ভাবে ব্রাজ়িল, আর্জেন্টিনা ও পেরুতেও মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায়; ব্রাজ়িলে ১৯৮৩-৮৫ সালে তা ২০০ শতাংশ এবং ১৯৯০ সালে প্রায় ২,৯৪৭ শতাংশে পৌঁছয়। পেরুতেও ১৯৮৫ সালে প্রায় ১৬৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি দেখা যায়। ফলে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন।
নব্বইয়ের দশকে দ্বিতীয় ঋণ-ঢেউ আঘাত হানে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপিনস ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দ্রুত উন্নয়নের ফলে বিপুল বিদেশি পুঁজি প্রবাহিত হয়, যা স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়েছিল, বিশেষত রিয়াল এস্টেটে। ১৯৯৭ সালে ঋণপ্রবাহ হঠাৎ থেমে গেলে শুরু হয় ভয়াবহ মুদ্রা-সঙ্কট। তাই বাথ, ইন্দোনেশীয় রুপিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ান ওন ও মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত-এর বিনিময়মূল্যে প্রবল পতন ঘটে। ফলে অঞ্চল জুড়ে প্রবৃদ্ধির ধস নামে, যদিও মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক ভাবে সীমিত ছিল।
ঋণের তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানে ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায়। শুরুতে ঋণ ও বিনিয়োগে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হলেও ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কটে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো চরম চাপে পড়ে।
বর্তমান চতুর্থ ঢেউ শুরু ২০১০ সালে— ইতিহাসের দ্রুততম ও বৃহত্তম ঋণবৃদ্ধি। অতিমারি-পরবর্তী আর্থিক সম্প্রসারণ, সুদের হার বৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় বৈশ্বিক ঋণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০১০-এর ৫১ লক্ষ কোটি ডলারের সরকারি ঋণ ২০২৪-এ দ্বিগুণ হয়ে ১০২ লক্ষ কোটিতে, বৃদ্ধি বছরে গড়ে ৫.২% হারে।
সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র (৩৬.৩ লক্ষ কোটি ডলার), এর পর চিন, জাপান, ব্রিটেন ও ফ্রান্স, এবং ভারত। শীর্ষ দশ দেশের কাছেই কেন্দ্রীভূত বিশ্বের প্রায় ৮০% সরকারি ঋণ। তবে মোট ঋণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল প্রতিটি দেশের জাতীয় আয়ের তুলনায় ঋণের অনুপাত।
আইএমএফ-এর ২০২৩ সালের তথ্যমতে, জাপানের সরকারি ঋণ জাতীয় আয়ের প্রায় ২৫০%— বিশ্বে সর্বাধিক। পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া ঋণ সত্ত্বেও ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জাপানের আয়বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার মাত্র ০.৬৩%। দ্বিতীয় ইটালি। মার্কিন ঋণের বড় অংশের ধারক জাপান, ব্রিটেন ও চিন। একই সময়ে ভারতে এই অনুপাত ৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় ৮৩ শতাংশে।
২০২৫ সালের বাজেট অনুযায়ী, ভারতের মধ্যে সর্বাধিক ঋণগ্রস্ত রাজ্য তামিলনাড়ু (৯.৬ লক্ষ কোটি টাকা), এর পর উত্তরপ্রদেশ (৮.৬), মহারাষ্ট্র (৮.১), কর্নাটক (৭.৩) ও পশ্চিমবঙ্গ (৭.১ লক্ষ কোটি টাকা)। ২০১০-২০২৫ সময়ে ঋণ বৃদ্ধির বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি হার সর্বোচ্চ ছত্তীসগঢ়ে, তার পর তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গে। ঋণ-জিএসডিপি অনুপাত অনুযায়ী দু’-তিনটি রাজ্যের পরই পশ্চিমবঙ্গের স্থান।
সরকারি ঋণ উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সরকারের ব্যয় ও বিনিয়োগে সহায়তা করে। তবে ঋণের ব্যয় যেন বিনিয়োগের লাভের চেয়ে বেশি না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অবাক লাগে, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান ঋণ-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে সরকারি লক্ষ্য আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের লক্ষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। বেশির ভাগ মানুষের লক্ষ্য থাকে সম্পদ আহরণ এবং সেই সম্পদ হস্তান্তর বা স্থানান্তর বর্তমান প্রজন্ম থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে। অন্য দিকে, এই ক্রমবর্ধমান ঋণ-জিডিপি অনুপাত ইঙ্গিত করে যে ব্যাপক ঋণের দ্বারা সম্পদ স্থানান্তর হচ্ছে উল্টো পথে— ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে বর্তমান প্রজন্মের দিকে।
অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, যখন ঋণ অতিরিক্ত বাড়ে ও ঋণ বাবদ ব্যয় ঋণ থেকে পাওয়া উপকারের তুলনায় বেশি হয়, তখন তা বোঝায় পরিণত হয়। বহু দেশে সুদ পরিশোধের ব্যয় এখন স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যয়ের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে। তাই ঋণ যেন উন্নয়নের সহায়ক হয়, বোঝা নয়— এটি মনে রাখাই সবচেয়ে জরুরি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)