E-Paper

আগ্নেয় ফাঁদ

এত ভয়ানক কাণ্ডের পরও রাজ্যের দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু বত্রিশ ঘণ্টা পার করে ফেললেন অকুস্থলে যেতে। এই একটি ঘটনাতেই তাঁর ও তাঁদের অগ্রাধিকার-বোধ নিয়ে— প্রশ্নচিহ্ন নয়— বিরাট বিস্ময়চিহ্ন তৈরি হয়।

শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২০

ছেলে কাজ করতে আসছে মৃত্যু-ফাঁদের মধ্যে, জানতাম না— আনন্দপুরের নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে আসা প্রবীণেরকথাগুলি এক কথায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়। আক্ষরিক অর্থে মৃত্যু-ফাঁদ। গুদাম-ভর্তি দাহ্য পদার্থ, কোনওটিতে খাবার বানানোর কাঁচামাল, কোনওটিতে মণ্ডপসজ্জার কাঠ, কাপড়, থার্মোকল। সেই গুদামেই থাকতেন শ্রমিকরা, সেখানেই রান্না-খাওয়া-ঘুমের বন্দোবস্ত। সুতরাং, গভীর রাতে যখন গুদামে আগুন লাগে, অধিকাংশই বেরোনোর পথ পাননি। অগ্নিগ্রাসে জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছেন। অনেকের দেহাংশটুকুও মেলেনি, ‘নিখোঁজ’দের খোঁজে চলছে অন্তহীন প্রতীক্ষা। ‘নিখোঁজ’ প্রশাসনিক দায়িত্ববোধও। জলাভূমি বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণ, যেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই দিনের পর দিন এত মানুষ কাজ করতেন, সেখানে পুলিশ-প্রশাসন কী করছিল? কেন বার বার অগ্নিকাণ্ডের পরও সতর্ক হয় না প্রশাসন? প্রতি বার অগ্নিকাণ্ডের পর আইনি ব্যবস্থার ফাঁকা বুলি আওড়ানো হয়। অন্য দিকে শহর জ্বলতেই থাকে, সাক্ষী হয় একের পর এক শবমিছিলের, প্রতীক্ষা করে পরের অগ্নিকাণ্ডের সংবাদে ঘুম ভাঙার জন্য।

এই সচেতন অপদার্থতা এমনই প্রকট যে, গুদাম মালিককে গ্রেফতারেও তাকে ঢাকা দেওয়া যায় না। এখনও বছর ঘোরেনি, জোড়াসাঁকো থানা এলাকার মেছুয়ার হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনার। সেখানেও অভিযোগ উঠেছিল, দমকলের ছাড়পত্রের মেয়াদ ঘটনার তিন বছর আগে শেষ হয়ে গেলেও প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ করেনি। হোটেলের যে তলায় আগুন লাগে, সেই তলাতেই রান্নার ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূত ভাবে পানশালা ও ডান্স ফ্লোরের কাজ চলছিল। খোদ মুখ্যমন্ত্রী একাধিক বার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন জতুগৃহ হয়ে থাকা বড়বাজার নিয়ে। সে নির্দেশেরই বা কতটুকু পালন হয়েছে? তার পরেও বড়বাজারে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। কোন অসহ্য স্পর্ধায় প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের নির্দেশও অমান্য করা যায়, সে প্রশ্নের উত্তর মেলে না। বরং প্রচুর প্রতিশ্রুতি ভেসে আসে, বাগড়ি মার্কেট, গড়িয়াহাটের গুরুদাস ম্যানসন, এজ়রা স্ট্রিট, শহরে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে, পরের অগ্নিকাণ্ডে সে সব প্রতিশ্রুতি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ কথা বহুজ্ঞাত, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পূর্ব কলকাতার জলাভূমির একাংশ বুজিয়ে এই নির্মাণ। অভিযোগ, বেআইনি ভাবে এই সংরক্ষিত এলাকা বুজিয়ে গ্যারাজ, গুদাম, ছোট-বড় দোকান, এমনকি বহুতলও গড়ে তোলা হচ্ছে। সম্প্রতি এই প্রসঙ্গে রাজ্যের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এক আশ্চর্য কথা বলেছেন— সংশ্লিষ্ট গুদাম-সহ নির্মাণগুলি সব ২০০৬ সালের আগে হয়েছে, অর্থাৎ বাম আমলে। সবিনয় প্রশ্ন, অতঃপর কুড়ি বছর অতিক্রান্ত। তার মধ্যে পুরমন্ত্রীর দলই পনেরো বছর ধরে ক্ষমতায়। তা হলে বেআইনি নির্মাণগুলির বিরুদ্ধে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ করা গেল না কেন? বেআইনি নির্মাণ ধ্বংস করে জলাভূমিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি হামেশাই মুখে শোনা যায়, পনেরো বছর কি তার পক্ষে যথেষ্ট সময় নয়?

লক্ষণীয়, এত ভয়ানক কাণ্ডের পরও রাজ্যের দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু বত্রিশ ঘণ্টা পার করে ফেললেন অকুস্থলে যেতে। এই একটি ঘটনাতেই তাঁর ও তাঁদের অগ্রাধিকার-বোধ নিয়ে— প্রশ্নচিহ্ন নয়— বিরাট বিস্ময়চিহ্ন তৈরি হয়। দায়িত্বপালন ছাড়াও মানবিক সংবেদনের প্রশ্নটি জরুরি। মুখ্যমন্ত্রীও অন্যত্র অন্যথা ব্যস্ত রইলেন। অথচ ইতিহাস বলে, আগে একাধিক দুর্ঘটনাস্থলে নিজে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি সামলেছেন তিনি। নেতামন্ত্রীদের উপস্থিতি ছাড়াও দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধারকাজ নিজের মতোই চলার কথা, কিন্তু এত বড় বিপর্যয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দগ্ধভাল পরিবার বা ব্যক্তিবর্গের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোও স্বাভাবিক শাসনবোধ। বদলে, নিজেদের নির্বিকারতা ও নিষ্ক্রিয়তার দায় চাপানো চলে অন্যের ঘাড়ে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Fire Anandapur

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy