E-Paper

শিক্ষার ‘মূল্য’

রাজ্যের সরকারি স্কুলে শিক্ষার সার্বিক হাল সবার জানা। এই পরিস্থিতিতে ‘ভাল’ বেসরকারি স্কুলে সন্তানকে পড়াতে গেলেও অভিভাবকদের আর্থিক ক্লেশ ক্রমেই বাড়ছে। আবার অর্থনীতি ও বাজারের নিয়ম মেনেই অসরকারি সংস্থার উপর সরকারি হস্তক্ষেপ ন্যূনতম হওয়াই কাম্য।

শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৭

দিল্লিতে বেসরকারি স্কুলগুলির সঙ্গে রাজ্য সরকারের মতবৈপরীত্য সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট অবধি পৌঁছেছে, গত বছর দিল্লি সরকারের চালু করা ‘দিল্লি স্কুল এডুকেশন (ট্রান্সপারেন্সি ইন ফিক্সেশন অ্যান্ড রেগুলেশন অব ফিজ়) অ্যাক্ট ঘিরে। বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনার খরচ বেঁধে দেওয়া ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষের সর্বময় আধিপত্যে রাশ টানতে চাইছে দিল্লি সরকার; নতুন আইন অনুযায়ী স্কুল-ফি বাড়াতে হলে আগে একটি দ্বিস্তরীয় নিয়ন্ত্রক-কাঠামোর সম্মতি প্রয়োজন হবে: একটি হল স্কুল স্তরে ফি রেগুলেশন কমিটি (এসএলএফআরসি), অন্যটি জেলা স্তরীয় আপিল-বিবেচনা কর্তৃপক্ষ। এসএলএফআরসি-তে স্কুল পরিচালন-প্রতিনিধি, প্রধান শিক্ষক ও আরও তিন শিক্ষক ছাড়াও পাঁচ জন অভিভাবক ও শিক্ষা দফতরের এক জন মনোনীত সদস্যকে রাখতে বলায় স্কুলগুলির আপত্তি, স্কুলের ফি নিয়ন্ত্রণের কাজ এতে স্কুল পরিচালন-কর্তৃপক্ষের হাত থেকে চলে যাচ্ছে শিক্ষক-সহ অন্যদের হাতে।

পশ্চিমবঙ্গে এ রকম কোনও আইন রাজ্য সরকার করেনি বটে, তবে এ রাজ্যেও বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনার ক্রমবর্ধমান খরচের আবহে অভিভাবক মহলে কান পাতলে শোনা যায় এই অনুযোগ: সরকার কেন কিছু করছে না, বেসরকারি স্কুলের ফি বেঁধে দেওয়ার বা অন্তত তা যাতে মাত্রা না ছাড়ায় সেটা নজর রাখার একটা ব্যবস্থা থাকবে না কেন। সাম্প্রতিক কালে রাজ্যের প্রথম সারির কিছু বেসরকারি স্কুলের ফি-র খতিয়ান সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছে; পূর্বঘোষণা না করে বা অভিভাবকদের যথেষ্ট সময় না দিয়েই কিছু স্কুল হঠাৎ ফি বাড়িয়ে দেওয়ায় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিভাবকদের বিক্ষোভও দেখা গেছে। দু’পক্ষের আলোচনায় সাময়িক সমাধান মিললেও অভিভাবকদের মধ্যে এই অসন্তোষ মোছেনি যে, এ রাজ্যে বেসরকারি স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় খরচপত্রের রাশ কার্যত স্কুল পরিচালন-কর্তৃপক্ষের হাতেই, তাঁদের সিদ্ধান্ত মেনে না নিলে ঠারেঠোরে বা সোজাসুজি নিদান আসে সন্তানকে এই স্কুল থেকে তুলে নিয়ে অন্য তথা ‘সরকারি’ স্কুলে পড়ানোর।

রাজ্যের সরকারি স্কুলে শিক্ষার সার্বিক হাল সবার জানা। এই পরিস্থিতিতে ‘ভাল’ বেসরকারি স্কুলে সন্তানকে পড়াতে গেলেও অভিভাবকদের আর্থিক ক্লেশ ক্রমেই বাড়ছে। আবার অর্থনীতি ও বাজারের নিয়ম মেনেই অসরকারি সংস্থার উপর সরকারি হস্তক্ষেপ ন্যূনতম হওয়াই কাম্য। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হওয়ার কথা নয়— পরিচালন-কর্তৃপক্ষের নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা সেখানে খরচপত্রের বিষয়টি চালিত করবে, এমনই কাঙ্ক্ষিত। শিক্ষাকে আর পাঁচটি পণ্য ও পরিষেবার মতো ভাবা চলে না: বিশেষত স্কুলশিক্ষা এক অনস্বীকার্য অধিকার, ভবিষ্যতের নাগরিকের সুস্থ ও সুস্থিত জীবন গড়ার প্রথম ধাপ। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে রাজ্যের স্কুলগুলির প্রয়োজন ছিল এই সারসত্যের প্রয়োগভূমি হয়ে ওঠার। তার বদলে দেখা যাচ্ছে, সরকারি স্কুল মানে শিক্ষকহীন ছাত্রহীন এক অবহেলার ছবি, আর বেসরকারি স্কুল মানে অভিভাবকদের নাভিশ্বাস ও দীর্ঘশ্বাসের প্রতিশব্দ। দিল্লির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারের আইন আনার প্রয়োজনীয়তাকে যেমন সমর্থন করেছে, তেমনই তাড়াহুড়ো করে আইন চালু করার ব্যাপারে সতর্কও করেছে। অন্য রাজ্য সরকারগুলিও এ থেকে শিক্ষা নিলে ভাল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Education system Students

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy