E-Paper

চুক্তি-কর্মী সেই তিমিরেই

দোকানের দরজা সওয়া ন’টা নাগাদ বন্ধ হলেও, ব্যাক অফিসের কাজ এবং স্টক মিলিয়ে বেরোতে হয়।

কিংশুক সরকার

শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩০

ডিসেম্বরের সন্ধ্যা, সেক্টর ফাইভের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প তালুকের একটি বাস স্টপে দাঁড়িয়ে শালিনী। মুখে ক্লান্তির সঙ্গে মিশেছে দুশ্চিন্তা। আবার চাকরির চুক্তি ‘রিনিউ’ করার সময় এসে গিয়েছে। কাজের টার্গেট ধরতে পেরেছেন, কাজের মূল্যায়নের মিটিং-ও ভাল হয়েছে। তবু হাতে নতুন চুক্তি না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তা যায় না। এই অনিশ্চয়তায় ভোগেন প্রায় সমস্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী।

সোমবার বিকেল। চন্দ্রা তাঁর স্কুটি নিয়ে গড়িয়াহাটের একটি রেস্তরাঁর সামনে অপেক্ষমাণ। গত পাঁচ ঘণ্টায় তিনি মাত্র দুটো অর্ডার ডেলিভারি করতে পেরেছেন। অ্যাপ-এ লগ ইন করে অপেক্ষা করছেন ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পাশ করা চন্দ্রা। সপ্তাহান্তে ডেলিভারির চাপ থাকে, শুরুতে চাহিদা কম। কত টাকা আজ পাওয়া যাবে, সেই চিন্তায় ঘন ঘন ফোন দেখেন।

দোকানের কাজ সেরে বেরোতে অরূপের প্রায়ই রাত দশটা বেজে যায়। দোকানের দরজা সওয়া ন’টা নাগাদ বন্ধ হলেও, ব্যাক অফিসের কাজ এবং স্টক মিলিয়ে বেরোতে হয়। আবার পরের দিন সকাল সাড়ে ন’টার মধ্যে ঢুকতে হয়, কারণ দশটার মধ্যে দোকান খুলে যায়। অনেক সময়ে সপ্তাহে এক দিন ছুটিও মেলে না। শরীর-মন চলে না, কিন্তু উপায় নেই, বি কম পাশ অরূপ আর কোনও কাজ পাননি।

নতুন চারটি শ্রম বিধি বলবৎ হওয়ার ফলে কি শালিনী, চন্দ্রা বা অরূপের অবস্থার কোনও উন্নতি হবে? সরকারি দফতর আর বাণিজ্যিক সংস্থা, সর্বত্রই স্বল্পমেয়াদের চুক্তিতে নিয়োগই যখন দস্তুর হয়ে উঠেছে। গত তিন দশকে কাজের বাজার ক্রমাগত অসংগঠিত ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়েছে। স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ না-করে, তাঁর কাজ অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের দিয়ে করানো হচ্ছে। যে কাজ শালিনী অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী হিসাবে করছেন, তিন দশক আগে সেই কাজই এক জন স্থায়ী শ্রমিক করতেন। ইদানীং নিয়োগকারীরা মনে করছেন, শ্রমের ব্যয় কমানো মানে উৎপাদন ব্যয় কমানো, তাতে লাভের অংশ বাড়ে। এক জন অস্থায়ী কর্মচারীকে পিএফ, ইএসআই, গ্র্যাচুইটি ইত্যাদি দিতে হয় না। বোনাস দেওয়ারও বাধ্যতা নেই। মহিলা কর্মচারীরা মাতৃত্বকালীন সুবিধা পান না। এই সব সুবিধা শুধুমাত্র স্থায়ী শ্রমিক কর্মচারীদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল এত দিন।

শ্রম বিধি কি চুক্তিকর্মীদের এই সব সঙ্কট বুঝে নিয়োগ-চিত্রে পরিবর্তন আনতে পারবে? সংক্ষিপ্ত উত্তর, না। নতুন আইনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু চুক্তির সময়সীমা কী হবে, বা কত বার চুক্তি নবীকরণ করা যাবে, সে ব্যাপারে কোনও বিধিনিষেধ রাখা হয়নি। ফলে কোনও কর্মচারী দীর্ঘ দিন ভাল কাজ করেও আশা করতে পারেন না যে তাঁকে স্থায়ী করা হবে। চুক্তিতে পুনর্বহাল হওয়ার আশাই করতে পারেন শুধু। তাই শালিনীর মতো কর্মচারীদের কাজের অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়েই কাজ করে যেতে হবে। তাঁরা সামাজিক সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত হবেন। মাতৃত্বকালীন সুবিধা না-পাওয়ায় হয় স্বল্প দিনের ছুটির পরেই কাজে ফিরতে হবে, না হলে চাকরি ছেড়ে দিতে হবে।

নতুন লেবার কোডে গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের অসংগঠিত শ্রমিকদের অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে। অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প প্রণয়ন করবে। ই-শ্রম পোর্টালে নাম তুললে পেনশন, বিমা প্রভৃতি পাওয়া যাবে। কিন্তু ন্যূনতম মজুরি, সম্মানজনক কাজের শর্ত, কাজের সুরক্ষা— কোনও কিছুই শ্রম বিধিতে নেই। তাই চন্দ্রার মতো প্ল্যাটফর্ম কর্মচারীদের আয়ের নিশ্চয়তা থাকবে না। বস্তুত এই ধরনের কাজে নিয়োগ-সম্পর্ক শ্রম বিধিতে স্বীকৃতি পায়নি। বলা হয়েছে এই ধরনের কাজ “এত দিন চলে আসা নিয়োগ-সর্ম্পকের বাইরে।” এখানে অ্যাপ-কোম্পানিগুলি নিজেদের নিয়োগকারী না বলে ‘অ্যাগ্রিগেটর’ বলছে, আর কর্মচারীদের বলা হচ্ছে স্ব-নিয়োজিত শ্রমিক বা ঠিকাদার। নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারত-সহ সারা বিশ্বে প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়বে। নতুন বিধিতে তাঁদের প্রাপ্য কেবল সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি।

অরূপের মতো দোকান এবং অফিস কর্মচারীদের জন্যেও নতুন চারটি বিধিতে তেমন কোনও আশ্বাস বা সুরাহা নেই। প্রচার করা হচ্ছে নিয়োগপত্র বা বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা বলে, শ্রম আইন মান্য করা হচ্ছে, তা দেখাতে হলে এত দিন নিয়োগকারীরা কেবল স্থায়ী কর্মীদেরই দেখাত। শ্রম বিধিতেও এমন কিছু নেই, যা সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারে। এমনকি স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, প্রাণের নিরাপত্তার আশ্বাসও অস্থায়ী কর্মচারীদের দেওয়া হচ্ছে না। কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিধি (২০২০) প্রযোজ্য হবে কেবল সেই সব সংস্থায় যেখানে দশ বা তার অধিক শ্রমিক-কর্মচারী রয়েছেন। ফলে অরূপের মতো অনেকেই স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ, বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ পাবেন না।

শ্রম বিধিতে ১২ ঘণ্টা কর্মদিবস নির্ধারণ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে নিয়োগকারীদের। গত দু’দশকে দেখা গিয়েছে, যে সব জায়গায় ২৪ ঘণ্টা কাজ হয়, সেগুলিতে তিনটে শিফট কমে দু’টিতে দাঁড়িয়েছে। বরং কর্মচারীদের ছাঁটাই করা, বা সংস্থা বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ প্রসারিত করেছে শ্রম বিধি। এতে নাকি কাজের বাজার আরও নমনীয় হবে। সেই নমনীয়তার কঠিন বোঝা বহন করবেন অস্থায়ী চুক্তিকর্মীরা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Job Security

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy