E-Paper

আঁচ কমছে, এই সুযোগ

২০১৫ সালে ভারত-চিন সম্পর্কে টানাপড়েনের ফলে সৃষ্ট শূন্যতার পরিসর ভরাট করতে নেপালে চিনের আগ্রাসন বৃদ্ধি পায়। ‘নেকড়ে যোদ্ধা কূটনীতি’ থেকে খানিকটা সরে এসে চিন তখন থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে নেপালের পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় মাত্রায় অংশীদার হতে শুরু করে।

বিজেত্রী পাঠক

শেষ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৭

নেপালে কি ড্রাগনের নিঃশ্বাসে আগুনের আঁচ ক্রমশ কমছে? অলঙ্কার বাদ দিয়ে সরাসরি বললে প্রশ্নটা দাঁড়ায় এ রকম— নেপালের উপর চিনের রাশ কি ক্রমশ আলগা হচ্ছে? সম্প্রতি একটি ঘটনায় কিন্তু তেমনই ইঙ্গিত মিলেছে।

সে দেশের দুর্নীতি নিবারণকারী সংস্থা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বিশেষ আদালতে অন্তত ৫৫ জনের বিরুদ্ধে পোখরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ সংক্রান্ত বেনিয়মের মামলা রুজু করতে পেরেছে। এই তালিকায় প্রাক্তন মন্ত্রী ও সরকারি আমলা-সহ রয়েছেন বিমানবন্দর নির্মাণকারী চিনের সংস্থার আধিকারিকরাও। বিমানবন্দরটি তৈরিতে চিনা ঋণের পরিমাণ প্রায় ২১ কোটি ৫৯ লক্ষ ৬০ হাজার ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় তা দাঁড়ায় ১৯৭৯ কোটি টাকার কাছাকাছি। মামলার চার্জশিটে দাখিল করা অভিযোগ অনুযায়ী, উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিক যোগসাজশের কারণে ব্যয়ভার বাড়িয়ে দেখানোয় প্রকল্পটিতে ক্ষতির বহর প্রায় ৭ কোটি ৪৪ লক্ষ ডলার। এমন বিরাট ব্যয়ভার বহন করা এবং বিপুল ক্ষতি স্বীকার করা সত্ত্বেও বন্দরটি আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। ফলে, আজ পর্যন্ত ওই বন্দরে কোনও আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার উড়োজাহাজ ওঠানামা করেনি। নকশার ত্রুটি থেকে শুরু করে জ্বালানি রাখা, রানওয়ের নিকাশি ব্যবস্থা— বিবিধ ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে বিমানবন্দরটিতে।

নেপাল এই বিমানবন্দর বিষয়ক সমঝোতা চুক্তি বা মউ স্বাক্ষর করার আগেই চিন একতরফা ভাবে ঘোষণা করে দেয় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের অধীনে পোখরা বিমানবন্দরই সর্বোৎকৃষ্ট প্রকল্প। এই ঘোষণায় নেপাল সরকার বার বার আপত্তি জানালেও তাতে কর্ণপাত না করে নেপালকে কুক্ষিগত করার দুর্নিবার ইচ্ছার বশে চিন এই কৌশলগত পদক্ষেপ করতে ইতস্তত করেনি। কিছুটা তারই পরিণামে গত সেপ্টেম্বরে নেপাল জেন-জ়ি বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়। এর ফলে ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে সে দেশের অবস্থানে খানিকটা পরিবর্তন এসেছে বটে।

২০১৫ সালে ভারত-চিন সম্পর্কে টানাপড়েনের ফলে সৃষ্ট শূন্যতার পরিসর ভরাট করতে নেপালে চিনের আগ্রাসন বৃদ্ধি পায়। ‘নেকড়ে যোদ্ধা কূটনীতি’ থেকে খানিকটা সরে এসে চিন তখন থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে নেপালের পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় মাত্রায় অংশীদার হতে শুরু করে। বস্তুত, নেকড়ে যোদ্ধা কূটনীতি ছিল চিনের আক্রমণাত্মক কূটনীতি, যেখানে দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে ঘরে-বাইরে কোনও সমালোচনাকেই ছাড় দিতে রাজি ছিল না তারা। জলবিদ্যুৎ, রাস্তা নির্মাণ, বিমান চলাচল এবং টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলিতে চিনের সংস্থাগুলির জড়িয়ে পড়ার সূচনা তখন থেকেই।

কিন্তু, এই চিনা অংশীদারির বাড়াবাড়ি প্রথম ধাক্কা খায় গত বছর বেশ কিছু কাল ধরে চলা জেন-জ়ি’র আন্দোলনের জেরে, কে পি ওলি সরকারের আমলে। নেপালের ক্ষমতার মসনদ থেকে তাঁর অপসারণ এক দিকে যেমন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করে, তেমনই সে দেশে দীর্ঘ দিন ধরে চিনের মদতে রচিত ক্ষমতা-বৃত্ত ক্ষতিগ্রস্ত করে। নেপালের পরবর্তী রাজনৈতিক মানচিত্রে ওলি-র পার্টির একই মর্যাদা ও গুরুত্ব ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সমীকরণ বদল স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন অনেক মেপেজুখে নতুন প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি-কে অভিনন্দনবার্তা পাঠায় চিন, যেখানে ভারত ও পশ্চিমি দেশগুলির অভিনন্দন বার্তায় ছিল উচ্ছ্বাস ও উষ্ণতা।

জেন-জ়ি’র প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে চিনের অতিসক্রিয় চালচলন অপেক্ষাকৃত সতর্ক পদক্ষেপে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে চিন যে মাত্রায় নেপালে বিনিয়োগ করেছে এবং যে ভাবে সে দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকে লালনপালন করেছে, তাতে ভারত ও পশ্চিমের দেশগুলো সে দেশে চিনের কৌশলগত প্রভাবে অবিলম্বে আঘাত হানার কথা ভাবলে ভুল করবে বলেই মনে হয়।

কিন্তু, নেপালের বর্তমান সরকার যদি তাদের দুর্নীতি-বিরোধী অবস্থান বজায় রাখে, তা হলে চিনা প্রভাব সে দেশের উপর আরও কমতে বাধ্য। কারণ, নেপালে আর্থিক কেলেঙ্কারিতে চিনা কর্তৃপক্ষের জড়িত থাকা কিংবা রাজনৈতিক শক্তি করায়ত্ত করার লক্ষ্যে দরকার মতো সরকার ভাঙা-গড়ার খেলায় চিনের যোগাযোগ এখন প্রায় সর্বজনবিদিত।

ভারত কিন্তু এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নেপালের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে তৎপর হতে পারে। নেপালের সরকার ও সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা, যা গত কয়েক বছরে তলানিতে ঠেকেছে, ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। ভারত যদি নেপালে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্যে ও পরোক্ষে সাহায্য করে, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক ক্ষেত্রে সে দেশের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, তবেই সে ফের নেপালের আস্থাভাজন ও প্রাচীনকাল থেকে সাংস্কৃতিক পরিসরে তাদের অংশীদার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারবে। নেপালের বর্তমান রাজনৈতিক প্রশাসন গণতান্ত্রিকতা, সুশাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে হাঁটতে চাইছে। এমতাবস্থায় ভারতের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সাহচর্য অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-সমীকরণ বদলে দিতে পারে। ড্রাগনের নিঃশ্বাসে ঢিমে হয়ে যাওয়া আগুনের সেই আঁচ সে সুযোগ করে দিচ্ছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Pokhran Nepal India-China

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy