E-Paper

ডিএনএ পরীক্ষায় কি এক মাস, হাতে রইল হলুদ স্লিপ

নরেন্দ্রপুরের গুদামে অগ্নিকাণ্ডের পরে স্থানীয় থানায় ভিড় করেছেন নিখোঁজ কর্মীদের পরিজনেরা। মঙ্গলবার তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বারুইপুর জেলা পুলিশের নামে ছাপানো হলুদ স্লিপ। তাতে উল্লেখ রয়েছে একটি জেনারেল ডায়েরি নম্বর।

শান্তনু ঘোষ, নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৫
(উপরে) দগ্ধ গোডাউনের ভিতরে উদ্ধারকারী। (নীচে) আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

(উপরে) দগ্ধ গোডাউনের ভিতরে উদ্ধারকারী। (নীচে) আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। — নিজস্ব চিত্র।

প্রিয়জন কোথায়? উত্তর জানতে পরিজনের এখন একমাত্র ভরসা একটি হলুদ স্লিপ!

নরেন্দ্রপুরের গুদামে অগ্নিকাণ্ডের পরে স্থানীয় থানায় ভিড় করেছেন নিখোঁজ কর্মীদের পরিজনেরা। মঙ্গলবার তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বারুইপুর জেলা পুলিশের নামে ছাপানো হলুদ স্লিপ। তাতে উল্লেখ রয়েছে একটি জেনারেল ডায়েরি নম্বর। পরিজনের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়ে আপাতত শুধু এই স্লিপই পাওয়া গিয়েছে। যা দিয়ে পুলিশের তরফে বলে দেওয়া হয়েছে, মৃতদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। তার জন্য নমুনা সংগ্রহের সময় ডাকলে প্রমাণ স্বরূপ নিকটাত্মীয়কে নিয়ে আসতে হবে ওই হলুদ স্লিপ।

কিন্তু কবে হবে সেই প্রক্রিয়া? তত দিন কি কোনও ভাবেই জানা যাবে না, মানুষগুলো গেল কোথায়? সেই উদ্বেগে প্রতিটা মুহূর্ত কাটছে নাজিরাবাদের অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের পরিজনদের। ঘটনার পরে দু’দিন কেটে গেলেও তাঁদের কারও ছেলে, কারও স্বামী, কারও ভাইয়ের খোঁজ নেই। একসঙ্গে মানুষগুলো যেন উবে গিয়েছেন!

তাঁদের মৃত্যু হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না প্রশাসনও। অবশ্য পুড়ে কাঠকয়লার মতো হওয়া দেহ দেখে সেটি কার, তা বলা সম্ভবও নয়। মঙ্গলবার বিকেলে বারুইপুর পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন পর্যন্ত যত দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে তা অন্তত আট জনের। এ দিন বিকেলে দু’টি ব্যাগে ভরে তা পাঠানো হয়েছে কাঁটাপুকুর মর্গে। সেগুলি থেকে নমুনা নিয়ে রাজ্যের ফরেন্সিক ও সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে বলে খবর।

কিন্তু ওই দেহাংশ কার, কবে পরিজনেরা তা পাবেন? আদৌ কী মিলবে সঠিক পরিচয়? জ্ঞানেশ্বরী রেল দুর্ঘটনা এবং স্টিফেন কোর্টের অগ্নিকাণ্ডে ডিএনএ-প্রোফাইলিং করা ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘‘পুরো প্রক্রিয়াটি খুবই ঝক্কির। খুব সতর্কতার সঙ্গে পুরো কাজ শেষ করতে এক মাসও লাগতে পারে।’’

ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই ধরনের দুর্ঘটনায় পরিচয়হীন মৃতদেহের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য দেহ থেকে তিন রকম ভাবে নমুনা সংগ্রহ করা যায়। প্রথমত, ময়না তদন্তের সময়ই শরীরের গভীরে থাকা ‘রেড মাসল টিস্যু’ সংগ্রহ কিংবা শরীরের বড় কোনও হাড় (টিবিয়া বা জঙ্ঘাস্থি এবং ফিমার) থেকে অস্থিমজ্জা নেওয়া হয়। আর এই দু’টি না পাওয়া গেলে দাঁতের এনামেল (দাঁতের উপরের স্বচ্ছ ও প্রতিরক্ষামূলক স্তর) থেকে পাল্প নিয়ে পরিচয়হীন মৃতের ডিএনএ প্রোফাইলিং করা যায়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এর পরের ধাপে নিখোঁজ ব্যক্তির ডিএনএ-র খোঁজ পেতে, তাঁর ব্যবহৃত দাঁত মাজার ব্রাশ চাওয়া হয় আত্মীয়দের থেকে। কারণ, ব্রাশে মাড়ি এবং গালের ভিতরের কোষ উঠে লেগে থাকে, যা থেকে ডিএনএ প্রোফাইলিং করা সম্ভব।

কিন্তু সরাসরি ‘ম্যাচিং’-এর এই পদ্ধতি সম্ভব না হলে ‘ইন-ডিরেক্ট-ম্যাচিং’-র পথে হাঁটতে হয় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সে ক্ষেত্রে নিখোঁজের নিকটাত্মীয়ের রক্তের নমুনা নিয়ে ডিএনএ প্রোফাইলিং করতে হয়। এবং সেটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয় পরিচয়হীন দেহের ডিএনএ। তবে নাজিরাবাদের মতো দুর্ঘটনায় মৃতদেহ উদ্ধারের সময়ে এক দেহের রক্তরস বা টিস্যু অন্য দেহের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রভূত সম্ভবনা থাকে বলেও জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, এর ফলে ‘ডিএনএ কন্টামিশন’ হতে পারে, অর্থাৎ একটি দেহের ডিএনএ-র নমুনায় বাহ্যিক বা অবাঞ্ছিত ডিএনএ-র উপস্থিতি মিলতে পারে।

ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ সোমনাথ দাস জানাচ্ছেন, খুব সতর্ক ভাবে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হয়। প্রোফাইলিং করার সময়ে ক্রোমোজ়োমের মধ্যে থাকা ‘শর্ট ট্যান্ডেম রিপিট’গুলি যদি আলাদা রকমের হয়, তা হলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, ডিএনএ প্রোফাইলিং করা নমুনা ‘কন্টামিশন’ হয়েছে। তখন সেটি কাটিয়ে আবারও পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু কোনও ভাবেই ‘ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের’ নমুনা পাওয়া না গেলে কী করণীয়?

স্টিফেন কোর্টের ঘটনায় যুক্ত এক ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘‘সে ক্ষেত্রে সুপার ইম্পোজিশন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। পরিচয়হীন মৃতদেহের খুলির ছবি তুলে, সেটি নিখোঁজ ব্যক্তির জীবিত অবস্থার ছবির সঙ্গে ম্যাচিং করিয়ে শনাক্ত করা যায়।’’ এই সমস্ত ধাপ পেরিয়ে দেহ শনাক্ত করতে এক মাস কিংবা কমপক্ষে তিন সপ্তাহ সময় লাগে বলেওজানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক অতীতে আমদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় একসঙ্গে ২৭৪ জনের পুড়ে মৃত্যু হয়েছিল। ১০ দিন ধরে মৃতদেহ এবং দেহাংশ উদ্ধারের কাজ চলে। মৃতদেহ চিহ্নিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়। সেখানেও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিজনের ভিড় লেগেছিল। এক জনের মৃতদেহ অন্যের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছিল। নরেন্দ্রপুরের ঘটনায় এমন কিছু ঘটে কি না, সেই আশঙ্কাও থেকে গিয়েছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Kolkata fire Kolkata Fire Incident

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy