E-Paper

কাগুজে চুক্তিতে কি ন্যূনতম মর্যাদা পাবেন করুণারা

শ্রম দিবস (১ মে) অবধি তিনটি এমন চুক্তি সই করাতে পেরেছেন ‘সমাধান’-এর সদস্যেরা। টালিগঞ্জের গল্ফ ক্লাব এলাকার ৫৪ জন সদস্যের আরও অনেকে তাঁদের কাজের বাড়িতে চুক্তির কাগজ রেখে এসেছেন।

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৮:৩৮

— প্রতীকী চিত্র।

করুণা মণ্ডল আর অরুন্ধতী দাস একটি চুক্তি সই করেছেন। ‘নিয়োগকারী’ অরুন্ধতীর নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর লেখা এক দিকে, অন্য দিকে ‘গৃহশ্রমিক’ করুণার নাম-মোবাইল নম্বর। ‘গৃহশ্রমিকের কাজের বিবরণ ও সময়’, ‘মোট মাসিক বেতন’, ‘কখন থেকে কখন কাজ করবেন’ ইত্যাদি ছাড়াও রয়েছে দু’তরফের দায়িত্বের বিবরণ। কাজের জায়গায় পানীয় জল, শৌচাগার ব্যবহার, মাসে চারটি ছুটি, অতিরিক্ত কাজের জন্য আলাদা পারিশ্রমিক দিতে রাজি অরুন্ধতী। করুণাও রাজি নির্দিষ্ট সময়ে আসতে, কাজের গুণমান বজায় রাখতে, না জানিয়ে ছুটি না নেওয়ার অঙ্গীকারে।

শ্রম দিবস (১ মে) অবধি তিনটি এমন চুক্তি সই করাতে পেরেছেন ‘সমাধান’-এর সদস্যেরা। টালিগঞ্জের গল্ফ ক্লাব এলাকার ৫৪ জন সদস্যের আরও অনেকে তাঁদের কাজের বাড়িতে চুক্তির কাগজ রেখে এসেছেন। অনেক গৃহস্থ আগ্রহ নিয়ে নিজেরাই সই করেছেন। অরুন্ধতী যেমন বললেন, “গৃহশ্রমিক মেয়েরা যদি সংগঠন তৈরি করে উন্নতি করতে পারে, সে তো ভালই।” আবার অনেকে বলেছেন, “রেখে যাও, দেখছি।” কিছু বাড়িতে নিজেরাই কাগজ জমা দেননি গৃহশ্রমিকেরা —“ওরা সুবিধের নয়।”

কেন এই চুক্তি? ‘সমাধান’-এর অন্যতম নেত্রী কল্যাণী শীট বললেন, “হয়তো রান্না করার কথা বলে মাইনে ঠিক হয়, তার পরে ফ্রিজ পরিষ্কার, টেবিল পরিষ্কার, খেতে দেওয়া, সবই করতে বলে। কোন কাজের কত টাকা, ঠিক করে বলা হয় না। ছুটি নিলে কাজের বাড়ি থেকে বলে বদলির লোক দিতে। কিন্তু অনেক সময়ে তাকে ওরা টাকা দেয় না, আমাদেরই টাকা দিতে হয়। তা হলে তো আমরা ছুটি বলতে কিছুই পাচ্ছি না।”

গৃহস্থ সাধারণত গৃহশ্রমিককে পরিবারের ‘পরিপূরক’ হিসেবে দেখেন, পরিপূর্ণ শ্রমিক হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে যা ‘গৃহস্থালি’, গৃহশ্রমিকের কাছে তা-ই ‘কর্মক্ষেত্র’— এই বিভাজন মানেন না। অথচ, গৃহশ্রমের মজুরিতে সংসার চালাতে হয় অগুনতি মেয়েকে। ‘ই-শ্রম’ পোর্টালে ‘গৃহশ্রমিক’ বলে নথিভুক্ত এ রাজ্যের ৫২ লক্ষ গৃহশ্রমিকের প্রায় সকলেই মহিলা। বাস্তব সংখ্যাটা এর কয়েক গুণ বেশি। গৃহশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার, ট্রেড ইউনিয়ন ও অসরকারি সংগঠনগুলির কমিটি গঠন হয়েছিল (২০১৫), তার প্রস্তাব আজও কার্যকর হয়নি। নভেম্বর, ২০২২ সালে শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক তিন মাসের মধ্যে ন্যূনতম মজুরির তফসিলে গৃহশ্রমকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন, তা-ও হয়নি। তৃণমূল আমলে গৃহশ্রমিকদের একটিই সংগঠন ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ স্বীকৃতি পেয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি (২০১৮)। সম্প্রতি সেই রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেছে শ্রম দফতর। অন্য সংগঠনগুলির আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও দিল্লি, কেরল, তামিলনাড়ুর মতো অনেকগুলি রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন স্বীকৃতি পেয়েছে, ন্যায্য মজুরির আইনও হয়েছে।

এ বছরের গোড়ায় একটি জনস্বার্থ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি মন্তব্য করেছেন, গৃহশ্রমিকেরা ট্রেড ইউনিয়ন করলে গৃহস্থ ও গৃহশ্রমিকের ‘মানবিক সম্পর্ক’ ব্যাহত হতে পারে। ‘সমাধান’-এর চুক্তিপত্রটি পড়লে অবশ্য সম্পর্কের মানবিকতা নিয়ে সন্দেহ জাগে। গৃহশ্রমিকদের একটি শর্ত, “ফার্স্ট এড দিতে হবে।” কল্যাণী জানালেন, বঁটিতে হাত কাটলেও অনেক বাড়িতে ওষুধ মেলে না।

ন্যূনতম মজুরি বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের উপরে ছেড়ে দিয়েছে। আইনের জোরে ন্যায্য প্রাপ্যের আশা না দেখে, গৃহশ্রমিকদের সংগঠনগুলি নতুন উপায় খুঁজছে। স্বেচ্ছায় চুক্তিতে সই করানো তারই একটি। “দু’-তিন মাসের মাইনে বকেয়া রেখে ছাড়িয়ে দিলে যখন থানায় যাই, পুলিশ জানতে চায়, অমুক বাড়িতে কাজ করেছি, প্রমাণ কী?” বললেন পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতির স্বপ্না ত্রিপাঠী। “চুক্তিপত্রটা তাই একটি সুরক্ষা।” শ্রমিকের মর্যাদার সুরক্ষায় স্বাক্ষর চাইছেন মেয়েরা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Labour Day May Day Workers

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy