কয়েকদিন আগেই ঝাড়গ্রামে প্রশাসনিকসভায় আদিবাসী উন্নয়নে একগুচ্ছ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপি দাবি করল, আদিবাসীদের প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি এখনও। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা যা দাবি করেছিলেন, তার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র ধরে সমালোচনা করলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্ব।
মঙ্গলবার বেলপাহাড়ির শিলদায় যোগদান মেলার আয়োজন করেছিল বিজেপি। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা গেল প্রাক্তন আইপিএস তথা বিজেপি-র রাজ্য সহ-সভাপতি ভারতী ঘোষকে। নীলকমল মাঠের সভামঞ্চে কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে নোট নেন ভারতী। পরে পৌঁছন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা রাজ্যের পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ও সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি মুকুল রায়। সভায় আগতদের সাঁওতালি ভাষায় স্বাগত জানান ভারতী। তিনি বলেন, ‘‘জঙ্গলমহলের মানুষ দু’টাকা কিলোর চাল ভিক্ষে চান না। তাঁরা চাকরি চান, ভালভাবে বাঁচতে চান।’’ সাঁওতালি মাধ্যমে পড়াশোনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দাবির সমালোচনা করে ভারতীকে বলতে শোনা যায়, ‘‘মমতার প্রতিশ্রুতি মতো ৯০০ সাঁওতালি মাধ্যম স্কুল কোথায়? ১৮০০ স্থায়ী শিক্ষক কোথায়? প্যারাটিচার দিয়ে সাঁওতালি মাধ্যম স্কুল চালাচ্ছেন মাননীয়া।’’ লোধা-শবরদের রেশন হোক বা ট্রাইব্যাল অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝিবাবাদের প্রতিনিধিত্ব—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমালোচনায় সরব ছিলেন ভারতী।
দো-কানহো, তিলকা মাঝি, বিরসা মুন্ডা, সাঁওতালি মহাকবি সাধু রামচাঁদ মুর্মুর নামে ধ্বনি দিয়ে কৈলাসের দাবি, জঙ্গলমহলে আদিবাসীদের অধিকার কোথায়? আমরা সরকার এলে সব আদিবাসী জমির পাট্টা পাবেন। মুকুল বলেন, ‘‘বেকারদের মুখে হাসি ফোটাতে হলে, বাক স্বাধীনতা ও ভাল থাকার জন্য বিজেপিকে জেতান।’’
কিন্তু কারা যোগ দিলেন যোগদান মেলায়? এ দিন কৈলাস, ভারতীদের হাত থেকে পতাকা নিতে দেখা গিয়েছে, মাঝি পারগানা মহলের পালহান সরেন, কাঁকো অঞ্চলের তৃণমূল নেতা সত্যরঞ্জন মল্লিক, জামবনির প্রাক্তন তৃণমূল নেতা তথা চিল্কিগড় মন্দির উন্নয়ন কমিটির সহ সভাপতি সমীর ধল, চিল্কিগড় রাজ পরিবারের তরুণ সদস্য তেজেশ ধবলদেব এবং জামবনি ব্লকের কয়েকজন সংখ্যালঘু নেতাকে। প্রসঙ্গত, দিন কয়েক আগে প্রশাসনিক সভা থেকেই চিল্কিগড় মন্দির উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন মমতা। আবার গত ৩০ জুন হুল দিবসের সন্ধ্যায় বেলপাহাড়ির চাকাডোবায় আদিবাসীদের অধিকারীর দাবিতে সরব হয়েছিলেন পালহান।
পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনি বলেছিলেন, ‘‘মাওবাদী জনসাধারণের কমিটিকে এলাকা থেকে তাড়িয়েছি। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে তাড়াতেও সময় লাগবে না। আদিবাসীদের উপর অত্যাচার হলে অস্ত্র তৈরি করতে পারি, অস্ত্র চালাতেও পারি।’’ এ দিন শিলদা যাওয়ার পথে ঝাড়গ্রামের গুপ্তমণি মন্দিরে পুজো দেন কৈলাস বিজয়বর্গীয় ও মুকুল রায়। ৭ অক্টোবর প্রশাসনিকসভা থেকে শরবদের আরাধ্যদেবী গুপ্তমণির মন্দির চত্বরের পরিকাঠামো উন্নয়নে ১ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
জঙ্গলমহলে ছত্রধর মাহাতোকে মুখ করতে চাইছে তৃণমূল। ছত্রধর এখন শাসক দলের রাজ্য সম্পাদক। তাঁর নাম না করেই ভারতীকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘ইউএপি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত প্রাক্তন মাওবাদীকে জেল থেকে ছাড়িয়ে এনে তাঁকে দিয়ে মানুষকে ভয় দেখিয়ে ভোট কব্জা করতে চান মাননীয়া। ওই মাওবাদীকে দেখলে দরজা বন্ধ করে দেবেন।’’
পরিবর্তনের পর মমতার সরকারের স্লোগান ছিল-‘জঙ্গলমহল হাসছে’। সে সময় মাওবাদীদের আত্মসমর্পণ, পুনর্বাসন প্যাকেজ দেওয়ার কাজে সক্রিয় ভাবে জড়িয়েছিলেন তৎকালীন পুলিশকর্তা ভারতী। মমতাকে তিনি বলেছিলেন, ‘জঙ্গলমহলের মা’। সেই ভারতী এ দিন বলেন, ‘‘তৃণমূলের সরকার কন্যাশ্রী, পথশ্রীর মতো নানা খেতাব আনছে বাজারে। আমরা এই সরকারকে দুর্নীতিশ্রী, নির্লজ্জশ্রী খেতাব দেব।’’ অন্য রাজনৈতিক সভার মতো এ দিনের সভাতেও মানা হয়নি স্বাস্থ্যবিধি। ঝাড়গ্রামের পর কৈলাস, ভারতী, মুকুলরা গিয়েছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়িতে। সেখানে কৃষি আইনের সমর্থনে সভায় ভারতী পঞ্চায়েত সমিতি গঠন করতে না দেওয়া নিয়ে সরব হয়েছেন।