শাসকের স্লোগান, ‘খেলা হবে।’ খেলা হলও বটে!
সোমবার, পাঁশকুড়া বনমালি কলেজে শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজিত সরকারি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আসরে শাসক দলের নেতা ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের খোশামদের এক বিচিত্র ‘খেলা’ দেখলেন উপস্থিত দর্শকেরা।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ আয়োজিত ওই বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তৃণমূলের স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনিক কর্তা মিলিয়ে ৫২ জন অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল! যদিও তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তাঁদের মধ্যে এক জনও ক্রীড়াবিদ ছিলেন না! এই বিপুল সংখ্যক অতিথিকে বরণ করতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। যে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সকালে শুরু হওয়ার কথা, তার জন্য মাঠে দাগ কাটা-ই শুরু হল দুপুর ১টার পর! সকাল থেকে প্রবল ঠাণ্ডায়, খোলা মাঠে হা পিত্যেশ করে অপেক্ষায় থেকে কুঁকড়ে গেল ক্লান্ত-শ্রান্ত শিশু-কিশোরেরা। অভিযোগ, সকলের চোখের সামনে খেলার মাঠে আয়োজিত হল ‘রাজনীতির খেলা’।
মঞ্চে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা একের পর এক নেতা ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের আপ্যায়ন ও তোয়াজ চলছে, মঞ্চের নীচে পাতলা ফিনফিনে গেঞ্জি পরে মাঠে নামার অপেক্ষায় থাকা ছোট্ট প্রতিযোগীরা তখন ঠকঠক করে কাঁপছে। গোটা ঘটনায় ক্ষুব্ধ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।
প্রতিযোগীরা অনেকেই অভিভাবকদের সঙ্গে সোমবার সকাল ৮টার মধ্যে নাম নথিভুক্ত করার জন্য কলেজ মাঠে উপস্থিত হয়েছিল। এগরা, কাঁথি, হলদিয়া—বিভিন্ন জায়গা থেকে কার্যত কনকনে শীতে ভোররাতে উঠে রওনা দিতে হয়েছিল তাদের। কিন্তু এত কষ্ট করে সময় মতো পৌঁছেও লাভ হয়নি। সকাল ১০টা নাগাদ অনুষ্ঠান শুরু হলেও ‘ম্যারাথন’ অতিথি বরণের পর প্রতিযোগিতা শুরু হয় দুপুর ২টো নাগাদ। প্রতিযোগীদের অনেকেরই তখন প্রবল খিদে পেয়েছে। কিন্তু খেয়ে তো আর দৌড়নো যায় না। বাধ্য হয়ে খিদে চেপে রাখতে হয়েছে।
মাঠে ক্ষোভ আঁচ করে নিজের বক্তৃতায় ক্ষমা চেয়ে নেন জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মিতুন দে। বলেন, "অনেক অতিথি সময়মতো এসে উঠতে পারেন না, তাদের বাধ্যবাধকতা থাকায়। আমাদেরও আসতে দেরি হয়েছে। তবে কোনও কাজ এতটাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না যে, তার জন্য বাচ্চাদের আমরা অপেক্ষা করাতে পারি। তার জন্য ওদের কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।" কিন্তু পুলিশ সুপারের বক্তব্যের পরও অতিথি আপ্যায়ন পর্ব চলতে থাকে। এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক।
ময়নার পূর্ব দোবান্দি পাটনা এক নম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুবীর বেরা বলেন, ‘‘সকাল ৯ টা থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এসে বসে আছি। শুধু অতিথি আপ্যায়ন আর বক্তব্যই দেখে যাচ্ছি। বাচ্চাগুলো সামান্য টিফিন করেছে। দুপুর দেড়টা বেজে গিয়েছে। এত ঠাণ্ডা, তার উপর পেট খালি। শারীরিক, মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে ওদের উপর। এটা অব্যবস্থা।’’ একই বক্তব্য ছিল পাঁশকুড়ার কনকপুর বিসপাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কুশাঙ্কু সাঁতরা-সহ একাধিক শিক্ষকের।
এই অব্যবস্থা সম্পর্কে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা নির্ধারিত সময়েই শুরু করেছিলাম। অতিথিরা আসতে দেরি করায় সব মিলিয়ে খেলা শুরু হতে দেরি হয়েছে। তবে আমরা প্রতিযোগিতার আয়োজনে আমরা কোনও ত্রুটি রাখেনি। শুধু সময় মতো শুরু করা গেলে ভাল হত।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)