করোনা সংক্রমণে বদলাচ্ছে জীবন। ভয়ঙ্কর ভাইরাস প্রভাব ফেলছে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে। এই আবহে রাশ পড়েছে বাল্যবিবাহেও, পরিসংখ্যান অন্তত তেমনই বলছে।
খড়্গপুর মহকুমা তথা গোটা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পরিসংখ্যানেই রয়েছে এই ইঙ্গিত। দেখা যাচ্ছে, গত বছর মার্চ থেকে জুন যে হারে নাবালিকা বিয়ের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, এ বার করোনা-কালের সেই চার মাসে তা কমেছে। বিশেষ করে খড়্গপুর-১, নারায়ণগড়, ডেবরা, সবংয়ের মতো এলাকা যেখানে নাবালিকার বিয়ের প্রবণতা বেশি, সেখানেও এ বার কিশোরী বয়সে বিয়ে দেওয়ার সংখ্যা কম। ঘাটাল, চন্দ্রকোনা, দাসপুর এলাকাতেও কমেছে বাল্যবিবাহ। জেলায় গত বছর মার্চ থেকে জুন ৭২টি বাল্যবিবাহের ঘটনা সামনে এসেছিল। এ বার ওই একই সময়কালে ৪০টি বাল্যবিবাহ হয়েছে বলে খবর।
করোনার সঙ্কট, মানসিকতা বদল না প্রশাসনিক নজরদারি— ঠিক কী কারণে এই দৃশ্যবদল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সকলেই মানছেন, এর পিছনে করোনা পরিস্থিতির একটা ভূমিকা অবশ্যই রয়েছে। চাইল্ড লাইনের কো-অর্ডিনেটর বিশ্বনাথ সামন্ত বলছেন, “আমাদের তৎপরতা থাকলেও এ বার নাবালিকা বিয়ে কমে যাওয়ার পিছনে করোনা অন্যতম কারণ। এই সময়ে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনই মানুষের হাতে বিয়ে আয়োজনের টাকা নেই। ফলে পরিবার থেকে নাবালিকার বিয়ে নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে না। স্কুল, টিউশন বন্ধ থাকায় পালিয়ে গিয়ে বিয়ের প্রবণতাও কমেছে।’’
প্রশাসন সূত্রে জানা যাচ্ছে, দরিদ্র পরিবারে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার চল যেমন রয়েছে, তেমনই স্কুল বা টিউশনের সূত্রে কারও সঙ্গে আলাপ থেকেও পালিয়ে গিয়ে কাঁচা বয়সে বিয়ে করে বহু কিশোরী। রাজ্যে কন্যাশ্রী প্রকল্প চালুর পরে নাবালিকা বিয়ে রোধে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বহু ক্ষেত্রে পরিচিত বা এলাকার লোকের থেকে খবর পেয়ে প্রশাসন গিয়ে বিয়ে রুখছে। অনেক সময় রুখে দাঁড়াচ্ছে নাবালিকা নিজেই।
করোনা সংক্রমণের জেরে গোটা পরিস্থিতিটাই পাল্টে গিয়েছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলিকে এখন অর্থাভাব। ফলে, কিশোরী মেয়ের বিয়ে নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। লকডাউন ও আনলক-পর্বে গাঁ-গঞ্জেও প্রশাসনের লাগাতার নজর রয়েছে। তাই লুকিয়ে বিয়ে দেওয়া এখন কার্যত সম্ভব নয়। তা ছাড়া, স্কুল, টিউশন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান— সবই বন্ধ থাকায় আলাপ জমা বা বাড়ি পালিয়ে বিয়ের সুযোগও কমেছে। ট্রেন বন্ধ। বাস-সহ অন্য পরিবহণও পুরোদস্তুর স্বাভাবিক নয়। ফলে, চাইলেই পালিয়ে যাওয়াও কঠিন।
জেলার শিশু সুরক্ষা আধিকারিক সন্দীপ দাস বলেন, “নাবালিকা বিয়ে কমে যাওয়ার পিছনে কন্যাশ্রী প্রকল্পের প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না। প্রশাসনিক তৎপরতাও রয়েছে। তবে মানুষের মনে করোনা-ভীতি রয়েছে। এই সময়ে ছেলে-মেয়ের মেলামেশা কম হচ্ছে। বিয়ে দিতে গিয়ে জানাজানি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেও নাবালিকা বিয়ের প্রবণতা কমছে।”
দিন কয়েক আগে নারায়ণগড়ে ও শালবনিতে নাবালিকার বিয়ে আটকানো হয়েছে। সবংয়ের বিডিও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপলব্ধি, “করোনা আবহে বিয়ে তো হচ্ছে। কিন্তু নাবালিকা বিয়ে কমছে। এর পিছনে প্রশাসনিক তৎপরতাই আসল কারণ।”
তবে এর মধ্যেও যে কটা বাল্যবিবাহ হয়েছে, তাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে না প্রশাসন। জেলা শিশু সুরক্ষা সমিতির এক সদস্য বলেন, ‘‘আমরা নিরন্তর সচেতনতা প্রচার চালানোর চেষ্টা করি। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্কুলে প্রচার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে খবর পেলেই নাবালিকা বিয়ে আটকানোর চেষ্টা হচ্ছে।’’
উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল সম্পর্কিত যাবতীয় আপডেট পেতে রেজিস্টার করুন এখানে