E-Paper

ধূলিসাৎ আয়ের উৎস, ভিটে হারিয়েও বিপন্ন অনেকে

পাঁশকুড়া স্টেশন সংলগ্ন রাস্তার পাশের একাধিক দোকানে নোটিস পড়েছে। উড়ালপুল এবং চতুর্থ লাইন সম্প্রসারণের জন্য রেল প্রয়োজনীয় জমি দখলে নিতে চায়।

সৌম্য প্রামাণিক

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৬:৫৮
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

জাতীয় সড়ক থেকে রেলের জমিতে মাথা তুলেছিল দোকান। সেখানে মানুষের নানা চাহিদা পূরণ যেমন হত, তেমনই রাতে ফাঁকা বাসস্ট্যান্ড, স্টেশনের যাত্রীদের নিরাপত্তার জায়গাও তৈরি হয়েছিল। তবে হকারেরা দোকানের স্থায়ী কাঠামো করে ফেলায় চুরি গিয়েছিল ফুটপাত। পালা বদলের পরে সরকারি জমি দখল করে ব্যবসা চালানো সেই সব নির্মাণই বুলডোজ়ারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্যতিক্রম নয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরও। রাতারাতি জীবিকা থেকে উৎখাত হওয়া মানুষগুলি পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি তুলছেন।

পাঁশকুড়া স্টেশন সংলগ্ন রাস্তার পাশের একাধিক দোকানে নোটিস পড়েছে। উড়ালপুল এবং চতুর্থ লাইন সম্প্রসারণের জন্য রেল প্রয়োজনীয় জমি দখলে নিতে চায়। নোটিস পেয়ে দোকানিরা কেউ ছুটেছেন লিজ়ে পাওয়া জমির বকেয়া টাকা জমা দিয়ে জায়গা নিজেদের দখলে রাখতে, আবার কেউ উচ্ছেদের আতঙ্কে প্রহর গুনছেন। ১৬ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে শতাধিক দোকান ইতিমধ্যে ভাঙা হয়েছে। পাঁশকুড়ার রাতুলিয়া, সিদ্ধা, বড়দাবাড়, জিঞাদা-সহ একাধিক জায়গার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন দোকানপাট ভাঙা পড়েছে। জাতীয় সড়কের ধারের হকার উচ্ছেদ ২০০১ সাল নাগাদও হয়েছিল। তখন জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ হওয়ায় উচ্ছেদ নিয়ে বিশেষ প্রতিবাদ হয়নি। কিন্তু এ বার অভিযোগ, বিনা কারণে সব দোকানে বুলডোজ়ার চালানো হয়।

এখানে কেউ ৫০ বছর, কেউ বা তারও বেশি সময় ধরে ব্যবসা করে আসছেন। অনেকেই ব্যাঙ্কে ঋণ নিয়ে বা স্বল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করছিলেন। দোকান ভেঙে দেওয়ায় ঋণ শোধ করা নিয়ে তাঁরা এখন দিশাহারা। রেলের এলাকা থেকে জাতীয় সড়ক, যেখানে যেখানে উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে বা হতে চলেছে, সর্বত্রই পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবিতে সিপিএম এবং হকার সংগঠনের তরফে চলছে লাগাতার বিক্ষোভ ও আন্দোলন। মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যে গোটা রাজ্যের প্রেক্ষিতেই জানিয়েছেন যে, পুনর্বাসনের দাবি সরকার মানবিক ভাবে দেখবে। তবে আগে বেআইনি দখলদার উচ্ছেদ করা হবে। ফলে, সমস্যার সমধানা নিয়ে দোটানায় রুটিরুজি হারানো বহু মানুষই।

পাঁশকুড়ার মেচগ্রামের রিতা গায়েন ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছোট খাবারের দোকান চালাতেন। নোটিস পেয়ে দোকানের কাঠামো খুলে নিয়েছেন। ওই জায়গাতেই এখনও ত্রিপল টাঙিয়ে দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। রিতা বলেন, ‘‘জায়গা দিলে কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু বিকল্প কিছু করে না দিলে, আমরা কোথায় যাব? এটা কবে বুঝবে সরকার?’’ একই বক্তব্য নারায়ণ পালের। ঋণ নিয়ে চা দোকান করেছেন তিনি। দোকান ভেঙে দেওয়ার পরে কী ভাবে সংসার চালাবেন বা ঋণ পরিশোধ করবেন, তা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না।

হলদিয়া-মেচেদা রাজ্য সড়কে চৈতন্যপুর বাজারের রাস্তার দু’ধারেও শতাধিক দোকান ভাঙা পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিদের অনেকেই রিকশায় গ্রামে ঘুরে আনাজ ও মাছ বিক্রি শুরু করেছেন। হলদিয়ার সিটি সেন্টার সংলগ্ন ১১৬ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে বহু ঝুপড়ি ও বসতি উচ্ছেদ হয়েছে। সেখানকার বাসিন্দা জোবেদা বিবির কথায়, ‘‘মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নেই। আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। ভবিষ্যতে কী হবে জানি না।’’ উচ্ছেদ হওয়া এক বস্তিবাসীর আক্ষেপ, ‘‘বর্ষার মুখে কোথায় যাব?’’ পশ্চিমবঙ্গ বস্তিবাসী উন্নয়ন সমিতির তরফে শুভশ্রী সামন্ত ও আলি হোসেন জানালেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তাঁরা হলদিয়ার মহকুমাশাসককে স্মারকলিপি দিয়ে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।

উচ্ছেদের জেরে রাস্তাঘাট ফাঁকা হওয়া অনেকে আবার খুশি। নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের প্রবেশপথে অবৈধ ভাবে গড়ে ওঠা দোকান সরিয়ে দেওয়ায় যাতায়াত অনেকটাই বাধামুক্ত হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্স ও রোগীদের ঢোকা-বেরনোয় সুবিধা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের একাংশের মত। কাঁথি শহরে এখনও উচ্ছেদ অভিযান শুরু না হলেও প্রশাসন রাস্তার ধারের ব্যবসায়ীদের নোটিস দিয়েছে। খড়গপুর বাইপাসগামী রাস্তার ধারে এক হোটেল মালিক জানালেন, দোকানের বাইরে ত্রিপলের ছাউনিতে রান্নার ব্যবস্থা তুলে নিতে হয়েছে। এতে ব্যবসা চালাতে সমস্যা হচ্ছে। (চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

midnapore

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy