জমি রক্ষার আঁতুড় চায় শান্তি, উন্নয়ন আবারও নন্দীগ্রামে সিবিআই। প্রায় দেড় দশক বাদে। আবারও রাজনৈতিক চাপানউতোর
২০০৭ সালে হাই কোর্টের নির্দেশেই জমি আন্দোলন-পর্বে পুলিশের গুলি চালনার ঘটনায় তদন্তে এসেছিল সিবিআই। এখনও সেই হাই কোর্টের নির্দেশেই ফের তদন্তে এসেছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। তবে প্রেক্ষিত একেবারে ভিন্ন। এখন তদন্ত চলছে ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগের।
আগেরবার সিবিআই তদন্তের বিরোধিতার সুর শোনা গিয়েছিল জমি আন্দোলনের আঁতুড়ঘরে। তারপর খেজুরি আর নন্দীগ্রামের সীমানায় ভাঙাবেড়া সেতুর নীচে তালপাটি খাল দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। রাজ্য রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এ বার বিধানসভা ভোটে পদ্ম ফুটেছে নন্দীগ্রামের মাটিতে। পরাজিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরই সিবিআই তদন্ত ঘিরে সরগরম নন্দীগ্রাম।
বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পরে গত ৩ মে নন্দীগ্রামের চিল্লগ্রামে আক্রান্ত হন দেবব্রত মাইতি নামে এক বিজেপি কর্মী। ১৩ মে কলকাতায় বেসরকারি হাসপাতলে তিনি মারা যান। তাঁকে তৃণমূল কর্মীরা খুন করেছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনার তদন্তেই এখন বারবার নন্দীগ্রামে আসছে সিবিআই। বিজেপির তমলুক সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি প্রলয় পাল বলেন, ‘‘রাজ্য জুড়ে ভোট-পরবর্তী হিংসা ছড়িয়েছে। সব জায়গায় তৃণমূলের হাতে আমাদের কর্মী-সমর্থকরা আক্রান্ত। স্বয়ং রাজ্যপাল নন্দীগ্রাম ঘুরে কেঁদে ফেলেছিলেন। এখন যে ভাবে আদালতের নির্দেশের সিবিআই তদন্ত করছে তাতে সুবিচার মিলবে বলে আমরা আশাবাদী।’’ জেলা তৃণমূল সভাপতি দেবপ্রসাদ মণ্ডল পাল্টা বলছেন, ‘‘অতীতের থেকে এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। কেউ হৃ্দ্রোগে মারা গিয়েছেন। তারও তদন্তে সিবিআইকে নন্দীগ্রামে আসতে হচ্ছে।’’
নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলন পর্বে শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন তৃণমূলের অন্যতম মুখ। তিনিই এখন দল বদলে নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূল এবং বিজেপিকে এক পংক্তিতে রেখে বিঁধছে সিপিএম। সিপিএমের পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক নিরঞ্জন সিহি বলেন, ‘‘সেই সময় শুভেন্দু তাঁর দলকে দিয়ে সিবিআই তদন্ত করেছিলেন। বেছে বেছে আমাদের দলের লোকেদেরকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।’’
২০০৭ সালে পুলিশের গুলি চালনার ঘটনায় ইতিমধ্যে হাই কোর্টে চার্জশিট জমা দিয়েছে সিবিআই। পুলিশ বাধ্য হয়ে সে দিন গুলি চালিয়েছিল বলে চার্জশিটে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। এ বার বিজেপি কর্মী খুনের তদন্ত কোন দিকে মোড় নেবে তা বলবে ভবিষ্য়ৎ। তবে সিবিআই নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর এক পাশে সরিয়ে নন্দীগ্রাম অবশ্য এখনও উন্নয়নের অপেক্ষায়।
২০০৭ সালে প্রস্তাবিত কেমিক্যাল হাব বন্ধ হওয়ার পরে আর সে ভাবে শিল্পের মুখ দেখেনি এই মাটি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন বাজকুল থেকে নন্দীগ্রাম পর্যন্ত রেললাইন তৈরির কথা ঘোষণা করেছিলেন। স্টেশন তৈরি। কিন্তু রেললাইন পাতার কাজ মাঝপথে থমকে। নন্দীগ্রামে জেলিংহাম প্রকল্পও এতটুকু এগোয়নি। কৃষক আন্দোলনকে সম্মান জানাতে শুধুমাত্র গড়ে উঠেছে বড় মাপের কিষাণ মান্ডি। তবে যে জায়গায় মান্ডি হয়েছে, সেখানে স্থানীয় কৃষকেরা যেতে চান না।
দ্বিতীয় বার রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরে নন্দীগ্রামে বাড়ি বাড়ি পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্প গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার। সেই প্রকল্পের কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। গেড় দশক ধরে রাজ্য রাজনীতির চর্চার কেন্দ্রে থাকা নন্দীগ্রামের মানুষের মনে চাই চোরা ক্ষোভ দানা বাঁধে। নন্দীগ্রামের বিরুলিয়া বাজার সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা এক শিক্ষক বলছিলেন, ‘‘বরাবর নন্দীগ্রামকে ভর করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। কিন্তপ আমরা শুধু রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হতে চাই না। আমরা চাই এখানে আরও উন্নয়ন। আর শান্তি।’’ নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের টেঙ্গুয়া বাজারের এক টোটো চালকও বলছেন, ‘‘রাজনৈতিক হানাহানি নয়। বরং নন্দীগ্রামে সব রাস্তা পাকা হোক। পানীয় জল আর বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক হোক।’’