ভোটের আবহ। এর মধ্যে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পে চোখে পড়ার মতো কাজ হবে তো! কাজের অগ্রগতি নিয়ে বৈঠকে আধিকারিকদের উপর কার্যত খড়্গহস্ত হয়েছেন মন্ত্রী। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে না তো ভোটব্যাঙ্কে! এমনই নানা জল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে শাসক দলের অন্দরে।
নদী-খালের ড্রেজিং (পলি তোলা) শুরু হলেও তার গতি নেই। তৈরি হয়েছে জটিলতাও। তা ছাড়া একাধিক প্রস্তাবিত ডিপিআর অনুমোদনের জন্য জমা পড়লেও কাজ শুরুর সবুজ সঙ্কেত আসেনি। মঞ্জুর হয়নি অর্থ। তার জেরে থমকে প্রথম দফার প্রস্তাবিত যাবতীয় কাজ। গত বাজেটে টাকা বরাদ্দের (৫০০ কোটি) পরেও প্রকল্পের কাজ শুরুতেও এমন টালবাহানায় বিস্মিত ঘাটালবাসী। এই পরিস্থিতিতে সোমবার ঘাটাল টাউন হলে কাজের গতি বাড়ানোর বৈঠকে অতিরিক্ত জেলা শাসক স্তর থেকে পদস্থ বাস্তুকারদের সটান দাঁড় করিয়ে মন্ত্রীর তারস্বরে ভৎর্সনায় ভোটের আগে আদৌও কাজের গতি বাড়বে কি না, তা নিয়ে চর্চা চলছে প্রশাসনের অন্দরেই। মন্ত্রীর ধমক-চমক নিয়েও শাসক প্রভাবিত কর্মী সংগঠন গুলির মধ্যেও শোরগোল পড়েছে। ঘাটালবাসী অবশ্য কাজের গতি বাড়ায় অপেক্ষায়।
এমনিতেই নভেম্বর মাস থেকেই শিলাবতী-সহ ১৪টি নদী ও খাল থেকে পলি তোলার কাজ শুরু হয়েছে। তার পর থেকেই নানা জটিলতা সামনে এসেছে। পাড় দখল করে চাষ থেকে বালি-মাটি বোঝাই ডাম্পার-ট্রাক্টরে রাস্তা খারাপের অভিযোগে রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুরু হয়েছে। ভোটের আগে তার সুষ্ঠু সমাধানে হাত তুলেছে প্রশাসনের একাংশ। ‘নো কস্ট’ পদ্ধতিতে পলি তোলা হওয়ায় প্রশাসনের সঙ্গে ঠিকাদার সংস্থা গুলির নিবিড় যোগাযোগ নেই। এই পরিস্থিতিতে ভোটের আগের শেষ পর্যালোচনা বৈঠকে পলি তোলার গতি বাড়াতে একাধিক নির্দেশ দিয়েছেন সেচমন্ত্রী মানস ভুঁইয়া। সেই মতো মঙ্গলবারই অবশ্য প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। মূলত পলি তোলার কাজ কেমন চলছে তা পর্যালোচনা হবে। এ ছাড়াও অন্য কাজেরও গতি বাড়াতে একাধিক কমিটি গড়ার প্রস্তুতি চলছে।
ভোটের আগে গুচ্ছ কাজ সামলে কমিটি (প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের আধিকারিক, পুলিশ নিয়ে গঠিত) কতটা নজরদারি করবে, তা নিয়েও প্রশাসনের একাংশ সংশয়ে রয়েছে বলে খবর। কারণ, পলি তোলা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা-সমস্যা গুলির নিষ্পত্তি নিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা জরুরি। কিন্তু তার রূপরেখা তৈরি না করেই তড়িঘড়ি পলি তোলার কাজ শুরু হয়ে যাওয়ায় সমস্যা কমছে তো না। বরং বাড়ছে। এদিকে ভোট এগিয়ে আসছে। হাতে আর সময়ও নেই। তারসঙ্গে বাজেটে টাকা বরাদ্দের পরেও পাম্প হাউসের জন্য জমি কেনার কাজ, শিলাবতীর পশ্চিম পাড়ে দীর্ঘ ডোয়ার্ফ বাঁধ, ৩১টি স্লুস গেট নির্মাণ-সহ একাধিক প্রস্তাবিত কাজও থমকে। ভোটের আগে এই সব কাজ শুরু হবে কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই বলে খবর। প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘কাজটি দীর্ঘমেয়াদি। এত অল্প সময়ে চটজলদি বড় কিছু কাজ দেখানোর পরিস্থিতি নেই।’’
ঘাটালবাসীর বক্তব্য প্রকল্পটি নিয়ে হইচই হয়েছে যথেষ্ট। ভোটের আগে চোখে দেখার মতো কাজের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। তার পরেও হাল এমন কেন। প্রশ্ন উঠছে, জটিলতা হবে জেনেও এত বড় প্রকল্প সুষ্ঠ পরিকল্পনাই ছাড়াই শুরু হল কী করে। তা ছাড়া প্রস্তাবিত কাজ গুলির অর্থ মঞ্জুর হয়েছে কি না, তার খোঁজই বা মন্ত্রীর কাছে আগে থেকে কেন থাকবে না। প্রসঙ্গত, প্রকল্প ঘিরে সংশ্লিষ্ট খামতিগুলি মন্ত্রীর নজরে এসেছে সোমবারের বৈঠকেই। তাতেই হতবাক অনেকেই। তবে সোমবার বৈঠকের পরই অর্থ মঞ্জুরের জন্য তদ্বির করার আশ্বাস দিয়েছেন সেচমন্ত্রী মানস।
সোমবারের বৈঠকের পর শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপি বিধায়ক শীতল কপাট এবং সিপিএম নেতা অশোক সাঁতরার বক্তব্য, ‘‘বাজেটে বরাদ্দ হওয়া টাকা কোথায় গেল। মন্ত্রী শুধু আধিকারিকদের উপর চোটপাট করছেন।’’ শাসক দলের জেলা কোর কমিটির এক নেতারও প্রশ্ন, ‘‘বাজেটে টাকা বরাদ্দ হওয়ার পরে অর্থ বরাদ্দে এত ঢিলেমি কেন।’’
তবে যাবতীয় জটিলতা কাটিয়ে ভোটের আগে কাজের গতি কতটা ফেরে সেদিকেই তাকিয়ে ঘাটালবাসী।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)