Advertisement
E-Paper

রোজ চোখের সামনে থাকবেন বিবেকানন্দ

রবীন্দ্রনাথের পরে এ বার বিবেকানন্দ। বছর পাঁচেক আগের কথা। ২০১০ সালে তখন অশান্তির আগুনে জ্বলছে লালগড়। মাওবাদীদের সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ জঙ্গলমহল। প্রায় রোজই রাতবিরেতে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরের দিন রাস্তায় পড়ে থাকছে তার দেহ। পাশে মাওবাদীদের পোস্টার। এমনকী, বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়েছে বন দফতরের একটি কার্যালয়ও। প্রাথমিক স্কুলের এক শিক্ষককে বিদ্যালয়ে ঢুকে শিশু পড়ুয়াদের সামনে গুলি করে খুন করা হয়।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৫ ১৬:৩৬
আগামী ১২ জানুয়ারি স্বামীজির এই মূর্তিটি ব্লক অফিস লাগোয়া রাস্তার ধারে বসবে।—নিজস্ব চিত্র।

আগামী ১২ জানুয়ারি স্বামীজির এই মূর্তিটি ব্লক অফিস লাগোয়া রাস্তার ধারে বসবে।—নিজস্ব চিত্র।

রবীন্দ্রনাথের পরে এ বার বিবেকানন্দ।

বছর পাঁচেক আগের কথা। ২০১০ সালে তখন অশান্তির আগুনে জ্বলছে লালগড়। মাওবাদীদের সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ জঙ্গলমহল। প্রায় রোজই রাতবিরেতে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরের দিন রাস্তায় পড়ে থাকছে তার দেহ। পাশে মাওবাদীদের পোস্টার। এমনকী, বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়েছে বন দফতরের একটি কার্যালয়ও। প্রাথমিক স্কুলের এক শিক্ষককে বিদ্যালয়ে ঢুকে শিশু পড়ুয়াদের সামনে গুলি করে খুন করা হয়।

সে সময়েই ২৫শে বৈশাখে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল স্থানীয় সুস্বন সাহিত্য পত্রিকা। সেখানে ছিল প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও। অনুষ্ঠানে ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি’ থেকে শুরু করে ‘সমুখে শান্তিপারাবার’ গাওয়া হয়েছিল। গানের কথা, সুর মনে থেকে যায় খুদে শ্রোতাদের। তাদেরই একজন পরে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আচ্ছা স্যর আমাদের এলাকায় রবি ঠাকুরের মূর্তি নেই কেন?’

এই প্রশ্নের কোনও যুতসই জবাব খুঁজে পাননি পেশায় গৃহশিক্ষক পঙ্কজকুমার মণ্ডল। ওই সাহিত্য পত্রিকারও তিনি প্রধান সম্পাদক। পঙ্কজবাবু এবং তাঁর সাহিত্যবন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা মিলে তখন ঠিক করেন, নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে রবীন্দ্রনাথের মূর্তি বসাবেন। নিজেদের দৈনন্দিন খরচ-খরচা থেকে টাকা বাঁচিয়ে শুরু হল তহবিল গঠনের কাজ। সরকারি জায়গা পাওয়া সমস্যা ছিল। এগিয়ে এলেন স্থানীয় একটি ক্লাবের কর্তৃপক্ষ। ওই ক্লাবের দেওয়া জায়গায় বছর দু’য়েক আগে বাইশে শ্রাবণের বর্ষণঘন দিনে লালগড়ের মহাদেব চকের কাছে বসল রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি। লালগড়ে সেই প্রথম কোনও মনীষীর মূর্তি বসে।

এ বার লালগড়ে বসছে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি। সিমেন্টের তৈরি আবক্ষ মূর্তি তৈরি হয়ে গিয়েছে। আগামী ১২ জানুয়ারি বিবেকানন্দের জন্মদিনে মূর্তিটির আবরণ উন্মোচিত হবে। এ বারও কোনও জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনিক কর্তা নন। সুস্বন গোষ্ঠীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক সংগঠন।

রাজ্যে ক্ষমতার পালা বদলের পরে লালগড় ব্লক সদরের চিত্র অনেকটাই বদলে গিয়েছে। জনবহুল হচ্ছে এলাকা। রাস্তাঘাট ও পানীয় জল পরিষেবার উন্নতি হয়েছে। স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ভবন সম্প্রসারিত হয়েছে। ঝাড়গ্রামের সঙ্গে সংযোগকারী কংক্রিটের সেতু তৈরির কাজ শেষের মুখে। তৈরি হচ্ছে নার্সিং ট্রেনিং কলেজের পেল্লায় ভবন। বেড়েছে হাটবাজারের পরিধি। কিন্তু ভয় কি একেবারে সবটাই কেটেছে?

পঙ্কজবাবুর বক্তব্য, ‘‘ওই সবটুকু ভয় কাটানোর জন্যই মনীষীদের মূর্তি বসাতে চাইছি আমরা। রোজ রোজ চোখের সামনে খুন দেখে যাঁরা আতঙ্কিত দিন কাটিয়েছেন, তাঁরাই রোজ চোখের সামনে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দকে দেখলে মনে ভরসা পাবেন। আশা পাবেন। সাহস পাবেন। প্রতিদিন যাতায়াতের পথে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দকে একবার করে অন্তত চোখে দেখার ফল ফলবেই।’’

কিন্তু কেন বিবেকানন্দ? পঙ্কজবাবুদের কথায়, এক সময় এই এলাকার যুবকদের ভুল বুঝিয়ে মাওবাদীরা তাদের দলে টেনেছিল। তাদের মধ্যে অনেকে পরে মারাও যায়। সেই যুবসমাজের কাছে বিবেকানন্দের প্রভাব অনেক। নানা ভাবে তাঁর কথা পড়া যায়। তাঁর লেখা বইও সহজলভ্য। তিনি বলেন, ‘‘বিবেকানন্দ বরাবরই যুবকদের কাছে প্রেরণার উৎস। তাই তাঁকেই আমরা সামনে রেখেছি।’’

এবার সুস্বনের এই কর্মকাণ্ডে আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষাব্রতী সুভাষ মন্ডল, পরিবহণ ব্যবসায়ী নরেশ পাত্র, ব্যবসায়ী দিলীপ অধিকারীরা। স্বামীজির ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ সংগঠন—‘বিবেক সেবা সমিতি’র তত্ত্বাবধানে মূর্তি তৈরি করেছেন পূর্ব মেদিনীপুরের এক শিল্পী। লালগড় ব্লক অফিসের কাছে রাস্তার ধারে স্থানীয় আর একটি ক্লাবের দেওয়া জমিতে বিবেকানন্দের আবক্ষ মূর্তিটি বসবে।

লালগড় পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কৃষ্ণগোপাল রায় বলেন, “এ ভাবে বিভিন্ন সংগঠন এগিয়ে এলে আমরা সব সময়ই স্বাগত জানাব।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy