গতির যুগ। গতিকে অস্বীকারের উপায়ও নেই। কিন্তু এ কেমন গতি? যা ধরতে গিয়েও ধরা যায় না। হাত ফস্কে নিমেষের মধ্যে বেরিয়ে যায়।
এমনটাই ঘটছে মেদিনীপুর শহরে বহুতল নির্মাণের ক্ষেত্রে। যে বহুতল নির্মাণ-কাজ শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে। বয়স মাত্র ১৪ বছর। কৈশোরেই তার এত পরিবর্তন ঘটতে পারে তা কে জানত? ২০০০ সালে যে জমির কাঠা প্রতি দাম ছিল ৭০-৮০ হাজার টাকা। এখন বেড়ে হয়েছে ১৪ থেকে সাড়ে ১৪ লক্ষ টাকা! সৌজন্যে বহুতল।
অথচ, শহরে প্রচুর বহুতল ইতিমধ্যেই নির্মিত হয়েছে এমন নয়। এই ক’বছরে বড় জোর ৭০টি বহুতল হয়েছে। এর বেশিরভাগই পাঁচতলা। কারণ, মেদিনীপুর পুরসভা বহুতলের ক্ষেত্রে পাঁচতলার বেশি অনুমতি দিত না। বছর দু’য়েক হল ৮ তলার অনুমতি দেওয়া শুরু হয়েছে। তা সত্ত্বেও জমির দাম হু হু করে বাড়ল কেন? সবার উত্তরই এক। প্রোমোটারদের দাপাদাপিতেই এমনটা হয়েছে। দোসর হয়েছে দালাল চক্র। যাঁরা জমি বা পুরনো বাড়ি বিক্রির কথা ‘বাতাসের মুখে’ শুনলেও কেনার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে দেন। বাড়ি বিক্রির গুজবেও বাড়ি মালিককে পাগল করে ছাড়েন। সবিনয়ে জানান, “আপনি নাকি বাড়িটা বিক্রি করবেন।” বাড়ির মালিক ‘না’ উত্তর দিতে দিতে জেরবার। তবু দালালদের যাতায়াত বন্ধ হয় না। এই চক্রে কে নেই। শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী থেকে চা-সব্জি বিক্রেতা-সকলেই। মালিকের ‘না’ উত্তরেও নাছোড়। ধারনা, দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে মালিক এমনটা বলছেন। দালালেরা সেই অনুমানের ভিত্তিতে দাম বাড়ান। এ ভাবেই বেড়ে চলে জমির দাম।
বহুতল সংস্কৃতি কোনও দিন গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খায় না। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ‘নিজের বাড়ি’ এটাই বড় কথা। তা যত ছোটই হোক না কেন। ফলে প্রথমের দিকে বহুতলের সংস্কৃতি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ফলে সেই সময় যে যার সাধ্য মতো দেড় দু’কাঠা জমি কিনে তার উপর বাড়ি করতেন। ধর্মা, কুইকোটা, শরত্পল্লি এলাকার দিকে যাঁদের জমি ছিল, তাঁরা ক্রেতার সন্ধান পেলেই কত সাধ্য সাধনা করতেন জমিটা বিক্রির জন্য। ক্রেতারা গিয়ে নাক সিঁটকে চলে আসতেন এই বলে, “এখানে কেউ থাকে নাকি!” এখন ধর্মা এলাকায় রাস্তার ধারে কোনও জমি মিলবে না। ভেতরের দিকে জমি, রাস্তা আছে কি না জানা নেই, আগুন লাগলে দমকল ঢুকবে না, অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্স যাবে না, পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, বিদ্যুত্ সংযোগ পেতে হিমশিম খেতে হবে, তেমন জমির দামও কাঠা প্রতি ৩-৪ লক্ষ টাকা! নব্বইয়ের দশকে যা কিনা কাঠা প্রতি ৫ হাজার টাকা ছিল! এ-ও সেই সৌজন্যে বহুতল।
২০০০ সালে প্রথম যখন শহরে বহুতল তৈরি হয় তখন প্রতি বগর্ফুট বিক্রি হয়েছিল ৮০০ টাকার কাছাকাছি। ২০০৪ সাল পর্যন্ত হাতে গোনা চারটি বহুতল হয়। প্রোমোটার ছিলেন জনা তিনেক। তারপরই চিত্রটা বদলাতে থাকে। প্রোমোটারি শুরু করেন শহরের বহু ব্যবসায়ী। শহরজুড়েই বহুতল নির্মাণে জোয়ার আসে। ২০০৫-০৬ সালে দাম বেড়ে বর্গফুট প্রতি দেড় হাজার হয়ে যায়। ২০১০-১১ সালে তা বেড়ে হয় ২৭০০ টাকা থেকে ৩ হাজার! বর্তমানে অবশ্য কিছুটা কমেছে। ২৩০০-২৪০০ টাকা বর্গফুটেই বিক্রি হচ্ছে ফ্ল্যাটবাড়ি। কোথাও আবার তার থেকে কম। কেন?
এর অন্যতম কারণ হল, গত দু’তিন বছরে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় নিয়োগ কিছুটা কমেছে। আবার যা কিছু নিয়োগ হয়েছে তাঁদের বেশিরভাগ শিক্ষকই স্কুল সংলগ্ন এলাকায় থেকে যাচ্ছেন। এখন আর শহরে থেকে যাতায়াত করার প্রবণতা ততটা দেখা যাচ্ছে না। এটা তারই জের বলে মনে করছেন প্রোমোটাররা। তাই এখন রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের পরিবর্তে বিজনেস কমপ্লেক্সের উপরে জোর দিচ্ছেন প্রোমোটাররা। বহুতল বানিয়ে ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন কোনও বড় সংস্থাকে। সেখানে গড়ে উঠছে বাজার। এক ছাদের তলায় রকমারি পোশাক, জুতো থেকে নানা সামগ্রী মিলছে। মানুষও যাচ্ছেন সেখানে।
এক বহুতল নির্মাণ সংস্থার কর্ণধার সুতনু চক্রবর্তীর কথায়, “বিভিন্ন বড় বড় সংস্থার নজর এখন মেদিনীপুর শহরে। এই শহরেই তাঁরা বিভিন্ন বাজার তৈরি করতে চাইছেন। তা করতে হলেও তো জমির দরকার। এই কারণেই বাড়ছে জমির দাম।” জমি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত অপু সামাদ্দার মনে করেন, “মানুষ বাড়ছে। জমি তো বাড়ছে না। তাই জমির দাম বাড়ছে।”
প্রশ্ন হল, বহুতল তো বাড়ছে। কিন্তু পানীয় জল, রাস্তা-সহ আর পাঁচটা পরিকাঠামোগত সুবিধা কী বেড়েছে? এক কথায় বলা যায় নেই। কেন? একটি উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট। মেদিনীপুর শহরে দিনে ২৪.৫০ মিলিয়ন লিটার পানীয় জলের প্রয়োজন হয়। পুরসভার পরিকাঠামোয় দিনে ১৮.২ মিলিয়ন লিটারের বেশি জল সরবরাহ করা যায় না। আগে ৫ কাঠা জমির উপরে একটি পরিবার বাড়ি করে ছিলেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বড় জোর ৫-৬ জন। সেখানে বহুতল হওয়ায় নূন্যতম ২৫-৩০টি পরিবার থাকেন। অর্থাত্, হু হু করে লোক বেড়ে গেল। কিন্তু তাঁরা পানীয় জল কোথা থেকে পাবেন, তার দিশা নেই। একই সমস্যা জজ্ঞাল সাফাই নিয়েও। একটি পরিবার থেকে যেখানে দিনে বড় জোর এক ঝুড়ি আবর্জনা বেরোতো, সেখানে একটি বহুতল থেকে প্রায় এক ট্রাক আবর্জনা বেরোবে। তা পরিষ্কারেরও পরিকাঠামো নেই।
আরও একটি বড় সমস্যা হল নিকাশি। শহরের সর্বত্র পাকা নিকাশি নালা নেই। জল নিকাশির জন্য একটি মাত্র বড় খাল রয়েছে। সেই দারিবাঁধ খালও সংস্কার হয় না। উল্টো দিকে, খালের বিভিন্ন জায়গা বেদখল হয়ে যাচ্ছে। আবার ধর্মা এলাকার দিকে কোনও নিকাশি খালই নেই। আগে শহর ছোট ছিল। ফলে চাষের জমিতে সেই জল গিয়ে পড়ত। এখন সেখানেও তৈরি হচ্ছে বাড়ি, বহুতল।
অভিযোগ, সব জেনেও পুরসভা বা মেদিনীপুর-খড়্গপুর উন্নয়ন পর্ষদ বহুতল নির্মাণের অনুমতি দিয়ে দিচ্ছে, এখন আবার পাঁচতলার পরিবর্তে আটতলার অনুমোদনও মিলছে, কিন্তু পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরসভার পরিকাঠানো উন্নয়ন তেমন নজরে পড়ছে না। ফলে এক সময় যে এই সমস্যা চূড়ান্ত আকার নেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু এটাই নয়, বহুতল নির্মাণের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলি প্রশাসনের দেখা উচিত, তা-ও দেখা হয় না বলে অভিযোগ।
বহুতল নির্মাণে একদিকে যেমন অল্প জমিতে অনেক পরিবারের থাকার জায়গা হচ্ছে, তেমনি ভবিষ্যতে জমির ভাঁড়ারে ততটা টান পড়বে না, পাশাপাাশি পুর পরিষেবার বিষয়টি মাথায় না-রাখলে পানীয় জল, জঞ্জাল সাফাই থেকে শুরু করে নিকাশি ভবিষ্যতে এগুলি যে গলার ফাঁস হবে তা বলাইবাহুল্য।