অনেক কষ্টে হয়তো খুঁজে পাওয়া গেল জমির আরএস রেকর্ড। কিন্তু দেখা গেল, রেকর্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিঁড়ে গিয়েছে। কিংবা অসাধু উপায়ে তার উপরে কলম চালিয়ে এক নামের উপরে অন্য নাম বসিয়ে দিয়েছেন কেউ। ফলে জমির মালিকানা নিয়ে বেধেছে বিবাদ।
এত দিনে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে উদ্যোগী হল রাজ্য সরকার। এই সমস্যা দূর করতে এ বার ১৯৫৩ সালে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল এস্টেট অ্যাকুইজিশন আইন’ যা আরএস রেকর্ডস অ্যান্ড ম্যাপ নামে পরিচিত, যা এত দিন কাগজে লিপিবদ্ধ ছিল, তাকে স্ক্যান করে কম্পিউটারে ধরে রাখার জন্য উদ্যোগী হল। তা সফল ভাবে রূপায়িত হলে আর কেউ আরএস রেকর্ডে যেমন বদল ঘটাতে পারবেন না, তেমনি নষ্টও হবে না।
একই সঙ্গে কেউ কারও জমি কেউ জোর করে দখল করলে কিংবা বেআইনিভাবে পুকুরকে জলা, নয়ানজুলিকে পতিত অনাবাদিও দেখাতে পারবেন না। রাজ্য জুড়েই এই কাজ শুরু হওয়ার কথা। পশ্চিম মেদিনীপুরে সম্প্রতি এই কাজ শুরু হয়েছে। মেদিনীপুর সদর ও কেশপুর ব্লক মিলিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার খতিয়ান ইতিমধ্যেই স্ক্যান হয়েও গিয়েছে। ধীরে ধীরে সারা জেলা ও রাজ্যেও এমনটা করা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে আগেই জিপিএসের মাধ্যমে জমির মানচিত্র তৈরি শুরু হয়েছে। কাজ শেষে জমির খুঁটিনাটি চিত্র ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে। সেখান থেকে কম্পিউটারে ক্লিক করে মিলবে জমির চিত্র।
পশ্চিম মেদিনীপরের জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক অরিন্দম দত্ত বলেন, “এলআর রেকর্ড নিয়ে কোনও বিতর্ক দেখা দিলেই সিএস রেকর্ড দেখে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে হয়। কিন্তু সেই রেকর্ড বহু পুরনো। কাগজে হাত দিলেই ভেঙে যায়। ফলে নথি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এ বার তা স্ক্যান করে কম্পিউটারে ধরে রাখার পাশাপাশি সাধারণ ভাবেও একটি কপি (হার্ড কপি) বের করে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।”
কেন এই কাজ করা হচ্ছে? গুরুত্বই বা কোথায়?
প্রশাসন সূত্রে খবর, এই রেকর্ড এত দিন রাখা থাকত ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে। লাল কাপড়ের ফাঁসে তা অবহেলায় পড়ে থাকত গুদামে। বর্তমানে জমি কেনাবেচার হার বেড়েছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অসাধু আধিকারিকদের কাজে লাগিয়ে এক জনের জমি অন্যের নামে করে দিচ্ছে অবলীলায়। এমনকী নয়ানজুলিকে রায়তি জমি বা পুকুরকে ধানি জমি করে ফেলছে। এই ভুল ধরতে আরএস রেকর্ড দেখাতে হয়। কারণ, সেখানে ১৯৫৩ সালে সেই জমির চরিত্র কী ছিল বা জমির মালিক কে তা লিপিবদ্ধ থাকে।
এক আধিকারিকের কথায়, বিষয়টি প্রশাসনের কর্তা কিংবা অসাধু ব্যবসায়ীদেরও অজানা নয়। কারচুপির কথা বাদ দিলেও রয়েছে নানা সমস্যা।
১৯৫৩ সালে যে কাগজে এই সব নথি রাখা হয়েছিল, বর্তমানে সেই কাগজ ভঙ্গুর পাপড়ের মতো হয়ে গিয়েছে। একটু চাপ দিলেই ভেঙে যায়। আবার বস্তাবন্দি হয়ে পড়ে থাকতে থাকতে অনেক নথি হারিয়েও গিয়েছে। আরএস রেকর্ড না পেলে বিস্তর ঝক্কি পোয়াতে হয়। তখন ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল টেনেন্সি আইন, যা সিএস নামে পরিচিত, সেই রেকর্ডের সন্ধান করতে হয়। যা আবার ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে নেই। তা জেলাশাসকের মালখানাতে থাকে। সেই রেকর্ডের হালও খারাপ। সেখানে গেলেই যে সব মিলবে তা নিশ্চিত ভাবে কেউ বলতে পারেননি। কারণ, সেই নথিও তো কাগজেরই। বস্তাবন্দি হয়ে যা পড়ে থাকে অতি অবহেলায়।
আগে জমি নিয়ে মানুষের ততটা মাথাব্যথা ছিল না। বরং জমি বেশি থাকলেই মাথাব্যাথা বাড়ত। এখন এক ফুট জমি নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটে। মামলা মোকদ্দমাও বাড়ছে। ফলে জমির রেকর্ডের গুরুত্ব বেড়েছে বেশ কয়েক গুণ।
সম্প্রতি মেদিনীপুর শহর ঘেঁষা ধর্মার চকের কাছে তিন কাঠা জমি কিনেছিলেন বন্দনা পাল। কিন্তু রেকর্ড করতে গিয়ে দেখেন, সেখানে আড়াই কাঠার উল্লেখ রয়েছে। কী ভাবে হল? ভূমি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, রেকর্ড অনুযায়ী সেখানে আড়াই কাঠার বেশি জমি নেই। কেউ দখলে রেখে তিন কাঠা বিক্রি করতেই পারেন। দলিলও হতে পারে। কিন্তু রেকর্ড করা যাবে না। তা হলে কী হবে? তার জন্য নানা ধরনের রেকর্ড দেখার প্রয়োজন। তা নাকি নেই! ফলে টাকা খরচ করে তিন কাঠা জমি কিনে তিনি আড়াই কাঠার বেশি সরকারি ভাবে পাচ্ছেন না তিনি। অফিসে অফিসে হন্যে হয়ে বছরের পর বছর ঘুরেও সুরাহা হয়নি।
আর ঠিক এখানেই প্রয়োজন রেকর্ড সংরক্ষণের। যদিও এত দিন এ বিষয়ে তেমন পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এত দিনে সেই কাজ শুরু হল। ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এই কাজটি সুষ্ঠু ভাবে মিটলে ভবিষ্যতে জমি বিবাদ সহজেই মেটানো যাবে। কিন্তু যে সব নথি হারিয়ে গিয়েছে? জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিকের কথায়, “সেই সব রেকর্ড নতুন করে তৈরি করতে বলা হয়েছে। সিএস রেকর্ডের পাশাপাশি এলআর বা হাল খতিয়ান দেখে তা তৈরি করা যাবে। কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। আর একবার তা করে ফেলতে পারলে, ভবিষ্যতে জমি নিয়ে আর কোনও সমস্যা থাকবে না।”
এই কাজ সম্পন্ন হলে তা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে। সেখান থেকে যে কেউ ক্লিক করে জমির নির্ভুল তথ্য পেয়ে যাবেন। কমবে কারচুপি।