কেউ পড়ানোর ফাঁকে ছাত্রছাত্রীদের চিকিৎসা করেন। কেউ আবার পড়ুয়াদের সঙ্গে সমান তালে খেলাধুলা ও নানা গবেষণা নিয়ে মেতে থাকেন। এমন শিক্ষকও রয়েছেন, যিনি গ্রামের কিশোরের চিকিৎসার খরচ জোটাতে গ্রামে ঘুরে ঘুরে সাহায্য চেয়ে বেড়ান।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এমনই তিন শিক্ষক এ বার জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসে তাঁদের সম্মান জানাবেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। সম্মান প্রাপকদের মধ্যে দু’জন উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক, একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহ-শিক্ষিকা। কৃতী এই শিক্ষক-শিক্ষিকারা হলেন খয়রুল্লাচক নেতাজি বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক ওবায়দুল্লা খান, হবিবপুর সরস্বতী বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক আশিসকুমার ঘোষ ও নয়াবসত প্রভাবতী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহ-শিক্ষিকা মানকুমারী ঘোষ।
খয়রুল্লাচক নেতাজি বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক ওবায়দুল্লা খান লোহানিয়া হাই মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন। ২০০০ সালে খয়রুল্লাচক স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন। মেদিনীপুর শহর ঘেঁষা হলেও খয়রুল্লাচক এলাকাটি খুবই পিছিয়ে পড়া। এই শিক্ষক নিজের চেষ্টায় ছাত্র সংখ্যা বাড়িয়েছেন, গাছ লাগিয়ে স্কুল চত্বরও সাজিয়েছেন খুব সুন্দর করে। স্কুলে সেগুন গাছের সংখ্যাই ২৬০টি। ওবায়দুল্লার আমলেই মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে উন্নীত হয়েছে স্কুলটি। সীমানা পাঁচিল হয়েছে, সাধারণ গবেষণাগারের হাল ফেরার পাশাপাশি হয়েছে একটি সুন্দর কম্পিউটার ল্যাবরেটরি। সেখানে ২২টি কম্পিউটার রয়েছে। পড়ুয়াদের আপদে-বিপদেও সদাসঙ্গী এই শিক্ষক। নিজে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হওয়ায় স্কুলের ছাত্রছাত্রী থেকে অভিভাবক, সকলের চিকিৎসা করেন। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ গত বছর রাজ্য সরকারের শিক্ষারত্ন সম্মান পেয়েছিলেন ওবায়দুল্লা। এ বছর জাতীয় সম্মানের জন্য মনোনীত হওয়ায় তিনি খুশি। বলছেন, “সকলের সাহায্য পেয়েছি বলেই স্কুলের কিছুটা উন্নতি করতে পেরেছি। এই পুরস্কার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল।”
হবিবপুর সরস্বতী বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক আশিস কুমার ঘোষের নেশা গবেষণা। ১৯৮৩ সালে বাঁকুড়ার পাঞ্চাল হাইস্কুলে সহ-শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু। প্রধান শিক্ষক পদে রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর। ছাত্র জীবনে নানা গবেষণামূলক কাজ করেছেন। শিক্ষক হওয়ার পরেও গবেষণা ছাড়েননি। কখনও জঙ্গল নিয়ে আবার কখনও দেশি ধান সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। সঙ্গে খেলাধুলো। ফুটবল প্রেম এখনও অটুট। অভ্যেস রয়েছে লেখালিখিরও। পরিবেশ ও উদ্ভিদ, প্রাণিরহস্য, পরিবেশ ও পার্থিব তথ্য, পরিবেশ বিদ্যা-সহ এখনও পর্যন্ত তাঁর লেখা ১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বই নবম ও দশম শ্রেণিতে পাঠ্যবই হিসাবে বিভিন্ন স্কুলে পড়ানো হয়। আশিসবাবুর কথায়, “পড়াশোনা করেছি। সমাজ ও দেশকে কিছু তো দিতে হবে। তাই গবেষণা, লেখালিখি নিয়ে আছি।”
নয়াবসত প্রভাবতী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহ-শিক্ষিকা মানকুমারী ঘোষ আবার ছাত্র অন্ত প্রাণ। ১৯৯৮ সাল থেকে স্কুলে পড়ানো শুরু। তখন স্কুলের ঘর বলে কিছুই ছিল না। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই স্কুল বন্ধ করে দিতে হত। বারান্দায় তো পড়ানো যায় না। কিন্তু ঘর তৈরির টাকা কোথায়? এমন সময় গ্রামে আসেন কিছু প্রবাসী বাঙালি। তাঁদের স্কুলে আমন্ত্রণ জানান এই শিক্ষিকা। পড়াশোনার সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও পটু করে তুলেছিলেন তিনি। প্রবাসীরা অনুষ্ঠান দেখে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁদের অর্থসাহায্যে তৈরি হয় স্কুলের ভবন। ছাত্রছাত্রীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চও তৈরি হয়। স্কুলের বাইরেও গ্রামবাসীর সমস্যায় পাশে থাকেন মানকুমারীদেবী। দৃষ্টিহীন কিশোরীকে হলদিয়ার চৈতন্যপুর মিশনে ভর্তি করা থেকে গ্রামের অগ্নিদগ্ধ কিশোরের চিকিৎসার খরচ জোগাড়, সবেতেই আছেন তিনি। মানকুমারীদেবীর কথায়, “গ্রামের মানুষের ভালবাসা পেয়েছি। এটাই কাজে উৎসাহ জোগায়।”