Advertisement
E-Paper

বালির জল চুঁইয়ে ক্ষতি রাস্তা-রেললাইনেও

নিয়ম রয়েছে খাতায় কলমে। বাস্তবে অবশ্য নিষেধা়জ্ঞার তোয়াক্কা না করেই চলে বালি পরিবহণ। ক্ষতি হচ্ছে রাস্তা ও রেললাইনের। দাঁতন ১ ব্লকে সুবর্ণরেখা নদীর ধার বরাবর বেলমূলা থেকে সোনাকনিয়া পর্যন্ত রয়েছে ৫০টিরও বেশি বালি খাদান।

অমিত কর মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:১৩
সুবর্ণরেখা থেকে তোলা হচ্ছে বালি।

সুবর্ণরেখা থেকে তোলা হচ্ছে বালি।

নিয়ম রয়েছে খাতায় কলমে। বাস্তবে অবশ্য নিষেধা়জ্ঞার তোয়াক্কা না করেই চলে বালি পরিবহণ। ক্ষতি হচ্ছে রাস্তা ও রেললাইনের।

দাঁতন ১ ব্লকে সুবর্ণরেখা নদীর ধার বরাবর বেলমূলা থেকে সোনাকনিয়া পর্যন্ত রয়েছে ৫০টিরও বেশি বালি খাদান। যার মধ্যে রয়েছে অনেক বেআইনি খাদানও। এই এলাকা থেকেই ট্রাক, ডাম্পারে করে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ওড়িশার বিভিন্ন প্রান্তে বালি যায়। নিয়ম না মেনে নদী থেকে তোলার পর ভিজে বালি গাড়ি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, গাড়িতে ভিজে বালির উপর কোনও আচ্ছাদনও চাপা দেওয়া হয় না। গাড়ি থেকে বালির জল ছিটিয়ে ক্ষতি হচ্ছে রাস্তার। ক্ষতি হচ্ছে খড়্গপুর থেকে ওড়িশা যাওয়ার রেললাইনেরও। বালির জল ছিটিয়ে আবার কখনও বা গাড়ি থেকে বালি উড়ে আসায় বিপদে পড়ছেন পথচারীরাও। প্রশাসন নির্বিকার।

এক একটি খাদান থেকে গড়ে ৩০-৪০ টি গাড়ি দিন পাঁচ-ছ’বার করে বালি পরিবহণ করে। রাজ্য সড়ক, ৬০ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গাড়িগুলি বালি নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় যায়। অনেক গাড়িকে খড়গপুর থেকে ওড়িশা যাওয়ার রেল লাইন পার হতে হয়। সেচ ও ভূমি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, বালি খাদানগুলিকে অনুমোদন দেওয়ার শর্ত হিসেবেই বলে দেওয়া হয়, বালি শুকনো করে অথবা জল ঝরিয়ে গাড়িতে বহন করতে হবে। গাড়িতে তোলার পর বালির উপর পলিথিন বা অন্য কিছুর আচ্ছাদন দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।

অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জল থেকে বালি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই তা গাড়িতে বোঝাই করে পরিবহণ করা হয়। সারা রাস্তায় গাড়ি থেকে বালির জল পড়তে থাকে। সারাদিনে কয়েকশো গাড়ির জল রাস্তায় ও রেল লাইনে পড়ায় রাস্তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। রাস্তার অবস্থা সবথেকে খারাপ ওড়িশা সীমানাবর্তী সোনাকনিয়া এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সোনাকনিয়া ওড়িশা সীমানা এলাকায় হওয়ায় নজরদারি কম। ফলে একটি খাদানের অনুমোদন নিয়ে বেআইনি ভাবে একাধিক খাদান চালান মালিকরা। মানা হয় না অন্য নিয়মও। ফাঁকি দেওয়া হয় রাজস্বও।


নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই সেই জল-সহ বালি বয়ে নিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রেলপথ।

গড়গড়িয়া গ্রামের সদন মাইতি, সোনাকনিয়ার নিখিল দোলাই, সোনাকানিয়া বাইপাসের বাসিন্দা হিরন্ময় সাহুদের বক্তব্য, ‘‘সোনাকানিয়ার রাস্তায় সারা বছরই জল- কাদা। অথচ এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন বহু গাড়ি চলাচল করে। রাস্তায় হাঁটাও ঝুঁকিপূর্ণ।’’ সোনাকনিয়া রেল গেটের গেটকিপার অর্জুন ঘোষ জানান, বহু বছর ধরে এই সমস্যা চলছে। বর্ষাকালে বালি তোলার কাজ বন্ধ থাকায় রেললাইন ও রাস্তার অবস্থা তুলনায় ভাল থাকে। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে। আগে কয়েকবার রেলগেটে গাড়ি আটকে বালির জল ঝড়িয়ে লাইন পারাপার করানো হয়েছিল। তারপরেও অবস্থার বিশেষ বদল হয়নি। রেল কর্মীদের একাংশেরও অভিযোগ, ‘‘এখানে প্রশাসনও কোনও কথা শোনে না। নদীর বালি নিয়ে মাফিয়ারাজ চলছে। কড়াকড়ি করেছিলাম বলে রাতে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ভয়ে কিছু বলতে পারি না।’’

রেল ইঞ্জিনিয়ার ষষ্ঠীধর পাত্র জানান, প্রতিদিন ওই লাইনে গড়ে ১২০টি ট্রেন যাতায়াত করে। জলে রেল লাইন সবসময় ভিজে থাকায় মাটি নরম হয়ে স্লিপার প্যাকিং খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তার দরুণ ট্রেন যাওয়ার সময় ঝাঁকুনি বেশি হচ্ছে। যে কোনও সময় লাইন ভেঙেও যেতে পারে। ফলে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্য জায়গায় যেখানে প্রতি মাসে রেললাইনে ‘ওভার রেলিং’-এর কাজ হয়। সেখানে সোনাকানিয়ায় ১৫ দিন অন্তর এই কাজ করতে হয়। ক্ষতি হচ্ছে লাইনের ধারের পাকা রাস্তারও। তাঁর অভিযোগ, “সমস্যা সমাধানে প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করছে না। হুমকি দিচ্ছে স্থানীয় লোকেরাও।” এ বিষয়ে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের খড়্গপুর ডিভিশনের ডিআরএম রাজকুমার মঙ্গলা বলেন, ‘‘উদ্বেগজনক। খোঁজ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব।’’

যদিও এক ডাম্পারের চালক শোভন জানা দাবি করছেন, জল থেকে বালি তোলার পর তাঁরা আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। তারপরেই গাড়ি করে বালি পরিবহণ করা হয়। আসলে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা না করা পর্যন্ত বালি থেকে জল পড়া থামে না। তিনি বলছেন, ‘‘শুকনো বালি দিলে আমরা সেটাই নিয়ে যাব। এ ছাড়া খাদানে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলে সারাদিনে দু’বারের বেশি বালি বহন করা যাবে না। তাতে মালিকেরই ক্ষতি হবে।’’

সোনাকনিয়ার একটি বালি খাদানের মালিক প্রকাশকুমার ঘোষ বলছেন, ‘‘ভিজে বালি বহনের ফলে রাস্তা ও রেললাইনের ক্ষতি হচ্ছে, সেটা জানি। তবে গাড়িগুলির কাজ নিয়ে আপত্তি করলে ওঁরা কাজ করতে চাইবে না। গাড়ি মালিকরা অন্য খাদানে বালি তোলার কাজে চলে গেলে আমাদেরই ক্ষতি।’’ শুধুই কী লাভের জন্য অনিয়ম হচ্ছে জেনেও তিনি বিষয়টিতে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? তাঁর সাফাই, ‘‘নদী থেকে ভিজে বালি তোলার পর তা শুকনো করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এরফলে খরচ বাড়বে। কমবে লাভও।’’

সাধারণত সেচ দফতরই বালি খাদানের অনুমতি দেয়। যদিও ভূমি দফতর আগে থেকে কয়েকটি খাদানকে দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন দিয়েছে। সেচ দফতরের রাজস্ব বিভাগের আধিকারিক (মেদিনীপুর বিভাগ) অলক দাস বলেন, “বালি খাদানগুলিকে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। অনিয়ম হলে আবার সতর্ক করা হবে। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” - নিজস্ব চিত্র।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy