হলদিয়ার এক বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রের অপমৃত্যুতে উঠল র্যাগিং এবং খুনের অভিযোগ। মৃত ছাত্র মানব বর্মন (২১)-এর বাড়ি শিলিগুড়িতে। গত ১০ নভেম্বর ক্ষতবিক্ষত ও অচৈতন্য পুরাতন মালদহ স্টেশনের কাছে রেললাইনের পাশে মানবকে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন রেল সুরক্ষা বাহিনীর কর্মীরা। তাঁরাই মানবকে মালদহ মেডিক্যালে ভর্তি করান। ১১ নভেম্বর মৃত্যু হয় ওই ছাত্রের।
মৃতের পরিজনেদের অভিযোগ, মানবকে খুন করা হয়েছে। কলেজের হস্টেলে ওই ছাত্র লাগাতার র্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলেন বলেও অভিযোগ মানবের বাড়ির লোক়জনের। তবে এই মর্মে থানায় কোনও অভিযোগ দায়ের হয়নি। যদিও খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতেই শনিবার শিলিগুড়ির ভক্তিনগর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান এলাকার বাসিন্দারা। পরে পুলিশের আশ্বাসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। শিলিগুড়ি পুলিশের এডিসি (পূর্ব) মৃণাল মজুমদার বলেন, ‘‘ঘটনাস্থল মালদহ হওয়ায় এখানে কিছু করার নেই। মৃত ছাত্রের পরিবার যদি লিখিত অভিযোগ করে তাহলে তা সংশ্লিষ্ট জেলা ও থানার পুলিশকে জানিয়ে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে দ্রুত তদন্তের অনুরোধও করা হবে।’’
মানব হলদিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির বি-টেক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তাঁর বাবা অজিতবাবু পেশায় ট্রাক চালক এবং মা বিরুলাদেবী গৃহবধূ। পরিজনদের দাবি, পুজোর ছুটিতে বাড়িতে এসে মানব মাকে জানিয়েছিলেন, হস্টেলে তাঁর উপরে নির্যাতন হচ্ছে। অজিতবাবুর কথায়, ‘‘পুজোর ছুটিতে এসে ফিরতে চাইছিল না। মাত্র একটা সেমেস্টার বাকি থাকায় বুঝিয়ে পাঠানো হয়। তার এই ফল হবে বুঝতে পারিনি।’’ হলদিয়ার এই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটি প্রাক্তন সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠের সংস্থা ‘আই কেয়ার’-এর অধীন। তবে লক্ষ্মণবাবুর বক্তব্য, ‘‘র্যাগিং হয়েছিল কিনা জানা নেই। আর মৃত্যু তো এখানে হয়নি। পরিবারের লোকজন অভিযোগ করলে তদন্ত হবে।’’
পরিবার সূত্রের খবর, গত ৯ নভেম্বর তিন বন্ধুর সঙ্গে হলদিয়া থেকে বাড়ির জন্য রওনা দেন মানব। শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে ওঠার সময়েও কথা হয় বাড়ির লোকের সঙ্গে তাঁর কথাও হয়। অজিতবাবুর দাবি, ছেলের সঙ্গী ওই কলেজেরই ছাত্র ভাস্কর নামে একজন ফোন করে তাঁকে রাতে জানায়, মানবের মোবাইলে চার্জ নেই। তাই তাঁর সঙ্গেই যোগাযোগ করতে হবে। পরদিন ভাস্কর ফের ফোন করে জানান, তিনি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে বাড়ি যাচ্ছেন। মানবকে রাতের পর আর খুঁজে পাননি। ছেলের খোঁজ না পেয়ে ভক্তিনগর থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন অজিতবাবুরা।
এ দিকে, ১০ নভেম্বরই মানবকে জখম ও অচৈতন্য অবস্থায় পুরাতন মালদহ স্টেশনের কাছে রেললাইনের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ১১ নভেম্বর মালদহ মেডিক্যালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে ইংরেজবাজার থানা সূত্রে খবর। ভক্তিনগর থানায় খবর আসে ১৩ নভেম্বর বিকেলে। শনিবার দুপুরে মানবের মৃতদেহ নিয়ে পরিজনেরা শিলিগুড়ি ফিরলে ক্ষোভ ছড়ায়। ভক্তিনগর থানা ঘেরাও করে আধ ঘন্টা চলে বিক্ষোভ। পরে আইসি রাজেন ছেত্রী ইংরেজবাজার থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার তদন্তের ব্যপারে কথা বলার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ডিওয়াইএফআই নেতা লিটন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘যাই ঘটে থাকুক আমরা পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি।’’
ইংরেজবাজার থানা সূত্রের খবর, রেলপুলিশ যখন মানবকে উদ্ধার করেছিল, তখন তাঁর পরিচয় জানা যায়নি। পরে পরিচয়পত্র মেলে। ১১ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুর পরে পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করে দেহ ময়না তদন্তে পাঠায়। ১২ নভেম্বর ময়নাতদন্তের সময় কয়েকটি এটিএম কার্ড উদ্ধার হয়। তদন্তকারী অফিসার ১৩ নভেম্বর ডিউটিতে যোগ দিলে ওই গুলি থানায় জমা করেন। তারপরে শিলিগুড়িতে খবর দেওয়া হয়। মৃত্যুর খবর পরিবারকে জানাতে দেরি করা হল কেন হল তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মৃতের পরিজন ও এলাকার লোকজন। পুলিশের একাংশও মানছেন, ঘটনাটিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। মালদহের পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনার কথা খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।