হস্টেলের ছাদ থেকে উদ্ধার হল পলিটেকনিক কলেজের এক ছাত্রের দেহ। সোমবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে হলদিয়ার সরকারি পলিটেকনিক কলেজ ‘মেঘনাদ সাহা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’তে। মৃত সন্দীপন বিশ্বাস (১৯) ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তাঁর বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলেই মৃত্যু হয়েছে ওই ছাত্রের। হস্টেল সূত্রে খবর, ‘ডেনড্রাইট’-এর টিউব নিয়ে নেশা করতেন সন্দীপন। ঘটনার পর তাঁর মুখে ডেনড্রাইটের তীব্র গন্ধ ছিল বলেও ছাত্ররা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালেই সন্দীপনের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হয়। হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালের সুপার হারাধন বর্মন বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, অতিরিক্ত মাদক থেকেই ওই ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। তবে ভিসেরার ফরেন্সিক পরীক্ষার পরই মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলা যাবে।” দুর্গাচক থানার পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
কলেজের অধ্যক্ষা তাপসী বিশ্বাস রায় বলেন, “তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় সন্দীপন অকৃতকার্য হয়। গত এক বছর ধরে ওঁর সঙ্গে কলেজের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না। পরে সে আবার পরীক্ষা দিয়েছিল। সোমবার তারই মার্কশিট নিতে সে কলেজে এসেছিল।” সোমবার রাতে হস্টেলের ছাদে সন্দীপনের দেহ প্রথম দেখতে পান কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তুহিনকুমার ঘোষ। তিনি বলেন, “বিকেল পর্যন্ত হস্টেলের অন্য ছাত্রদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই গল্প করছিল সন্দীপনদা। বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ ‘বাড়ি যাচ্ছি’ বলে বেরিয়ে যায়। তারপর কখন সে হস্টেলের ছাদে উঠল, কেউই খেয়াল করিনি। রাত পৌনে ৮টা নাগাদ কয়েকজন বন্ধুর খোঁজে আমি ছাদে উঠি। তখনই দেখি, দরজার পাশে সন্দীপনদা পড়ে রয়েছে।”
কলেজের ছাত্র সংসদের সদস্য তৃতীয় বর্ষের ছাত্র অতনু পালের কথায়, “তুহিনের চিৎকার শুনে আমরা ছুটে যাই। সন্দীপনদার হাত-পা তখন ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। ওর মুখ থেকে ডেনড্রাইটের তীব্র গন্ধ পাচ্ছিলাম।” হস্টেলের ছাত্ররাই সন্দীপনকে হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। ততক্ষণে অবশ্য ওই ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে।
কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভাগের ছাত্র সন্দীপন ২০১৩ সালে ফাইনাল পরীক্ষায় চারটি পেপারে অকৃতকার্য হয়। গত ডিসেম্বরে তিনি ফের ওই চারটি পেপারের পরীক্ষা দেন। সোমবার সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। এ বার সন্দীপন একটি পেপারে অকৃতকার্য হয়েছিলেন।
ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে হলদিয়ায় এসেছিলেন সন্দীপনের বাবা সম্বিতকুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, “সোমবার সকালে ইন্টারনেটে পরীক্ষার ফল দেখার পর মার্কশিট আনতে কলেজ রওনা হয়। সোমবারই ওর বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বিকেল ৪টে নাগাদ সন্দীপন বোন সিন্দিকাকে ফোন করে জানায়, মঙ্গলবার পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করে সে বাড়ি ফিরবে। পরে আর ফোন করেনি। আমরাও ওকে ফোনে পাইনি।” সম্বিতবাবু জানান, সোমবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ কলেজের ছাত্ররা ফোন করে সন্দীপনের অসুস্থতার কথা জানায়। পরে ভবানীপুর থানার পুলিশ ছেলের মৃত্যুসংবাদ জানায়। খবর পেয়ে রাতেই সম্বিতবাবু দুই আত্মীয়কে নিয়ে হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালে যান।
সন্দীপন নেশা করতেন বলে অবশ্য মানতে চাননি পরিজনেরা। সম্বিতবাবু বলেন, “আমার ছেলে নেশা করে বলে জানতাম না। পরীক্ষায় খারাপ ফলের জন্য ও বিপর্যস্তও ছিল না। কোত্থেকে যে কী হয়ে গেল, বুঝতে পারছি না।” মৃত ছাত্রের জেঠা প্রশান্ত বিশ্বাস, দাদু সন্দীপ বৈরাগীরও বক্তব্য, “সন্দীপন নেশা করতে পারে বলে আমরা বিশ্বাস করি না।”
কলেজে বা হস্টেলে নেশা করার খবর তাঁদের কাছে নেই বলে দাবি করেছেন কলেজ কর্তৃপক্ষও। হস্টেল সুপার গৌতম নন্দ বলেন, “নানা কারণে ছাত্রাবাস কয়েকবছর আগে বন্ধ করা হয়েছিল। পরে সরকারি উদ্যোগে তা ফের খোলা হয়। অতীতে ছাত্রাবাসে কারও নেশা করার ঘটনা আমাদের নজরে আসেনি।” কলেজের অধ্যক্ষা অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, কলেজ ও ছাত্রাবাসে মাদক সেবন রুখতে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।