E-Paper

‘আতঙ্কেই মারা গেল ছেলেটা’

কলকাতার পূর্ব যাদবপুরে মুকুন্দপুর এলাকার অহল্যানগরে এ দিন সকালে অশোক দাস (৪৭) নামে এক বিএলও-র দেহ মেলে বাড়ির শৌচাগারে ঝুলন্ত অবস্থায়।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৭
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

গোয়ায় কাজ করতেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের আদিবাসী পরিযায়ী শ্রমিক সুভাষ হেমব্রম (৩০)-কে বৃহস্পতিবার ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়। ১১ জানুয়ারি গোয়া থেকে ট্রেন ধরেন তিনি। কিন্তু ট্রেন অনেক দেরিতে চলছিল। সোমবার ভুবনেশ্বরে ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকাকালীন পাশের গাছে তাঁর ঝুলন্ত দেহ মেলে। বৃহস্পতিবার বাড়িতে দেহ পৌঁছতে সুভাষের বাবা পারাভ হেমব্রমের দাবি, ‘‘আতঙ্কেই ছেলেটা মারা গেল!’’

সুভাষ-সহ এসআইআর-আতঙ্কে এ দিন রাজ্যে চারটি মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যের ভোটার তালিকায় শুনানি-পর্বে হয়রানির প্রতিবাদে ধুন্ধুমার হয়েছে উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়া-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। হয়েছে বিএলও-বিক্ষোভ। একাধিক জায়গায় বিএলও-দের আটকে বিক্ষোভও হয়েছে। চলছে রাজনৈতিক তরজা।

কলকাতার পূর্ব যাদবপুরে মুকুন্দপুর এলাকার অহল্যানগরে এ দিন সকালে অশোক দাস (৪৭) নামে এক বিএলও-র দেহ মেলে বাড়ির শৌচাগারে ঝুলন্ত অবস্থায়। তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরে বহড়ু হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। শুনানি থেকে বাড়ি ফিরে অসুস্থ হয়ে এক মহিলার মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে মুর্শিদাবাদের লালগোলায়। পরিবারের দাবি, সাবেরা বিবি (৪০) বুধবার বিকেলে শুনানি থেকে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বৃহস্পতিবার ভোরে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো যায়নি। শুনানির আতঙ্কে শমসেরগঞ্জের চাচণ্ড পঞ্চায়েতের রামেশ্বরপুরের বৃদ্ধ পুটু শেখ (৬৪) এ দিন দুপুরে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে দাবি। হুগলির বলাগড় ব্লক কার্যালয়ের শুনানি কেন্দ্রে বিকেলে অসুস্থ হয়ে পড়েন এক কর্মী। জিরাট পঞ্চায়েতের ভারপ্রাপ্ত প্রধান অশোক পোদ্দারের দাবি, কাজের চাপে শরীর খারাপের কথা তাঁকে জানিয়েছিলেন ওই কর্মী।

শুনানিতে হয়রানির অভিযোগে এ দিন চাকুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় রাজ্য সড়কে টায়ার ও কাঠ জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখান বাসিন্দাদের একাংশ। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। গোয়ালপোখর-২ ব্লক অফিসের সামনেও আগুন জ্বালানো হয়, ভাঙচুর করা হয় অস্থায়ী ছাউনি। সেখানে এসআইআর-সংক্রান্ত নথি পুড়ে গিয়েছে বলে সন্দেহ। বিডিও-র তরফে পুলিশে অভিযোগ হয়েছে। বিক্ষোভ থামাতে গিয়ে জখম হন চাকুলিয়া থানার আইসি রাজু সোনার। তাঁর মাথায় চোট লেগেছে। পরে পুলিশ লাঠি চালিয়ে ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ১৭ জনকে আটক করা হয়েছে। রাতে কমিশন জানায়, তারা রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং ডিজির কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছে, পরবর্তী কালে শুনানি কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। চাকুলিয়ার তৃণমূল বিধায়ক মিনহাজুল আরফিন আজাদের দাবি, “শুনানির নামে মানুষের হয়রানির প্রতিবাদ হয়েছে।” যদিও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “চাকুলিয়ার মতো জায়গায় ভর্তি-ভর্তি অনুপ্রবেশকারী। তৃণমূলের সঙ্গে তাদের এতই বন্ধুত্ব যে, এরা নির্বিচারে সরকারি দফতর ভাঙচুর করে, আগুন লাগায়।” এ দিন উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার দু’জায়গায় রাস্তা আটকে বিক্ষোভ দেখান বাসিন্দাদের একাংশ। গ্রামের কয়েকশো বাসিন্দার একসঙ্গে শুনানির নোটিস আসায়, বিএলও-দের পঞ্চায়েত অফিসে আটকে রাখা হয় পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটে। ঝাড়গ্রামে এক বিএলও শুনানির নোটিস দিতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন।

জেলায়-জেলায় বিক্ষোভে শামিল বিএলওদের বক্তব্য, শুনানির নোটিস দিতে হচ্ছে তাঁদের। ভোটারেরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। ক্ষোভের জের পোহাতে হচ্ছে তাঁদের। মুর্শিদাবাদের ফরাক্কায় ব্লক অফিসে ভাঙচুর ঘিরে ধুন্ধুমার বেধেছিল বুধবার। সে দিনই ফরাক্কার বিএলও-রা গণ-ইস্তফা দেন। বৃহস্পতিবার জেলার শমসেরগঞ্জ ব্লকে গণ-ইস্তফা দেন ২৮৩ জন বিএলও। সুতি ২ ব্লকেও ২১৬ জন বিএলও সাংবাদিক বৈঠক ডেকে আজ, শুক্রবার ইস্তফা দেবেন বলে দাবি করেছেন। বীরভূমের নলহাটি ১ ব্লকে জনা ষাটেক বিএলও গণ-ইস্তফা দেন। এ দিন দুপুরে নদিয়ার চাপড়ায় পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান বিএলও-রা। জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের গড়ালবাড়িতে কমিশনের সুপারভাইজ়ারের অফিসে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ দেখান ১৭ জন বিএলও। এক বিএলও জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে র্নিবাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে এবং মানুষকে সংযত থাকার আবেদন জানিয়ে নন্দীগ্রামে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিএলও-রা তাঁদের মৃত্যুর জন্য জ্ঞানেশ কুমারকে দায়ী করেছেন। আমিও বলছি, এতগুলো মৃত্যুর জন্য উনি দায়ী।” সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তব্য, “কমিশন ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র নামে চরম ‘ইললজিক্যাল’ (অযৌক্তিক) কাজ করছে! বিশেষত, মহিলা, সংখ্যালঘু, তফসিলি জাতি, আদিবাসী-সহ প্রান্তিক মানুষকে হয়রান করা হচ্ছে।” এসইউসি-র রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্যের প্রশ্ন, “করের তহবিল খরচ করে করদাতাদের এত সরকারি হেনস্থার শিকার হতে হবে কেন!” ভোটারের হয়রানি বন্ধ করার জন্য সিইও দফতরে লিখিত ভাবে দাবি জানিয়েছেন সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর পাল্টা জবাব, “সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়ে গিয়েছে।” চাকুলিয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, “আগুন লাগাচ্ছে তৃণমূল। ওই আগুনেই পুড়বে তৃণমূল।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal SIR

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy