Advertisement
০২ ডিসেম্বর ২০২২

অক্টোপাস তো সঙ্গে আছে, খাদান লুটতে কীসের ভয়

ফেলুদা বা ব্যোমকেশ বক্সীও বোধহয় ঘোল খেয়ে যাবেন! দুর্বোধ্য সব সঙ্কেত। ডোনাল্ড ডাক, কঙ্কাল, অক্টোপাস! কিংবা ইংরেজি হরফে ‘বিকে’, ‘বিপিএল।’ এক-একটা ‘কোড’-এর কার্ড নিমেষে বিকিয়ে যাচ্ছে দু’হাজার-আড়াই হাজার টাকায়! বেশি কিনলে ডিসকাউন্টের সুযোগও! কোন গুপ্তধনের হদিস আছে এতে?

দক্ষিণ দামোদরের বালিঘাট

দক্ষিণ দামোদরের বালিঘাট

জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়
কলকাতা শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০১৫ ০৩:৩১
Share: Save:

ফেলুদা বা ব্যোমকেশ বক্সীও বোধহয় ঘোল খেয়ে যাবেন!

Advertisement

দুর্বোধ্য সব সঙ্কেত। ডোনাল্ড ডাক, কঙ্কাল, অক্টোপাস! কিংবা ইংরেজি হরফে ‘বিকে’, ‘বিপিএল।’ এক-একটা ‘কোড’-এর কার্ড নিমেষে বিকিয়ে যাচ্ছে দু’হাজার-আড়াই হাজার টাকায়! বেশি কিনলে ডিসকাউন্টের সুযোগও! কোন গুপ্তধনের হদিস আছে এতে?

মর্মোদ্ধার করতে নেমে ফেলুদা-ব্যোমকেশের চুল খাড়া হলেও বীরভূম-বর্ধমানের একটা বড় অংশের ‘বিশেষ’ কারবারে জড়িত লোকজনের কাছে এটা কোনও রহস্যই নয়। ওঁরাই জানিয়ে দেবেন— এগুলো আসলে বালি-কারবারিদের চোরাপথের ‘পারানির কড়ি’! যে পথে সাজিয়ে রাখা থাকে পুলিশের ‘প্রণামী বাক্স।’ সেখানে নগদ ঢাললে হাতে চলে আসে নির্দিষ্ট ‘সঙ্কেতের’ ছবি সংবলিত ছাড়পত্র, যার জোরে রাতের আঁধারে চোরাই বালি বোঝাই লরি অবাধে পেরিয়ে যেতে পারে চেকপোস্টের পর চেকপোস্ট। যদি কোনও পুলিশের গাড়ি ভুলক্রমে টর্চ নেড়ে দাঁড় করায়, শুধু জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ‘অক্টোপাস’টিকে বাড়িয়ে দাও। কিংবা ডোনাল্ড ডাক, বা কঙ্কাল!

ব্যাস। তুরন্ত মিলবে গ্রিন সিগন্যাল। ফের লরি ছোটাও হু-হু করে।

Advertisement

এক অর্থে এ-ও গুপ্তধন। ইমারতি ব্যবসার হাত ধরে নিউটাউন-রাজারহাটে যেমন সিন্ডিকেট-রাজ জাঁকিয়ে বসেছে, বর্ধমান-বীরভূমে বালি ও পাথর খাদান ঘিরে তেমনই চলছে মাফিয়া-রাজ। বালি-পাথরের লরির চাকায়-চাকায় উড়ছে কাঁচা টাকা। ঝরছে রক্ত। তফাত একটাই—সিন্ডিকেটের শাসন চলে শাসকদলের নেতা-নেত্রীর মদতে। পুলিশি ভূমিকা সে ভাবে নেই। তবে বালি-পাথরে রাজনৈতিক প্রতিপত্তির সঙ্গতে নেপথ্যের আসল খেলাটা পুলিশই খেলে বলে অভিযোগ।

গত সপ্তাহে বর্ধমানে বালি-মাফিয়াদের দুই গোষ্ঠীর বিবাদে শাসক দলের তিন জনের প্রাণ গিয়েছে। তার আগে, ১০ মে খুন হয়েছেন রায়না-২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শেখ আব্দুল আলিম। গত সপ্তাহের হত্যাকাণ্ডের পরে রাজ্যের সেচমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনাস্থলে গিয়ে বেআইনি ভাবে বোঝাই বেশ ক’টি বালির লরি আটক করেছিলেন। লরি-মালিকদের মোটা জরিমানাও করা হয়। কিন্তু রাজীববাবুও জানেন, এতে কিছু হওয়ার নয়। ‘‘আমার হাতে আলাদিনের প্রদীপ নেই যে, রাতারাতি সব বন্ধ হয়ে যাবে!’’— স্বীকারোক্তি তাঁর। তবে তিনি এ-ও জানাচ্ছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ, কয়লার মতো বালির অবৈধ ব্যবসাও নিকেশ করতে হবে। তাই আমি নিজে রাস্তায় নেমেছি। চোরাচালান বন্ধ করেই ছাড়ব।’’

বর্ধমানে বালি ভর্তি লরির সারি

বর্ধমান-বীরভূমে নদীর বালি ও খাদানের পাথর তোলার ব্যবসা বহু কালের। নির্দিষ্ট হারে রাজস্বের বিনিময়ে খাদান বা ঘাটের ইজারা মেলে। আগে এই রাজস্ব আদায় করত রাজ্যের ভূমি দফতর, এখন করে সেচ। কিন্তু সেচমন্ত্রীর ‘প্রত্যয়ী’ ঘোষণা শুনেও প্রশাসনের একাংশ বিশেষ ভরসা পাচ্ছে না। এই মহলের দাবি— বর্ধমানে দামোদর-অজয়ের বালি খাদান ও বীরভূমের বিভিন্ন পাথর খাদান থেকে চোরাচালানের রমরমা গত তিন মাসে বাড়তি মাত্রা পেয়েছে। দু’মাসে চারটে খুনই তার প্রমাণ। নবান্নের এক কর্তার পর্যবেক্ষণ, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতায় এসে খনি-খাদানে অবৈধ কারবারে ভালই রাশ টেনেছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার জোগাড়!’’

বস্তুত বালি-পাথরের দখলদারির লড়াই দিন দিন যে ভাবে রক্তাক্ত হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে দক্ষিণবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিলক্ষণ আশঙ্কা করছেন পুলিশ-কর্তাদের একাংশও।

অনিয়ম চলে কী ভাবে?

প্রশাসনের খবর: যতটা তোলার কথা, ইজারাদারদের অনেকে তার চেয়ে অনেক বেশি বালি তোলেন। অনেকে নিজের বরাদ্দ ঘাট বা খাদানের বাইরে গিয়ে অন্য ঘাট-খাদানেও লরি লাগান। লরিতেও অনুমোদিত পরিমাণের বেশি বালি বোঝাই করা হয়। কোনও কারবারিকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ (ব্ল্যাকলিস্টেড) করা হলে তিনি অন্য নাম নিয়ে কারবারে নেমে পড়েন। ‘‘দিনের পর দিন এই কাণ্ড চলছে। মাফিয়াদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে পঞ্চায়েত ও সরকারি দফতরের কেউ কেউ। পুলিশের লোকও আছে। সবার উপরে আছে নেতাদের আশীর্বাদ।’’— আক্ষেপ করছেন বর্ধমান জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, মাফিয়া-পঞ্চায়েত-শাসক দলের এ হেন ত্র্যহস্পর্শে দামোদর ও অজয় নদের বুকে কয়েকশো অবৈধ বালি খাদান রমরমিয়ে চলছে। সেগুলো থেকে ফি বছর সরকারের ঘরে কয়েকশো কোটি টাকা রাজস্ব আসার কথা থাকলেও কানাকড়িটি মিলছে না। পুলিশের হিসেবে, দামোদর-অজয় থেকে মাসে অন্তত পাঁচ হাজার লরি বালি তুলে কলকাতার আশপাশে চালান হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রের খবর— কাঁকসা, কেতুগ্রাম, মঙ্গলকোট, পূর্বস্থলিতে অজয়ের উপরে অসংখ্য আইনি-বেআইনি ঘাট রয়েছে। খণ্ডঘোষ, সদরঘাট, রায়না, বড়সুলে নির্বিচারে তোলা হচ্ছে দক্ষিণ দামোদরের বালি। এক মাফিয়ার কথায়, ‘‘ঘাট থেকে বাড়তি বালি নিয়ে যেতে হলে নেতা ও পুলিশকে টাকা দিতেই হবে। এক বার বাতচিৎ হয়ে গেলে আর ঝঞ্ঝাট থাকে না।’’ তা পুলিশ কী ভাবে জড়িত?

পুলিশের দেওয়া বিশেষ কার্ড

এখানেই ডোনাল্ড ডাক, কঙ্কাল, অক্টোপাসের খেলা। লরিচালকদের দাবি, এই সব ‘কোড’ দেওয়া প্যাড জেলা পুলিশের তরফেই ছাড়া হয়েছে। বর্ধমানের বড়সুল ও পালশিটের মাঝে তা ‘বিক্রি’ হয়। পুলিশের হয়ে লরি-মালিকদের প্যাড কিনতে বাধ্য করেন ‘মিশ্রজি’ ও ‘ছোটু’ নামে দুই ব্যক্তি। সূত্রের ইঙ্গিত, পুলিশের তরফে পুরো প্রক্রিয়ার দেখভাল করেন ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার এক অফিসার, যাঁর সদ্য থানা বদল হয়েছে।

প্যাড বিকোচ্ছে কী দরে?

পুলিশের অন্দরের তথ্য— বালির লরি পিছু মাসে আদায় হয় আড়াই হাজার টাকা। পাথরের লরি পিছু ২১০০। একাধিক লরি থাকলে একাধিক প্যা়ড লাগবে, তবে সে ক্ষেত্রে বিশেষ ‘ছাড়ের’ সংস্থান রয়েছে। বিভিন্ন প্যাডের মেয়াদও বিভিন্ন। লরিচালকেরা বলছেন, প্যাডে ‘১’ লেখা থাকার অর্থ, মেয়াদ এক মাস। ‘২’ মানে দু’মাস। বর্ধমানে দীর্ঘ দিন কাজ করে আসা এক পুলিশ-কর্তা জানিয়েছেন, ‘নিরাপত্তার’ খাতিরে দু’-তিন মাস অন্তর প্যাডের সঙ্কেতগুচ্ছ বদলে দেওয়া হয়।

এখন যেমন ডোনাল্ড ডাক-কঙ্কাল-অক্টোপাসের জমানা। তার দৌলতে দেদার টাকা উঠছে। সূত্রের হিসেবে, বর্ধমানের বালি ও বীরভূমের পাথর মিলিয়ে মাসে অন্তত ১০ হাজার লরি যাতায়াত করে। প্রতিটি থেকে পুলিশ গড়ে অন্তত দু’হাজার টাকা আদায় করলেও ফি মাসে দু’কোটি টাকা পুলিশকর্মীদের একাংশের পকেটে ঢুকছে, যার বখরা পাচ্ছেন নেতারা। এমনও খবর রয়েছে যে, প্রতি মাসে রাজারহাটের এক শপিং মলে বালির টাকার ‘সুরক্ষিত’ হাতবদল হয়ে থাকে। অশুভ চক্র যত ফুলে ফেঁপে উঠছে, স্বাভাবিক ভাবেই পাল্লা দিয়ে কমছে জরিমানার অঙ্ক। ভূমি দফতরের তথ্যানুযায়ী, বর্ধমানে বালির লরি আটকে আগে মাসে ১৫-১৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আদায় হতো। ইদানীং তা পড়তির দিকে।

আর রাজনীতির ভূমিকা?

বর্ধমান জেলা পুলিশ ও স্থানীয় তৃণমূল সূত্রের খবর— জেলার ‘বালি কারবার’ দেখাশোনার মূল দায়িত্বে রয়েছেন জনৈক ‘দাসবাবু’ ও ‘সেনগুপ্ত মশাই।’ দু’জনেই রাজ্যের এক মন্ত্রীর অনুগামী হিসেবে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে বর্ধমানের বিধায়ক তথা রাজ্যের ক্ষুদ্র-কুটিরশিল্প দফতরের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের প্রতিক্রিয়া, ‘‘তৃণমূলের জেলা সভাপতি হওয়ার সুবাদে আমি বলতে পারব না যে, দলের স্থানীয় নেতাদের চিনি না। এটুকু বলতে পারি, এ সবে জড়িতদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত লেনদেন নেই।’’

মন্ত্রী যা-ই বলুন, লরি মালিকদের ‘লেনা-দেনার’ অভিজ্ঞতা অন্য রকম। ওঁদের অনেকের আক্ষেপ, প্যাড ইত্যাদি কিনে পুলিশকে যথাসম্ভব ‘সহযোগিতা’ করার পরও তোলাবাজি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। নানা ছুতো-নাতায় হামেশাই হেনস্থা হতে হচ্ছে। ট্রাক মালিকদের সংগঠন ‘ফেডারেশন অব ট্রাক অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন’ সম্প্রতি ‘পুলিশি জুলুমবাজি’র অভিযোগ নিয়ে রাজ্যের আইজি (আইন-শৃঙ্খলা) অনুজ শর্মার দ্বারস্থ হয়েছে। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সুভাষ বসুর মন্তব্য, ‘‘মেমারি, কাঁকসা, বুদবুদ, শক্তিগড়, বর্ধমান ইত্যাদি থানার পুলিশ তো লরি দেখলেই টাকা চাইছে! সব কাগজপত্র থাকলেও টাকা দিতে হবে। না হলে গাড়ি আটক।’’

মালিকদের এই অভিযোগ সম্পর্কে বর্ধমানের পুলিশ সুপার কুণাল অগ্রবাল বলেন, ‘‘বালি ওভারলোডিং করে পাচার হলে তল্লাশি করে তা আটক করা হবেই। শুক্রবার এ রকম ২৯৩টি এবং শনিবার ৪৫৩টি বালির লরি আটক করা হয়েছে।’’ কিন্তু জেলা পুলিশই কার্ড বিলি করে তোলা আদায় করছে বলে লরি চালকরা যে অভিযোগ করছেন— তা কতটা সত্য? প্রশ্ন শুনেই ফোন কেটে দেন পুলিশ সুপার। তার পর থেকে তাঁকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি।

তোলাবাজির সুরাহা না-হলে প্রয়োজনে ধর্মঘটে যাওয়ার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন সুভাষবাবু। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কী বক্তব্য? রাজ্য পুলিশের মুখপাত্র তথা আইজি (আইন শৃঙ্খলা) অনুজ শর্মার আশ্বাস, ‘‘অভিযোগ শুনেছি। যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.