মায়ের পর এ বার আদালতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল নিহত কলেজছাত্রী ঈশিতা মল্লিকের ভাই। শনিবার সকাল ১১টা নাগাদ মা-বাবা ও দুই প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়ে দিদির খুনের সাক্ষ্য দিতে কৃষ্ণনগর জেলা আদালতের চতুর্থ ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে উপস্থিত হয়েছিল ভাই করণ মল্লিক। হাজিরা দেওয়ার পর থেকেই সে দিনের ঘটনা বিচারকের সামনে বলার জন্য উদগ্রীব ছিল সে। শুক্রবারের পর শনিবারও আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া চলে। বিচারক সুস্মিতা গায়েনের এজলাসেতে অভিযুক্তদের উপস্থিতিতে সাক্ষ্যদান প্রক্রিয়া শেষ হয়। শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার পর ফের একবার মুখোমুখি হয় নিহত ছাত্রীর ভাই ও প্রধান অভিযুক্ত দেশরাজ সিংহ। ঘটনার দিন কী কী ঘটেছিল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেয় করণ। দীর্ঘসূত্রতার কারণে আসামিপক্ষের আইনজীবী বাধা দিলে তাঁকে নিরস্ত করেন বিচারক। আগামী সোমবার সাক্ষ্য দেবেন ঈশিতার দাদু।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার কৃষ্ণনগর এডিজে আদালতের ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে সাক্ষ্যদান প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিচারক সুস্মিতার এজলাসেতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ঈশিতার মা কুসুম মল্লিক। এর পর শনিবার সাক্ষ্য দেয় ঈশিতার ভাই করণ। সরকারি আইনজীবী সুবেদী সান্যাল আদালত কক্ষে করণকে ঘটনার দিন ঠিক কী কী ঘটেছিল, তা পূর্ণাঙ্গভাবে জানানোর জন্য বলেন। সে দিনের ঘটনা নিখুঁতভাবে বিচারককে জানায় করণ। সরকার পক্ষের আইনজীবী করণের কাছে প্রথমে তার নাম ও পরিচয় জানতে চান। করণ যথাযথ উত্তর দেয়। এর পর তাকে স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়। কার সাথে স্কুলে যায়, কখন যায়, স্কুল থেকে কে আনতে যান—এ ব্যাপারেও প্রশ্ন করেন আইনজীবী। সব প্রশ্নের উত্তর দেয় করণ। কী ভাবে, কবে কাঁচরাপাড়া গিয়েছিল এবং দিদির সঙ্গে তার কী ধরনের কথা হতো, বিস্তারিত প্রশ্নোত্তরে তা উঠে আসে আদালত কক্ষে।
দেশরাজের সঙ্গে কী ভাবে পরিচয় হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে করণ বলে, “আমরা কাঁচরাপাড়ার যে মাঠে খেলা করতাম, সেই মাঠে খেলতে আসত দেশরাজ।” এর পরে সে দিনের ঘটনা জানতে চান সরকার পক্ষের আইনজীবী। করণ বলে, “মায়ের সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরে নিচতলার দাদুর ঘরে উঁকি দিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে ওপরের তলায় উঠে যাই। সিঁড়ি থেকেই দিদিকে ডাকতে শুরু করি। দিদি সাড়া দেয়নি। হুড়মুড়িয়ে দেশরাজ বেরিয়ে আসে। এর পর মা জিজ্ঞেস করে ‘তুমি কে?’ আমি মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাই। মা তাকে বাইরে বেরিয়ে যেতে বলাতে সে পকেট থেকে পিস্তল বের করে মায়ের দিকে তাক করে। আমি মাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের দিকে ঠেলে দিই। সে পর পর দু’বার ট্রিগার টানে মাকে লক্ষ্য করে। ও তখন সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। মায়ের ফোন থেকে কোনওক্রমে ১০০ ডায়াল করে পুলিশকে জানাই। ও বেরিয়ে গেলে দৌড়ে নিচে নেমে দাদুর সঙ্গে স্কুটি নিয়ে ওর পিছু নিই।”
আরও পড়ুন:
যদিও আসামিপক্ষের আইনজীবী বেশ কিছু জায়গায় আপত্তি করেন এবং দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিচারক তাঁকে নিরস্ত করে যুক্তি দেন, “অল্পবয়সী ছেলে, ভয় পেয়ে যাবে। আমি কথা বলছি।” এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আদালতে নিয়মিত শুনানি হবে বলে জানা গিয়েছে। আগামী সোমবার নিহত ছাত্রীর দাদু, যিনি ঘটনার অন্যতম সাক্ষী, তিনি আদালত কক্ষে সাক্ষ্য দেবেন।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ অগস্ট কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজ সংলগ্ন তাঁর নিজের বাড়িতে গুলি করে খুন করা হয় ঈশিতাকে। অভিযোগ, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আদতে উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা দেশরাজ গুলি করে খুন করেন ওই কলেজছাত্রীকে। এর পর নেপাল সীমান্ত থেকে ওই যুবককে গ্রফতার করে পুলিশ। পরে গ্রেফতার হন তাঁর বাবা এবং মামাও। ওই দু’জনের বিরুদ্ধে অভিযুক্তকে আশ্রয় এবং সাহায্যের অভিযোগ ওঠে।
পুলিশের চার্জশিট অনুযায়ী, মূল অভিযুক্ত দেশরাজের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ১০৩, ১০৯ এবং ৬১ ধারা ও অস্ত্র আইনের ২৫ এবং ২৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। দেশরাজের বাবা রাঘবেন্দ্রর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩, ২০৩ এবং ৬১ ধারায় মামলা করা হয়েছে। এবং মামা কুলদীপের বিরুদ্ধে ২৫৩, ৩৩৮, ৩৩৬, ৬১ ও ১০৩ ধারায় অভিযোগ এনেছে পুলিশ।
পুলিশ চার্জশিটের সঙ্গে একাধিক তথ্যপ্রমাণ জমা দিয়েছে আদালতে। মোট ২১ জন সাক্ষীর বয়ান রয়েছে তাতে। এ ছাড়াও খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং ঘটনা পুনর্নির্মাণ সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণও চার্জশিটের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ ও আদালত সূত্রে খবর।