রাজ্যের মধ্যে যেখানে সংখ্যালঘু মানুষের বাস প্রায় সর্বাধিক, মুর্শিদাবাদের এমন তিন বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে এক লক্ষ করে ভোটার ‘বিবেচনাধীন’ হিসেবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় রয়েছেন। কিসের ভিত্তিতে তাঁদের ‘বিবেচনাধীন’ রাখা হল, প্রশ্ন তুলেছেন ‘বুথ লেভল অফিসার’ (বিএলও), ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার’ (এইআরও)-এরা। ঘটনাচক্রে, সব ক’টি আসনেই গত বিধানসভা ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। ফলে, শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজাও।
সংখ্যালঘু প্রধান জেলা মুর্শিদাবাদে প্রায় ১১ লক্ষ মানুষের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’। রাজ্যের মধ্যে সব চেয়ে বেশি। জেলার ডোমকল, ভগবানগোলা, রানিনগর ও শমসেরগঞ্জ বিধানসভায় রাজ্যের মধ্যে শতাংশে সব থেকে বেশি সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শেষে যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ডোমকল বাদে, বাকি তিনটি বিধানসভায় কম-বেশি এক লক্ষ ভোটদাতার নাম ‘বিবেচনাধীন’। ভগবানগোলা বিধানসভায় ৮৬ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। সেখানে ‘বিবেচনাধীন’ ১ লক্ষ ৯ হাজার ৪৩৫ জন। বাদ ১০৩ জন। শমসেরগঞ্জ বিধানসভায় ৮১ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। সেখানে ‘বিবেচনাধীন’ ১ লক্ষ ৮ হাজার ৪০০ জন। ৯৬ জন বাদ। রানিনগরেও ৮১ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। ‘বিবেচনাধীন’ ৯২ হাজার ৭৯৬ জন, বাতিল ১৪৫ জনের নাম। একমাত্র ডোমকল বিধানসভায় ৮৮ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। সেখানে ‘বিবেচনাধীন’ ১৬ হাজার ৭৩১ জন। বাদ ৪৮ জন।
শমসেরগঞ্জের মহম্মদ আহাসান মোল্লারা দুই ভাই এবং চার বোন। আহাসান শুনানিতে নথি জমা দিয়েছেন বলে দাবি। তার পরেও তাঁর নাম ‘বিবেচনাধীন’। আহাসানের ক্ষোভ, “আমার নামে-তথ্যে ভুল নেই। অথচ, আমাকে বিবেচনাধীন করে রাখা হল। আমরা বংশানুক্রমে এ দেশের নাগরিক।”
সাগরদিঘির এক বিএলও খন্দেকার তালাত মনসুর সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমার বুথে এক জনের ডেটা আপলোড করতে গিয়ে ২০০২ সালের তথ্য পেলাম, সেখানে তাঁর নামের জায়গায় লেখা ছিল পদবি। ‘দাস’। এমন আরও অনেকেরই ছিল।... কোনও এক অদৃশ্য কারণে বুথের একটিও হিন্দু ভোটারের নাম লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে এল না। নামের জায়গায় কেবল ‘দাস’ লেখা থাকা ওই ব্যক্তি এবং তাঁর ছেলেপুলেদেরও নয়। এ দিকে আমার নিজের নামটা ফেরত চলে এসেছে’। ওই বিএলও বলেন, “নথি জমা দিলেও বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের এত বেশি নাম ‘বিবেচনাধীন’ কেন, সে প্রশ্ন আমার!”
প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতা ভগবানগোলার এক বিএলও নাসিমা খাতুনের। তিনি বলেন, “আমার বুথে সব সম্প্রদায়ের ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। পরে এক জন বাদে, হিন্দুদের সবার নাম ভোটার তালিকায় থাকল। আর মুসলমানদের সবাই ‘বিবেচনাধীন’। ভোটারেরা জানতে চাইছেন, এটা কী করে হল? উত্তর দিতে পারিনি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এইআরও-র দাবি, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের নামে ছোট ছোট ভুল দেখিয়ে, এমনকি, ভুল নেই এমন ভোটারকেও ‘বিবেচনাধীন’-এর তালিকায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।”
তৃণমূলের মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন, “আগামী নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের নাম বাদ রাখার এই চক্রান্তের জন্য বিজেপিকে ইঞ্চিতে-ইঞ্চিতে বুঝে নেব।” বিজেপির রাজ্য সম্পাদক শাখারভ সরকার বলেন, “নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ভোটার তালিকা করছে। তৃণমূল ভুয়ো ভোটারের জন্য জিতেছিল। ভুয়ো ভোটার পরিষ্কার হতেই ভুল বকছে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)