Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৬ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

পটচিত্রের চাহিদা বাড়ছে নবদ্বীপের রাসে

পটের মাঝে শিব-পার্বতীর ছবির একদিকে গোলকধামে বিষ্ণু এবং অন্যদিকে রাধাকৃষ্ণ। নীচে দেবী কৌশিকী রক্তবীজ নিধন করছেন।

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়
নবদ্বীপ ০২ নভেম্বর ২০১৭ ০২:১৬
Save
Something isn't right! Please refresh.
আপন-খেয়ালে: তৈরিতে  মগ্ন শিল্পী। নিজস্ব চিত্র

আপন-খেয়ালে: তৈরিতে  মগ্ন শিল্পী। নিজস্ব চিত্র

Popup Close

কৈলাসে বৈঠকি মেজাজে বসে বীণা বাজাচ্ছেন মহাদেব। পাশেই বসে আছেন পার্বতী। পিছনে দেখা যাচ্ছে তাঁদের প্রাসাদ। সুউচ্চ মৃন্ময়ী প্রতিমার মুখোমুখি দাঁড়ালে প্রথমেই দর্শকের নজর কাড়বে এই ছবি। পণ্ডিতেরা মনে করেন, নবদ্বীপের রাসের বিশাল প্রতিমার পিছনে প্রকাণ্ড চালের ঠিক মাঝখানের এই ছবি নাকি আসলে সৃষ্টিতত্ত্ব বা প্রকৃতিপুরুষ তত্ত্ব। কমপক্ষে পঁয়ত্রিশ ফুট পরিধির এক একটি প্রতিমার চালের পিছনে আঁকা এই চালচিত্র বা দেবীপট নবদ্বীপের রাসের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

পটের মাঝে শিব-পার্বতীর ছবির একদিকে গোলকধামে বিষ্ণু এবং অন্যদিকে রাধাকৃষ্ণ। নীচে দেবী কৌশিকী রক্তবীজ নিধন করছেন। পটচিত্রের নিজস্ব শৈলীতে আঁকা এই দেবীপটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবদ্বীপের রাসের নামকরণের ইতিহাস। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আগে নবদ্বীপের বৈষ্ণবীয় রাসের ছবিটা ছিল অন্য রকম। ১৫৩৩ সালে চৈতন্যদেবের তিরোধানের একশো বছরের মধ্যে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মে বহু গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়। নানা সম্প্রদায়, গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ শেষ পর্যন্ত বিদ্বেষে পরিণত হয়।

সেই সময়ে সাধারণ মানুষকে বেশি করে আকৃষ্ট করার জন্য বৈষ্ণব মঠ-মন্দির-আখড়ায় নানা অনুষ্ঠান জাঁকজমক করে পালন করা শুরু হয়। তার মধ্যে রাস অন্যতম। সে সময়ে রাসলীলার বিষয়ে পটুয়াদের দিয়ে পট আঁকিয়ে মঠে-মন্দিরে রাখা থাকত। তাই রাসপূর্ণিমার আর এক নাম ‘পট পূর্ণিমা’। আর উপরে গরুর গাড়ির চাকার থেকেও বড় কাঠের চাকা তৈরি করে তার মাঝখানে রাধাকৃষ্ণকে বসিয়ে চারপাশে অষ্টসখীর মূর্তি বসানো হতো। ধীরে ধীরে সেই চাকাটি ঘোরানো হত। একে বলা হত ‘চক্ররাস’।

Advertisement

পরে কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালে (১৭২৮-৮২) পটপূর্ণিমার পরিবর্তন শুরু হল রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। নবদ্বীপের বৈষ্ণবীয় পটপূর্ণিমার শাক্ত রাসে বদলে যাওয়া তাঁরই হাত ধরে। নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেবের মতে, কৃষ্ণচন্দ্র নিজে ছিলেন শাক্ত। তারঁ রাজত্বে শুদ্ধাচারে শক্তিসাধনা হোক, এটা তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন। তিনি বৈষ্ণববিদ্বেষী ছিলেন না, কিন্তু চৈতন্যদেবকে যাঁরা অবতার বলে পুজো করতেন তাঁদের তিনি ঘোর অপছন্দ করতেন। তিনি রাসপূর্ণিমার রাতে নবদ্বীপে শক্তিমূর্তি পুজোয় উৎসাহ দেওয়া শুরু করেন। রাজানুগ্রহে সেই উৎসব ছাপিয়ে যায় বৈষ্ণবীয় রাসকে।

সেই সময়ে নবদ্বীপে বৈষ্ণবদের থেকে সামাজিক ভাবে প্রতিপত্তি বেশি ছিল সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের। যজমান বাড়িতে দুর্গা-কালী পুজো সেরে কার্তিকী পূর্ণিমার শুভদিনে যে যার বাড়িতে ঘটস্থাপন করে নিজ নিজ ইষ্টদেবীর পুজো করতেন তাঁরা। পণ্ডিতমশাইদের বাড়ির ওই সব পুজোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল্লায় উৎসব লেগে যেত। শক্তির উপাসক কৃষ্ণচন্দ্র রাসের চরিত্র বদলানোর জন্য ঘোষণা করেন, যিনি ঘটের বদলে মাটির মূর্তি গড়ে পুজো করবেন তিনি রাজানুগ্রহ পাবেন। সেই শুরু। একদিকে দ্রুত বেড়ে চলল রাসে শক্তিমূর্তির সংখ্যা। অন্যদিকে কমতে থাকল পটে পূজিত বৈষ্ণবীয় দেব-দেবীর সংখ্যা। এক সময় পটের পুজো প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। হাতেগোনা দু’-একটি রাসে প্রতিমার পিছনের চালে দেবীপটের দেখা মিলত।

একটা লম্বা সময় পেরিয়ে ফের দেবীপটের চাহিদা বাড়ছে। নবদ্বীপে রাসের দেবীপটের একমাত্র শিল্পী তাপস ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘বছর কয়েক ধরে দেখছি, রাসের প্রতিমায় আবার নতুন করে দেবীপট ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন অনেকেই। এ বারে সব মিলিয়ে খান বারো পট আঁকতে হচ্ছে।” নানা রঙে আঁকা সেই পটের চাহিদা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন শিল্পী। আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা দামের এক একটি পট আঁকতে অনেক সময় লাগে। তাপসবাবু বলেন, ‘‘প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটি চিত্রকলা ফের ফিরে আসছে দেখে ভাল লাগছে। আগামী বছর মার্চ থেকেই প্রস্তুতি শুরু করব। যাতে কাউকে ফেরাতে না হয়।’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement