তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের আমলে বিধানসভার ফটকের বাইরে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেন বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র, আব্দুল মান্নান ও শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপির সরকার আসার পরে নতুন স্পিকারের নির্দেশে বিধানসভার মূল ভবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হল সাংবাদিকদেরই!
স্পিকারের নির্দেশে বিধানসভার ডেপুটি সেক্রেটারির জারি করা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের এখন থেকে বিধানসভার মিডিয়া সেন্টারেই থাকতে হবে। মূল ভবনে তাঁরা ‘ঘুরে বেড়াতে’ পারবেন না। স্পিকারের বরাদ্দ করা সময়ে বিধায়ক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মিডিয়া সেন্টারে এসে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। কেবল কোনও মনীষীর জন্মবার্ষিকী পালন বা ওই ধরনের অনুষ্ঠানের সময়ে সংবাদমাধ্যম এক তলার অলিন্দে যেতে পারবে। এই নির্দেশিকার অর্থ, বিধানসভার অলিন্দ, বিরোধী দলের ঘর বা শাসক পক্ষের জন্য নির্দিষ্ট ঘরে সাংবাদিকেরা আর যেতে পারবেন না। বিধানসভায় এমন নির্দেশিকা নজিরবিহীন। ‘অগণতান্ত্রিক’ এই নির্দেশ প্রত্যাহারের দাবিতে সরব হয়েছে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএম। স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু অবশ্য তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়।
বিধানসভা চত্বরে যে মিডিয়া সেন্টার রয়েছে, অধিবেশনের সময় ছাড়া সেখানে সচরাচর খুব বেশি সংবাদ সংক্রান্ত কর্মসূচি হয় না। স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম নির্দেশ জারি করেছিলেন, মিডিয়া সেন্টার ব্যবহার করতে হলে আগাম অনুমতি নিতে হবে। বিরোধী দলনেতার নির্দিষ্ট দফতর যে হেতু বিধানসভা ভবনেই, তাই হঠাৎ কোনও ঘটনা ঘটলে তিনি কী ভাবে আগাম অনুমতি নেবেন— এই প্রশ্ন তুলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছিলেন সূর্যকান্ত। কংগ্রেসের মান্নান এবং বিজেপির শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন সেই রেওয়াজই চালু ছিল। তৃণমূলের আমলে বসানো শর্ত-বিধি এ বার জমানা বদলের পরে আরও কড়া করে সংবাদমাধ্যমের পায়ে বেড়ি পরানোর চেষ্টা হল বলেই বিরোধী শিবিরের একাংশের মত। তৃণমূলের অবশ্য দাবি, বিধানসভা ভবনের ভিতরে সাংবাদিকদের গতিবিধিতে নিষেধাজ্ঞা কখনওই জারি হয়নি। এই ফরমান ‘অভূতপূর্ব’।
স্পিকার রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে না-পাওয়ায় দু’দিন আগে তাঁর ঘরের সামনে ধর্নায় বসেছিলেন বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ও তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ। সূত্রের খবর, ধর্নার ছবি তোলা ও তাঁদের বক্তব্য নেওয়া নিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশের হইচইয়ে রুষ্ট হয়েছিলেন স্পিকার। তার পরে নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ্যে এসেছে শুক্রবার, নোটিস আকারে তা বিধানসভায় টাঙিয়েও দেওয়া হয়েছে। যদিও নির্দেশিকার তারিখ রয়েছে ২৫ মে অর্থাৎ গত সোমবারের! সূত্রের খবর, বিধানসভায় সংবাদমাধ্যমের উপরে এমন নিষেধাজ্ঞার খবর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর কাছে পৌঁছেছে। বিতর্কের খবর গিয়েছে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কাছেও।
স্পিকার অবশ্য এ দিন বিধানসভায় ছিলেন না। যোগাযোগ করা হলে তাঁর বক্তব্য, ‘‘একটা বিজ্ঞপ্তি যখন দেওয়া হয়েছে, সেটাই চূড়ান্ত। এর উপরে আর কিছু বলার থাকতে পারে না। যে বিজ্ঞপ্তি সাংবাদিকেরা পেয়েছেন, সেই অনুযায়ী তাঁরা চলবেন। এই নিয়ে আলোচনার আর কোনও অবকাশ নেই।’’
বাইরে ফুটপাথে দাঁড়িয়েই বিরোধী দলনেতা শোভনদেব বলেছেন, ‘‘বিধানসভায় ৩৬ বছর আছি। এই ধরনের অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী বিজ্ঞপ্তি দেখিনি! অধিবেশন চলাকালীন অনেক ঘটনা ঘটে। আমরা কক্ষত্যাগ করে এলে মিডিয়া সেন্টারে বলতে পারব না, অনুমতি নিতে হবে? আড়াই ঘণ্টা বসে থাকার পরে যে স্পিকার দেখা করেন না, তিনি বিরোধীদের অনুমোদন দেবেন?’’ তাঁর সঙ্গী বিধায়ক কুণাল বলেছেন, ‘‘চরম অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্পিকার। কোনও ঘটনা ঘটলে কী ভাবে কথা বলা যাবে সাংবাদিককের সঙ্গে? স্পিকারকে কোথায় পাওয়া যাবে? তিনি যদি বলেন অনুমতি দেব না, তখন কী হবে! তীব্র বিরোধিতা করছি এই সিদ্ধান্তের।’’
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বাম পরিষদীয় দলের প্রাক্তন নেতা সুজন চক্রবর্তীর মতে, ‘‘বিধানসভায় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের জন্য নানা রকম চেষ্টা হয়েছে। বিধায়কদের ব্যবহারের জন্য স্পিকার হাসিম আব্দুল হালিম বিধানসভায় মিডিয়া সেন্টারের ব্যবস্থা চালু করলেও বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে সেই সেন্টার ব্যবহারে শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। অধিবেশন চালু না-থাকলে বিরোধী পক্ষের নেতাদের বিধানসভার বাইরে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে হত। এখন নতুন সরকারের আমলে স্পিকার এসে সাংবাদিকদের উপরে নিষেধাজ্ঞার ফরমান জারি করলেন! অবিলম্বে এই নির্দেশিকা প্রত্যাহার করা উচিত।’’ তৃণমূল দলের তরফেও বিবৃতি দিয়ে এই নির্দেশিকার বিরোধিতা করা হয়েছে।
বিগত বিধানসভায় বিজেপির পরিষদীয় দলের সচেতক তথা শিলিগুড়ির দু’বারের বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ বলেছেন, ‘‘স্পিকার যখন কোনও সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই নিয়ে কোনও মন্তব্য করার জায়গায় আমি নেই। বিষয়টি আমি জানলাম। যদি কোনও স্তরে আমার মতামত নেওয়া হয়, সেখানে নিজের মত জানাতে পারি।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)