E-Paper

প্রশ্নভারে জর্জরিত অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদন-বিভ্রান্তি

টিকাকরণের তথ্য দিতে হবে কেন, তা নিয়েও চর্চা রয়েছে। টিকা না নেওয়ার অর্থ সরকারের বক্তব্যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, আর তা না হলে ৩০০০ টাকাই বা নেবেন কেন, মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে প্রশ্ন উঠেছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ ০৮:২৬
অন্নপূর্ণা যোজনার নথি জমা দিতে হরহরিতলা থেকে হরিনাভির পুরসভা দফতর পর্যন্ত লাইন।

অন্নপূর্ণা যোজনার নথি জমা দিতে হরহরিতলা থেকে হরিনাভির পুরসভা দফতর পর্যন্ত লাইন। ছবি: শশাঙ্ক মন্ডল।

অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্রের ভারে চরম বিভ্রান্তি উপভোক্তা মহলে। বুধবার সরকারি ভাবে এই আবেদনপত্র প্রকাশ হয়েছে। তাতে বাংলায় ১০ পাতা, ইংরাজিতে ৯ পাতা ও হিন্দিতে ১২ পাতার আবেদনপত্র পূরণ করতে হবে ইচ্ছুক উপভোক্তাকে। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন— যে ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে, তাতে এক-একটি পরিবারের হেঁশেলের খবরও জানতে পারবে রাজ্য সরকার। ফলে সেই তথ্য অসাধু হাতে পড়বে কি না, তা নিয়েও আশঙ্কা থাকছে। আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, পরিবারভিত্তিক তথ্যের গভীরতা কার্যত আর্থ-সামাজিক জাতিগত গণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

রাজ্য সরকারের দাবি, বিষয়টি তাদের নজরেও এসেছে। আবেদনপত্র সরলীকরণের পথ খোঁজা হচ্ছে। এই তথ্যভান্ডার শুধু একটি প্রকল্পের জন্য নয়। সরকারের সব প্রকল্পের জন্য এটি অভিন্ন তথ্যভান্ডার হিসেবে গণ্য হবে।

অন্নপূর্ণা যোজনার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উপভোক্তা হিসেবে আবেদনকারীর বয়স হতে হবে ২৫-৬০ বছরের মধ্যে। তিনি সরকারি চাকরি করেন না, কেন্দ্র-রাজ্য-স্বশাসিত সংস্থা-সরকার অধিগৃহীত-পঞ্চায়েত-পুরসভা-স্থানীয় প্রশাসনে কর্মরত নন, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীও নন কোনও সরকারি বা সরকার পোষিত বিদ্যালয়ে। সেই উপভোক্তা যদি আয়কর দিয়ে থাকেন, তা হলেও প্রকল্পের আওতাভুক্ত হওয়া চলবে না।

কিন্তু যে ফর্ম প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে শুধু ব্যক্তি উপভোক্তাই নন, বরং তাঁর পরিবারের সব সদস্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির তথ্য চাওয়া হয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে, সকলের আয়-পেশা, রেশনগ্রাহক কি না, শিক্ষা-তথ্য, কিসান-শিল্পী-মৎস্যজীবী-শিক্ষার্থী ঋণ কার্ড রয়েছে কি না, জাতিগত সংরক্ষণ, শিশুদের টিকাকরণ, পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যবিমা-সহ বিবিধ তথ্য। তাই বিভিন্ন মহল প্রশ্ন তুলছে, সকলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তথ্যের কী প্রয়োজন। তথ্য দেওয়া হলে তা বেহাত হবে না এবং সংশ্লিষ্টকে ব্যাঙ্ক জালিয়াতির শিকার হতে হবে না, এমন নিশ্চয়তা কি রয়েছে? আবার অন্নপূর্ণা যোজনার মাসিক কিস্তি পেতে হলে জাতিগত তথ্যের কী প্রয়োজন? তবে কি সম্ভাব্য কোনও ছাঁকনি ব্যবহার হবে উপভোক্তা বাছাইয়ের প্রশ্নে?

এসআইআরের সময়ে সংক্ষিপ্ত তথ্যের আবেদনপত্র পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছিল বহু মানুষকে। প্রত্যন্ত এলাকায় এমন কাজে অনেকেই সড়গড় নন। তাই ফর্ম পূরণে যাঁদের সহযোগিতা নেওয়া হবে, তাঁরা তথ্যের গোপনীয়তা কতটা রক্ষা করবেন, প্রশ্ন তা নিয়েও। যদিও সরকারের দাবি, বিডিও থেকে সিনিয়র আধিকারিক পর্যন্ত সকলেই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম পূরণের সহযোগিতাও থাকবে। পাশাপাশি থাকবে শিবিরও।

সরকারি বক্তব্য— অসংরক্ষিত, আর্থিক ভাবে দুর্বল শ্রেণি, তফসিলি জাতি-জনজাতি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত (ওবিসি) মানুষ, বিশেষ ভাবে ঝুঁকির মুখে থাকা জনজাতি গোষ্ঠী, শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ, যুব সম্প্রদায়—সবার জন্যই কেন্দ্র-রাজ্যের নানা ধরনের প্রকল্প-কর্মসূচি রয়েছে। এক-একটি প্রকল্পের জন্য রয়েছে এক-এক রকমের বিধি-মানদণ্ড। প্রত্যেক ক্ষেত্রে উপভোক্তা যাচাই করাও সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। ফলে যোগ্যদের বাদ যাওয়া বা অযোগ্যদের তালিকাভুক্ত হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। সে কারণে সবিস্তার তথ্যভান্ডার তৈরি করা হচ্ছে। এতে সাইবার অপরাধ ঠেকানোর মতো যাবতীয় রক্ষাকবচ নিশ্চিত করা রয়েছে বলে দাবি।

নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, “আয়কর দেবেন আবার সরকারের তিন হাজার টাকা নেবেন, সেটা হয় না, এটা অপচয়। এই ধারণা ভুল যে, শুধু অন্নপূর্ণা যোজনার জন্যই তথ্য চাওয়া হচ্ছে। সরকারের আরও অনেক প্রকল্প আসছে। একেবারে সব তথ্য সরকারের কাছে থাকলে সেই প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নে সুবিধা হবে। মানুষকেও বারবার তথ্য দিতে হবে না।”

টিকাকরণের তথ্য দিতে হবে কেন, তা নিয়েও চর্চা রয়েছে। টিকা না নেওয়ার অর্থ সরকারের বক্তব্যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, আর তা না হলে ৩০০০ টাকাই বা নেবেন কেন, মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে প্রশ্ন উঠেছে। আবার আবেদনপত্র অনুযায়ী, একই রান্নাঘর থেকে খাবার গ্রহণ করেন, এমন সদস্যরাই এক একটি পরিবারের অংশ। ফলে কর্মসূত্রে অন্যত্র থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কী হবে, রয়েছে সেই প্রশ্নও। অগ্নিমিত্রা বলেন, “রাষ্ট্র পরিবারের সুরক্ষার জন্য টিকাকরণ কর্মসূচি করছে। রাষ্ট্রের কাছে তো সেই তথ্য রাখা জরুরি। তবে এই তথ্য বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না।” সরকারের ব্যাখ্যা, পরিযায়ী শ্রমিকদের তথ্য থাকলে তাঁদের চিহ্নিত করতে সুবিধা হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্যভান্ডার তৈরি থাকলে পরিষেবা নিশ্চিত করা সহজ হয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Annapurna Bhandar Scheme West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy