উত্তরবঙ্গবাসীর জন্য ঢালাও ঘোষণা রইল রাজ্য সরকারের নতুন বাজেটে। গত এক দশক ধরে নির্বাচনী লড়াইয়ে উত্তরবঙ্গকে পাশে পেয়েছে বিজেপি। এ বার সরকার গড়ে প্রথম বাজেটেই উত্তরবঙ্গকে নতুন আশা দেখাল সরকার। উত্তরবঙ্গবাসী পাচ্ছে এমস, আইআইটি, আইআইএম থেকে শুরু করে নতুন বিমানবন্দরও।
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার জন্য উত্তরবঙ্গবাসীর কাছে ‘ঋণী’ বিজেপি। সরকার গঠনের পর প্রথম উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়েই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, “এ বার ঋণ শোধের পালা।” সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন এ বার দেখা গেল অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের পেশ করা রাজ্য বাজেটে। ভোটের আগে পূর্বতন সরকারের অন্তর্বর্তী বাজেটে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯২০.১৩ কোটি টাকা। নতুন সরকার চলতি অর্থবর্ষে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে বরাদ্দ করেছে ১,৮২১.৫২ কোটি টাকা। উত্তরবঙ্গে পরিকাঠামোগত দিক থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া, পর্যটন— প্রায় সব ক্ষেত্রেই জোর দেওয়া হয়েছে রাজ্য বাজেটে।
কেন্দ্রীয় সরকারের উড়ান প্রকল্পের আওতায় রাজ্যে নতুন বিমানবন্দর তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মালদহে এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে দু’টি বিমানবন্দর তৈরি হবে। বিজেপির সরকার কোচবিহার বিমানবন্দরও সম্প্রসারণের কাজ করবে বলে বাজেটে জানিয়েছেন স্বপন। যে মেট্রো পরিষেবা এত দিন কলকাতাতেই সীমিত রয়েছে, তা নিয়েও উত্তরবঙ্গবাসীকে আশার আলো দেখাল সরকার। কলকাতার বাইরেও মেট্রো পরিষেবা চালু করা যায় কি না, সেই সম্ভাবনার দিকগুলি খতিয়ে দেখতে চায় সরকার। যে দু’টি জায়গায় সরকার মেট্রো পরিষেবার বিষয়টি প্রাথমিক বিবেচনায় রেখেছে, তার মধ্যে একটি শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি সম্ভাব্য মেট্রো পরিষেবা। স্বপন জানান, এই প্রকল্পের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে একটি ‘টেকনো-ইকনমিক সার্ভে’ শুরু হয়েছে।
সরকার গড়লে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নে যে বিশেষ জোর দেওয়া হবে, তা নির্বাচনী ইস্তাহারেই জানিয়ে দিয়েছিল বিজেপি। উত্তরবঙ্গে ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির কথা বলা ছিল বিজেপির ‘সংকল্পপত্রে’। আইআইটি এবং আইআইএম তৈরির জন্য উদ্যোগের কথাও ভোটের আগে উত্তরবঙ্গবাসীকে বলেছিল বিজেপি। সরকার গড়ে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করল শুভেন্দুর সরকার। উত্তরবঙ্গের জন্য আইআইটি এবং আইআইএম তৈরির কথা ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে। কোচবিহারের তুফানগঞ্জে তৈরি হবে মহিলা কলেজ।
পূর্বতন সরকারের জমানায় বিজেপি বার বার উত্তরবঙ্গবাসীর প্রতি ‘বঞ্চনার’ অভিযোগ তুলে এসেছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি বদলাবে। শিক্ষার মতো স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও উত্তরবঙ্গবাসীর জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে। উত্তরবঙ্গে তৈরি হবে ক্যানসার হাসপাতাল। তৈরি হবে একটি এমসও। দার্জিলিঙে তৈরি হবে একটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ট্রমা সেন্টার। আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির কথাও বলা হয়েছে বাজেটে।
আরও পড়ুন:
উত্তরবঙ্গে ক্রীড়ার প্রসারেও জোর দেওয়া হয়েছে নতুন বাজেটে। সেখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম এবং একটি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে। এর জন্য চলতি অর্থবর্ষে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। নজর দেওয়া হয়েছে উত্তরবঙ্গে পর্যটনের বিকাশেও। ট্রেকিং, হাইকিং, র্যাফটিং, প্যারাগ্লাইডিংয়ের প্রসারে নতুন সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে। ডুয়ার্সকে অরণ্য, বন্যপ্রাণী, উপজাতীয় পর্যটনের একটি কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে নতুন সরকার।
আরও পড়ুন:
শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে গোটা উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে চাইছে সরকার। উত্তরবঙ্গের চা শিল্পকে চাঙ্গা করতে শিলিগুড়িতে একটি কমন টি প্রসেসিং সেন্টার তৈরি হবে। এর জন্য চলতি অর্থবর্ষে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে বাজেটে।
চা শিল্পে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং শ্রমিকদের সুরক্ষায় নিশ্চিত করতেও বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছে বর্তমান সরকার। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে চা বাগানের ৩০ শতাংশ জমি টি-ট্যুরিজমের জন্য ব্যবহারের যে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ ছিল। চা বাগান নষ্ট হওয়ার এবং জমি বেহাত হওয়ার যে আশঙ্কার কথা দীর্ঘকাল শোনা যাচ্ছিল। সেই সমস্যার সমাধানে বর্তমান সরকার টি-ট্যুরিজমের জন্য জমি ব্যবহারের সীমা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা করেছে। অর্থমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে চা শিল্প বাঁচানোর পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল। একইসঙ্গে চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ‘প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক প্রস্থান যোজনা’র মতো বিশেষ প্রকল্পের ঘোষণাতেও খুশি বাগান শ্রমিকরা।
সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ উন্নত করে শিলিগুড়িকে একটি লজিস্টিক এবং ব্যবসাকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। এই কাজের জন্য চলতি অর্থবর্ষে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। শিলিগুড়ির আইটি পার্কের উন্নয়নের জন্য ২৬ কোটি টাকা খরচ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি হাসিমারায় বায়ুসেনাকে জমি দেওয়ার কথা বলা রয়েছে বাজেট নথিতে।
উল্লেখ্য, উত্তরবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দারা বিভিন্ন পাহাড়ি ঝোরার জলের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ওই ধরনের পাহাড়ি ঝোরাগুলির সংরক্ষণের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে নতুন সরকার। এর ফলে পাহাড়ি এলাকায় পানীয় জলের জোগান এবং জলভিত্তিক জীবিকায় সুবিধা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজ্য বাজেট প্রসঙ্গে দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা বলেন, “বর্তমান সরকার উত্তরবঙ্গের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনে বদ্ধপরিকর। এবারের বাজেট আমাদের যুবসমাজকে ক্ষমতায়িত করবে, চা বাগানগুলিকে নতুন প্রাণশক্তি জোগাবে এবং পাহাড়ের শক্তিকে সুসংহত করে প্রতিটি পরিবারের জন্য উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।”
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদার এই বাজেটকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের ধারা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল।” এই বাজেটের মাধ্যমে সরকার সেই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের ঘাটতি পূরণের কাজ শুরু করেছে বলে মনে করছেন তিনি।
এ বারের বাজেটে উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদ, করণদিঘি, মালদহের গাজোল, চাঁচল, মানিকচক, দার্জিলিঙের শিবমন্দির এলাকাকে নতুন পুরসভার রূপ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অর্থ প্রতিমন্ত্রী তথা মাটিগাড়া নকশালবাড়ির বিধায়ক আনন্দময় বর্মণ বলেন, “এই নতুন পুরসভার মধ্যে একদিকে মাটিগাড়া অন্যদিকে বাগডোগরা অন্তর্ভুক্ত হবে । বাকিটা সমীক্ষা করে বোঝা যাবে যে ঠিক কতগুলো ওয়ার্ড তৈরি হচ্ছে। বিগত বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিধায়ক হয়েছিলাম তখনই পুরসভার দাবি তুলেছিলাম। এ বারেও নির্বাচিত হওয়ার পর এই পুরসভার দাবি তুলে ধরেছিলাম।”
তিনি আরও বলেন, “উত্তরবঙ্গের প্রথম প্রশাসনিক বৈঠকে এই দাবি আমি পেশ করি । সর্বোপরি আজকের বাজেটে তা অনুমতি পেল। আমি অবশ্যই খুশি কিন্তু তার থেকেও বড় বিষয় এই অঞ্চলের মানুষের যে বঞ্চনা , যে নাগরিক পরিষেবা থেকে তারা বঞ্চিত থাকত বা নাগরিক পরিষেবা পেতে তাদের সমস্যা হত, সেই কষ্ট থেকে তাদের মুক্তি মিলবে।”